সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০১

ভালোবাসার এই পরাজয় (!) মেনে নিতে সত্যিই অনেক কষ্ট হয়-

অনলাইন ডেস্ক
ভালোবাসার এই পরাজয় (!) মেনে নিতে সত্যিই অনেক কষ্ট হয়-

চাঁদপুর কণ্ঠের ফরিদগঞ্জ ব্যুরো ইনচার্জ প্রবীর চক্রবর্তী রোববার (২৩ আগস্ট ২০২৬) তাঁর এক প্রতিবেদনে এক নারীর গল্প তুলে ধরেছেন আবেগভরে। ফরিদগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ রূপসা গ্রামের গৃহবধূ আকলিমা বেগমকে নিয়ে লেখা তাঁর এ গল্পটি অনেক করুণ এক গল্প। মাত্র ২৬ বছরের এক নারী। দু কন্যাসন্তানের মা। স্বামী দেলোয়ার হোসেনের বয়স যখন জীবন থেকে মাত্র কয়েকটি বছর নয়, আরও বহু বছর পাওয়ার কথা-তখনই অসুস্থতা এসে তার জীবনকে থামিয়ে দিতে উদ্ধত হলো। চিকিৎসকেরা বললেন, কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। আর আকলিমা তখন এক মুহূর্তও নিজের কথা ভাবলেন না। নিজের শরীরের একটি অঙ্গ দিয়ে তিনি স্বামীকে বাঁচাতে চাইলেন। কী অসীম আস্থা থাকলে একজন মানুষ নিজের শরীরের একটি অংশ অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্যে দিয়ে দিতে পারেন! কী গভীর ভালোবাসা থাকলে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের শরীর, নিজের কষ্ট-সবকিছুকে তুচ্ছ মনে হয়! আকলিমা সেই ভালোবাসারই এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঢাকার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হলো। স্বামীর শরীরে প্রতিস্থাপিত হলো স্ত্রীর কিডনি। হয়তো সেই মুহূর্তে আকলিমার মনে ছিলো একটিই স্বপ্ন-‘আমি আমার মানুষটাকে আবার ফিরে পাবো।’ হয়তো তিনি কল্পনা করেছিলেন, হাসপাতালের এই দুঃসহ দিনগুলো একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে। স্বামী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন। দু মেয়ে বাবার হাত ধরে হাঁটবে। সংসারে আবার হাসি ফিরবে। আর তিনি মনে মনে বলবেন-‘আমার কষ্ট সার্থক হয়েছে।’ কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের স্বপ্নের ভাষা বোঝে না। অস্ত্রোপচারের দুদিন পর দেলোয়ারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলো। নানা জটিলতা দেখা দিলো। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও ১৮ আগস্ট তিনি চলে গেলেন-চিরতরে।

একজন স্বামী মারা গেলেন। কিন্তু একই সঙ্গে যেনো একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেলো। সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যটি ছিলো তখনই-যখন স্বামী মৃত্যুর সঙ্গে শেষ লড়াই করছেন, আর স্ত্রী নিজেও হাসপাতালের আইসিইউতে শুয়ে। নিজের শরীরের ভেতর তখন সেই কিডনি নেই, যা দিয়ে তিনি স্বামীকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। অথচ সেই মানুষটিই আর বেঁচে নেই। আকলিমা যখন স্বামীর মৃত্যুসংবাদ শুনলেন, তখন তিনি নিজেও অসুস্থ। কীভাবে একজন স্ত্রী সেই সংবাদ গ্রহণ করলেন? কীভাবে একটি হৃদয় একই সঙ্গে নিজের শারীরিক যন্ত্রণা আর প্রিয় মানুষটিকে হারানোর যন্ত্রণা বহন করলো? এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। আছে শুধু কান্না। আর আছে দুটি ছোট্ট মুখ-চার বছরের আশুরা জাহান ইভা এবং ১১ বছরের আফরিন জান্নাত ইরা। তাদের কাছে হয়তো মৃত্যু এখনো পুরোপুরি বোঝার বয়স হয়নি। তারা হয়তো বুঝবে না, কেনো বাবা আর দরজা খুলে ঘরে ঢুকবেন না। কেনো মায়ের চোখে এতো জল। কেনো ঘরের পরিচিত কণ্ঠটি হঠাৎ চিরতরে নীরব হয়ে গেলো। একদিন তারা বড় হবে। হয়তো তখন তারা জানতে পারবে-তাদের বাবা বেঁচে থাকার জন্যে লড়েছিলেন। আর তাদের মা নিজের একটি কিডনি দিয়ে বাবাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটি করেছিলেন। কিন্তু সেদিনও তাদের একটি প্রশ্ন থেকে যাবে-‘মা, তুমি এতো কিছু দিয়েও বাবাকে বাঁচাতে পারলে না কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আকলিমা হয়তো শুধু চোখ মুছবেন। বলবেন না-ভালোবাসা হেরে গিয়েছিলো। বরং বলবেন-‘আমি চেষ্টা করেছিলাম।’ এই ‘চেষ্টা করেছিলাম’ কথাটির ভেতরেই আকলিমার সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত আত্মত্যাগ এবং সমস্ত পরাজয়ের ইতিহাস লুকিয়ে থাকবে।

আমরা প্রায়ই ভালোবাসার গল্প বলি ফুল, কবিতা, গান কিংবা উৎসবের ভাষা কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে সত্য রূপটি হয়তো সেখানে, যেখানে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে নিজের শরীর পর্যন্ত উৎসর্গ করেন। আকলিমা কোনো রূপকথার নায়িকা নন। তিনি আমাদেরই সমাজের একজন সাধারণ নারী, গ্রামীণ এক সরলা গৃহবধূ। তাঁর হয়তো বড় কোনো পরিচয় নেই, নেই বিত্তের অহংকার, নেই আলো ঝলমলে জীবনের গল্প। কিন্তু তাঁর একটি সিদ্ধান্ত তাঁকে অসাধারণ করে দিয়েছে-তিনি স্বামীর জীবনকে নিজের জীবনের চেয়েও মূল্যবান মনে করেছিলেন। দুঃখজনকভাবে, সেই আত্মত্যাগও মৃত্যুকে থামাতে পারেনি। এখানেই জীবনের নির্মমতা। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভালোবাসার এক নির্মম পরাজয়। কিন্তু ভালোবাসা কি কখনো হারে?

মানুষ চিকিৎসা আবিষ্কার করেছে, অঙ্গ প্রতিস্থাপন শিখেছে, অসংখ্য মৃত্যুর মুখ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে এনেছে। তবু সবকিছুর ওপরে এমন একটি সীমারেখা আছে, যার সামনে মানুষের সমস্ত সামর্থ্য একসময় অসহায় হয়ে পড়ে। দেলোয়ারের মৃত্যু সেই অসহায়ত্বেরই আরেকটি নির্মম স্মারক। কিন্তু এখন আমাদের সামনে আরও একটি বড় দায়িত্ব আছে।

দেলোয়ার চলে গেছেন। তাঁকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু আকলিমা এবং তাঁর দু সন্তান যেনো একা হয়ে না যান-এ দায়িত্ব আমাদের। শোক প্রকাশ করে আমরা যদি থেমে যাই, তবে সেই শোক খুব সহজেই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। ফুল, সমবেদনা, কয়েকটি ছবি, কয়েকটি আবেগী বাক্য-তারপর সব শেষ। অথচ আকলিমার জন্যে আসল লড়াই শুরু হচ্ছে এখন। তাঁকে সুস্থ হয়ে দাঁড়াতে হবে। দু সন্তানকে মানুষ করতে হবে। সংসারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়তে হবে। নিজের শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি বহন করতে হবে এক অসহনীয় মানসিক শূন্যতা। এ লড়াই তাঁর একার হতে পারে না। সমাজের বিত্তবান-চিত্তবান মানুষ, মানবিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং প্রবাসী শুভাকাক্সক্ষীদের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান-আকলিমার পাশে দাঁড়ান। তাঁর চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দু সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যে একটি স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করে দিন। কারণ দেলোয়ারকে আমরা ফিরিয়ে দিতে পারবো না। কিন্তু তাঁর সন্তানদের মুখের হাসিটুকু আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি। আকলিমার চোখের জল হয়তো মুছে দিতে পারবো না। কিন্তু তাঁর আগামী দিনের পথটুকু কিছুটা সহজ করতে পারি। এটাই হবে আকলিমার আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। আর এটাই হবে সমাজে আমাদের মানবিকতার পরীক্ষা।

ভালোবাসার গল্পে সবসময় সুখী সমাপ্তি থাকে না। কখনো ভালোবাসা তার সর্বস্ব দিয়ে যুদ্ধ করেও প্রিয় মানুষটিকে ধরে রাখতে পারে না। কখনো একজন স্ত্রী নিজের শরীরের একটি অংশ দিয়েও স্বামীর জীবন কিনে নিতে পারেন না। কখনো দু শিশুর কান্নার কাছেও মৃত্যু ফিরে তাকায় না। তবু ভালোবাসা তখনও পরাজিত হয় না। কারণ ভালোবাসার জয় সবসময় প্রিয় মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে নয়; কখনো কখনো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাওয়ার মধ্যেই তার সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব। আকলিমা হেরে গেছেন-জীবনের নিষ্ঠুর হিসাবের কাছে। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা হেরে যায়নি। হেরে গেছে শুধু একটি জীবনকে মৃত্যুর হাত থেকে কেড়ে আনার মানুষের সামর্থ্য। আর তাই এই গল্প পড়ার পর বুকের ভেতর থেকে একটাই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে-ভালোবাসার এই পরাজয় মেনে নিতে সত্যিই অনেক কষ্ট হয়। তবু আকলিমার দু মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে-এই অন্ধকারের মধ্যেও মানবিকতার একটি আলো জ্বালানো সম্ভব। সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্ব এখন সংবেদনশীল প্রতিটি মানুষের।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়