সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৩

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলেম সমাজের ভূমিকা ও অবদান

ফরিদুল ইসলাম
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলেম সমাজের ভূমিকা ও অবদান

ডেঙ্গু বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসা ও মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি সবচেয়ে প্রয়োজন জনসচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এ ক্ষেত্রে সমাজের প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ সমাজব্যবস্থায় আলেম-ওলামা, ইমাম ও খতিবদের মানুষের ওপর যে নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে, তা ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাড়িঘর ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র ঢেকে রাখা, পরিত্যক্ত পাত্র ও টায়ার সরিয়ে ফেলা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করাÑএসব সাধারণ পদক্ষেপই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব কার্যক্রম সফল করতে হলে জনগণের আচরণগত পরিবর্তন অপরিহার্য। এখানেই আলেম সমাজের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।”Ñসূরা আল-বাকারা: ২২২। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।”Ñসহিহ মুসলিম। এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে সদকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এসব শিক্ষা মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও জনকল্যাণের দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আলেম সমাজ যদি এসব ধর্মীয় শিক্ষাকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বাস্তব কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি মানুষের কাছে শুধু স্বাস্থ্যবিধি নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বাংলাদেশে মসজিদভিত্তিক জনসচেতনতা তৈরির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি শুক্রবার বিপুলসংখ্যক মানুষ মসজিদে সমবেত হন। ইমাম ও খতিবরা জুমার খুতবা ও অন্যান্য ধর্মীয় আলোচনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবভিত্তিক বার্তা দিতে পারেন। তারা মুসল্লিদের বলতে পারেনÑবাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। কারণ এ ধরনের জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। একটি মসজিদ থেকে যদি নিয়মিতভাবে কয়েকশ পরিবারে এই বার্তা পৌঁছে যায়, তাহলে তা একটি বড় সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রমে পরিণত হতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি মসজিদকে পরিচ্ছন্নতার একটি আদর্শ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। মসজিদ কমিটি, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মুসল্লিদের সমন্বয়ে নিয়মিতভাবে মসজিদ ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করা যেতে পারে। অজুখানা, পানির ট্যাংক, ড্রেন, ছাদ, ফুলের টব ও অন্যান্য স্থানে পানি জমে আছে কি নাÑতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মসজিদের আশপাশে ময়লা-আবর্জনা থাকলে তা অপসারণ করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধেই সহায়ক হবে না; বরং স্থানীয় মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সংস্কৃতিও গড়ে তুলবে।

আলেম সমাজের নেতৃত্বে পরিচালিত মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গুর কারণ, প্রতিরোধের উপায় এবং পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন। শিক্ষার্থীদের বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি চিহ্নিত করে তা অপসারণে পরিবারের সদস্যদের উৎসাহিত করতে বলা যেতে পারে। একটি সচেতন শিক্ষার্থী তার পরিবার ও প্রতিবেশীদেরও সচেতন করতে পারে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একটি সচেতনতা বার্তা দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পাশের বাড়ি, খালি জায়গা, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা পরিত্যক্ত স্থানে পানি জমে থাকলেও মশার প্রজনন হতে পারে। তাই নিজের পাশাপাশি প্রতিবেশীকেও সচেতন করা প্রয়োজন। ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আলেম সমাজ ধর্মীয় আলোচনায় এই বিষয়টি তুলে ধরে বলতে পারেনÑপ্রতিবেশীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

এভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

ডেঙ্গু নিয়ে সমাজে অনেক সময় ভুল তথ্য, গুজব ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার প্রচার দেখা যায়। আলেম সমাজ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা মানুষকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করতে এবং অসুস্থ হলে দ্রুত যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করতে পারেন। উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তক্ষরণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আলেম সমাজের দায়িত্ব হলো রোগ সম্পর্কে ভয় বা গুজব ছড়ানো নয়; বরং মানুষকে সচেতন, দায়িত্বশীল এবং প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলেম সমাজ স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে মসজিদভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে প্রতিটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে মসজিদভিত্তিক সচেতনতা দল গঠন করে বাড়ি বাড়ি পরিচ্ছন্নতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি, সেখানে আলেম সমাজের নেতৃত্বে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।

বর্তমানে ধর্মীয় বক্তা ও আলেমদের অনেকেরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অনুসারী রয়েছে। তারা ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ে ছোট ভিডিও, পোস্ট ও সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রচার করতে পারেন। তবে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক নির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্য অনুসরণ করা জরুরি। ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে ভুল চিকিৎসা বা ভিত্তিহীন দাবি যুক্ত না করে সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণ আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, মসজিদভিত্তিক যুব সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তারা এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জমে থাকা পানি শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারেন। বিশেষ করে সপ্তাহে একটি দিন “পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা দিবস” হিসেবে পালন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলেম সমাজের সম্ভাব্য করণীয়

আলেম সমাজ চাইলে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায়

* জুমার খুতবায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা দিতে পারেন।

* মসজিদ ও মাদ্রাসা পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন।

* মুসল্লি ও শিক্ষার্থীদের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।

* জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের বিষয়ে সচেতন করতে পারেন।

* স্থানীয় প্রশাসনের পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে পারেন।

* ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করতে পারেন।

* গুজব ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন।

* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার করতে পারেন।

* স্থানীয় যুবসমাজকে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সম্পৃক্ত করতে পারেন।

* ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নাগরিকেরও। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক এবং আলেম সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে আলেম সমাজ ধর্মীয় মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।

ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা, কিন্তু এর প্রতিরোধে শুধু ওষুধ বা মশকনিধন কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা, দায়িত্বশীলতা এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ। বাংলাদেশের মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি জনস্বাস্থ্য সচেতনতার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। ইমাম ও খতিবদের একটি সচেতনতামূলক বক্তব্য, একজন আলেমের একটি দায়িত্বশীল আহ্বান কিংবা একটি মসজিদকেন্দ্রিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান একটি পুরো এলাকার মানুষের আচরণ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলেম সমাজকে কেবল বক্তার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে সচেতনতা সৃষ্টিকারী, সংগঠক, সমাজসংস্কারক ও জনস্বাস্থ্য সহযোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করা সময়ের দাবি। ধর্মীয় মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যজ্ঞান এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে ডেঙ্গুমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ।

ফরিদুল ইসলাম : চিন্তক, শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়