প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪২
শেখ হাবিব ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকগাথা

কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় হঠাৎ, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কাটানো সামান্য কিছু মুহূর্তও জীবনের দীর্ঘ স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে। সময়ের প্রবাহে অনেক মানুষকে আমরা ভুলে যাই, আবার কোনো কোনো মানুষের মৃত্যু পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। শেখ হাবিব ভাইয়ের মৃত্যু আমার কাছে তেমনই এক বেদনার মুহূর্ত। আজ (শনিবার) সকাল ৮টায় তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর একসঙ্গে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেলো।
বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় আমাদের ধারণা ছিলো, দলের পত্রিকা জনগণের মধ্যে নীরবে সংগঠকের ভূমিকা পালন করে। তাই মাসিক ‘ভ্যানগার্ড’ পত্রিকা হাতে নিয়ে চাঁদপুর শহরের অলিগলি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঘুরে বেড়াতাম। সম্ভবত ১৯৮১ সালের দিকে একদিন আমরা পাঁচ-ছয়জন পত্রিকা বিক্রি করতে নতুন বাজার থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছিলাম। দুপুরের দিকে চৌধুরী ঘাটলায় অবস্থিত তাজমহল বোর্ডিংয়ের নিচে পৌঁছালাম।
আমাদের একজন আঙুল দিয়ে শেখ হাবিব ভাইকে দেখিয়ে দিলেন। তাকিয়ে দেখিÑপরিপাটি পোশাকে স্বাস্থ্যবান, কালো, বড় চোখ, মাথাভর্তি চুলের এক সুপুরুষ চেয়ারে বসে আছেন। আমার পোশাকের দৈন্যতা, পুরোনো স্যান্ডেল আর ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে তাঁর সামনে পত্রিকা হাতে দাঁড়ালাম। তিনি পত্রিকাটি হাতে নিয়ে আমাদের সামনে বসতে বললেন। গরমে ক্লান্ত শরীরে ফ্যানের বাতাস যেন প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিলো।
তিনি আমাদের প্রত্যেকের জন্যে দুটো করে সিঙ্গাড়া দিতে বললেন। মুহূর্তের মধ্যে সিঙ্গাড়া খেয়ে দুগ্লাস পানি পান করে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। তিনি হেসে বললেন, ‘আরও সিঙ্গাড়া দিতে বলবো?’ লজ্জায় ঘাড় নেড়ে জানালাম, আর লাগবে না।
আমাদের একজন সিনিয়রকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন। তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ হচ্ছিলো। একপর্যায়ে হাবিব ভাই বললেন, তোমাদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। মানুষ তা বুঝবে না। নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না, শুধু সময় নষ্ট করছো।
কথাগুলো তখন আমার ভালো লাগেনি। বরং হাবিব ভাইয়ের প্রতি মনে এক ধরনের বিরূপতা তৈরি হয়েছিলো। ফেরার পথে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছিলামÑপুঁজিপতিদের কাছে পত্রিকা বিক্রি করতে যাওয়া সময়ের অপচয়। পরে পার্টি অফিসে সেই অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে আমরা আরও দৃঢ়ভাবে মনে করলাম, ধনিক শ্রেণি সমাজতন্ত্রের শত্রু।
কিন্তু সময় মানুষকে অনেক কিছু শেখায়।
একদিন ‘ওয়ান মিনিটে’ তাঁর সঙ্গে আবার দেখা। তিনি আইসক্রিম খাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে আমার জন্যেও একটি আইসক্রিম অর্ডার করলেন। কিছুক্ষণ পর এক সুশ্রী নারী এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। হাবিব ভাই পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘জ্যোৎস্না, আমার স্ত্রী।’
এরপর যতবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, প্রায় প্রতিবারই তিনি একই কথা বলতেনÑ‘জীবনটা এভাবে নষ্ট করে দিও না হাসান।’ পার্টির চাঁদা সংগ্রহ করতে গেলেও তিনি কখনো ফিরিয়ে দিতেন না, ‘পরে এসো’ বলেও এড়িয়ে যেতেন না। মাঝেমধ্যে তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক হতো। আমি উত্তেজিত হয়ে নানা যুক্তি-তর্ক করতাম, আর তিনি অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে আমার কথার উত্তর দিতেন।
একসময় রাজনীতির পাঠ চুকিয়ে চাঁদপুর ছেড়ে চলে এলাম। দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে দেখা নেই। একদিন ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাওয়ার পথে লঞ্চের কেবিনে আবার দেখা হয়ে গেলো। অনেক গল্প হলো। জানতে পারলাম, তিনি ধানমন্ডিতে থাকেন এবং প্রতিদিন ধানমন্ডি লেকে হাঁটতে আসেন। এরপর আমিও হাঁটতে গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করতাম। আমাদের কথা শুরু হতো চাঁদপুর দিয়ে, আর শেষ হতো ইউরোপ-আমেরিকার সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে করতে। কখনো কখনো সেই গল্প দুপুর পর্যন্ত গড়িয়ে যেতো। তাঁর সঙ্গ আমি গভীরভাবে উপভোগ করতাম। পরে আমি মিরপুরে চলে আসায় সরাসরি দেখা বন্ধ হয়ে গেলো। তবে ফোনে মাঝেমধ্যে কথা হতো। আমার প্রবীণবিষয়ক কাজের প্রতি তিনি সবসময় উৎসাহ দিতেন। বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্যে হোম কেয়ার সার্ভিস কতোটা গুরুত্বপূর্ণÑতা নিয়ে তিনি আগ্রহের সঙ্গে আলোচনা করতেন।
আজ তিনি নেই। তাঁর চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে, জীবনের একটি অধ্যায় যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথম পরিচয়ের সেই ভুল বোঝাবুঝি থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের আলাপ, তর্ক-বিতর্ক, স্নেহ ও উৎসাহÑসবকিছু আজ নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে।
মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কাজ, ভালোবাসা ও স্মৃতির মধ্যে। শেখ হাবিব ভাইও আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।
হাবিব ভাই, আপনি ভালো থাকবেনÑঅন্য এক জগতে। আপনার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। আপনার পরিবারের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা।
লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সংগঠক।








