প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৬
অতীতের তুলনায় এমন অভিযান বিরল

মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়; এটি দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষা, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার অপরিহার্য শর্ত। অথচ এই সময়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ বিক্রি, মজুদ ও রান্না করে পরিবেশনের মতো অনিয়মের খবর যখন সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আইন ও শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন প্রবণতা কেন বন্ধ হচ্ছে না? এ অবস্থায় চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাট ও লঞ্চঘাট এলাকায় জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আটটি প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা এবং প্রায় ৯৫ কেজি ইলিশ জব্দ করার অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অতীতের তুলনায় এমন অভিযান বিরল বলেই এর গুরুত্ব আরও বেশি। তবে এ ধরনের অভিযানকে কেবল বিচ্ছিন্ন সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এর ধারাবাহিকতা, কার্যকারিতা ও বিস্তৃতি নিশ্চিত করতে হবে।
গত ৯ অক্টোবর ২০২৬ (শুক্রবার) বিকেলে পরিচালিত এ অভিযানে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ বিক্রি ও মজুদের দায়ে আটটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। অভিযানে জব্দ করা মাছ স্থানীয় বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসায় বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের এ উদ্যোগ একদিকে যেমন আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোরতার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে জব্দকৃত মাছের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কি ভবিষ্যতে আর অনিয়ম করবে না? একই এলাকার অন্য ব্যবসায়ীরা কি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবেন? নাকি অভিযান শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে কোনো এলাকায় অভিযান পরিচালিত হলে সাময়িকভাবে অনিয়ম বন্ধ থাকে। জরিমানা ও শাস্তির ভয়ে ব্যবসায়ীরা সতর্ক হন। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর তদারকি শিথিল হয়ে পড়লে কেউ কেউ আবারও আগের অনিয়মে ফিরে যান। আরও উদ্বেগজনক হলো, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মধ্যে এমন একটি বিকৃত মানসিকতা কাজ করতে পারে যে, একবার জরিমানা গুণতে হয়েছে যখন, তখন পরবর্তী সময়ে কয়েকগুণ বেশি অনিয়ম করে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ শাস্তিকে অনিয়ম থেকে বিরত থাকার শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ না করে কেউ কেউ সেটিকে ব্যবসায়িক লোকসান হিসেবে বিবেচনা করেন এবং পরবর্তী সময়ে আরও বেশি অবৈধ মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করেন। এই মানসিকতা দূর করা না গেলে শুধু এক দিনের অভিযান, কয়েকটি জরিমানা কিংবা কিছু মাছ জব্দ করে নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়।
এ কারণেই একই স্থানে বারবার অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো মাছঘাট, বাজার, হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁয় একবার অভিযান হয়েছে বলেই সেখানে পুনরায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং যেখানে একবার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে, সেখানে পরবর্তী সময়ে আরও নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন। প্রথম অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আইন মেনে চলছে কি না, পুনরায় নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ মজুদ করছে কি না, কিংবা অন্য কোনো উপায়ে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। একই স্থানে অনির্দিষ্ট ব্যবধানে ও প্রয়োজনে আকস্মিকভাবে পুনরায় অভিযান চালানো হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারবেন, জরিমানা দিয়ে দায় শেষ করার সুযোগ নেই; আইন অমান্য করলে আবারও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এতে জরিমানাকে অনিয়মের খরচ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা কমবে এবং আইন এ ক্ষেত্রে হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির দায়িত্বও কম নয়। মা ইলিশ সংরক্ষণের নিষিদ্ধ সময়ে কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় মজুদকৃত ইলিশ রান্না করে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সমিতিকে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। শুধু মৌখিক সতর্কতা নয়, নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ কেনা, মজুদ করা, রান্না করা কিংবা পরিবেশন না করার বিষয়ে কার্যকর অঙ্গীকার আদায় করা প্রয়োজন। কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে সমিতির পক্ষ থেকেও সাংগঠনিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সমিতির অভ্যন্তরীণ তদারকি সরকারি নজরদারি ও আইন প্রয়োগের বিকল্প নয়; বরং এর পরিপূরক। ব্যবসায়ীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা গড়ে তোলা এবং অসাধুদের নিরুৎসাহিত করার ক্ষেত্রে এই সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ইলিশ রান্না করে বিক্রির বিষয়টি নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না। অনেক সময় প্রকাশ্যে মাছ বিক্রি না হলেও রান্না করা খাবারের আড়ালে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ বাজারজাত হতে পারে। কোথাও অভিযান হয়েছে বলে অন্যত্র এ ধরনের অনিয়ম হচ্ছে না, এমনটি ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। বড় স্টেশন মাছঘাট ও লঞ্চঘাটের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, মাছের আড়ত, গুদাম এবং সম্ভাব্য মজুদকেন্দ্রগুলোকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন স্থানে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে, যাতে অভিযানের খবর আগেভাগে পেয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা মাছ সরিয়ে ফেলা কিংবা প্রমাণ গোপন করার সুযোগ না পান।
আমরা মনে করি, এ ধরনের অভিযান শুধু চাঁদপুর শহরের কয়েকটি পরিচিত স্থানে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলা, স্থানীয় মাছবাজার, নদীতীরবর্তী এলাকা, আড়ত, পরিবহনকেন্দ্র এবং ইলিশ মজুদের সম্ভাব্য স্থানগুলোতেও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। কোথাও নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ ধরা, কেনাবেচা, পরিবহন, মজুদ কিংবা রান্না করে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। কারণ, একটি এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে অন্য এলাকায় শিথিলতা রেখে দিলে অসাধু চক্র সহজেই তাদের কর্মকাণ্ডের স্থান পরিবর্তন করে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ব্যাহত করতে পারে।
অভিযানের কার্যকারিতা বাড়াতে শাস্তির পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি, অপরাধের পুনরাবৃত্তি শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কখন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুসংগঠিত নথি থাকা প্রয়োজন। একই প্রতিষ্ঠান পুনরায় অপরাধ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও সচেতন করতে হবে, যাতে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ কেনা কিংবা রেস্তোরাঁয় ইলিশের খাবার খাওয়ার মাধ্যমে তাঁরা পরোক্ষভাবে বেআইনি ব্যবসাকে উৎসাহিত না করেন। চাহিদা কমানো গেলে অবৈধ সরবরাহের প্রণোদনাও কমবে।
মা ইলিশ রক্ষার বিষয়টি নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে দেশের মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ, জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ জড়িত। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিপরীতে, নিষেধাজ্ঞার সময় অসাধু ব্যবসায়ীদের অবাধে ইলিশ কেনাবেচা ও পরিবেশনের সুযোগ দেওয়া হলে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তাই একদিকে জেলেদের জন্য সরকারের সহায়তা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের সাম্প্রতিক অভিযান প্রমাণ করেছে, সমন্বিত উদ্যোগে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে নিয়মিত, দৃশ্যমান ও সর্বব্যাপী করা। অতীতের তুলনায় এমন অভিযান বিরল হলে তাকে স্বাগত জানাতে হবে, কিন্তু বিরল অভিযানকে নিয়মিত প্রতিরোধব্যবস্থার বিকল্প ভাবা যাবে না। বরং এই অভিযানকে আরও ঘন ঘন, আরও লক্ষ্যভিত্তিক এবং আরও বিস্তৃত করার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই স্থানে পুনঃপুন অভিযান, সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সক্রিয় ভূমিকা এবং জেলার সর্বত্র সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে জরিমানা গুনে পরে কয়েকগুণ লাভ তুলে নেওয়ার দুঃসাহস কেউ দেখাতে না পারে।
আমরা আশা করি, জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় হবে। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করাই হতে হবে অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। মনে রাখতে হবে, এক দিনের অভিযান অনিয়মের একটি ঘটনা উন্মোচন করতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক অভিযানই অনিয়মের সংস্কৃতি ভাঙতে পারে। মা ইলিশ রক্ষায় আমাদের প্রত্যাশা—চাঁদপুর শহর থেকে জেলার প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে এমন কঠোর, ধারাবাহিক ও আপসহীন তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।







