শনিবার, ০১ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৫

৩৭ দিনের দুনিয়ার সফর

এক শিশুর সংক্ষিপ্ত জীবন ও পরিবারের আজীবনের শোক

উজ্জ্বল হোসাইন
এক শিশুর সংক্ষিপ্ত জীবন ও পরিবারের আজীবনের শোক

জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—মৃত্যু। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ মৃত্যুর দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু কিছু মৃত্যু সময়ের নিয়মকেই যেন অস্বীকার করে আসে। যে শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখার পরও মায়ের বুকের উষ্ণতা, বাবার স্নেহ, পরিবারের ভালোবাসা কিংবা জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলোকে ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই চলে যায়, তার মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের বিদায় নয়; এটি একটি পরিবারের বুকের ভেতর চিরস্থায়ী শূন্যতার জন্ম দেয়।

আমাদের পরিবারের জন্যে তেমনই এক বেদনাময় নাম—আরাফাত। মাত্র ৩৭ দিনের পৃথিবীর সফর শেষে সে চলে গেলো এমন এক জগতে, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না। কিন্তু এই ৩৭ দিনেই সে আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলো যে, আজও তার স্মৃতি প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে।

আমরা ছিলাম পাঁচ ভাই। আজও মনে হয়, যেন সবাই আছি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এক দশক আগে কিডনিজনিত জটিল রোগে আমার ছোট ভাই জাকির হোসেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। ভাই হারানোর সেই শোক আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। অনেক রাত নির্ঘুম কেটে যায়। যতোই ভুলে থাকতে চাই, পারি না। সহোদর হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই ব্যথা কেবল সেই মানুষই বুঝতে পারেন, যিনি নিজের ভাই কিংবা বোনকে হারিয়েছেন।

ভাইয়ের চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে আমি ছিলাম। হাসপাতালের করিডোর, চিকিৎসকের কক্ষ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও রক্ত সংগ্রহ—সবকিছুই সামলাতে হয়েছে। আমার মায়ের বুকফাটা কান্না, অসহায় চোখে সন্তানের দিকে তাকিয়ে থাকা—আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এক রাতে ঘুমের মধ্যেই আমার ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলো। সেই রাতের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

আজ আমরা চার ভাই জীবিত। সবাই বিবাহিত, সন্তানের বাবা। একজন বিদেশে, অন্যরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত। শহরে থাকার কারণে পরিবারের যে কোনো অসুস্থতার খবর এলেই সবাই প্রথমে আমার দিকেই তাকায়। চিকিৎসক নির্বাচন, হাসপাতালে ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্তের ব্যবস্থা, ওষুধ—সবকিছুই যেন আমার দায়িত্ব। অনেক সময় ক্লান্তি আসে, বিরক্তও হই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, পরিবারের মানুষগুলো যদি ভালো থাকে, তাহলে এই কষ্টই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বিদেশে থাকা আমার ভাই মুহাম্মদ ওচমান গনির স্ত্রী শিউলি সন্তানসম্ভবা। নিয়মিত চিকিৎসা চলছিলো। সব রিপোর্টই আশাব্যঞ্জক ছিলো। চিকিৎসকও বলেছিলেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু হঠাৎ করেই শিউলির রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। স্থানীয় চিকিৎসক দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। আমরা সময় নষ্ট করিনি। তাঁকে দ্রুত বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ইউনিট-২-এ ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩১ সপ্তাহে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। মা এক হাসপাতালে, সন্তান আরেক হাসপাতালে। জন্মের পরই মা ও সন্তানের জীবন যেন দুটি ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে বিভক্ত হয়ে গেলো।

শিউলিকে নেওয়া হলো সার্জিক্যাল আইসিইউতে। আর নবজাতক আরাফাতকে ভর্তি করা হলো বিশেষ নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এসসিএবিইউ)। একজন বারডেম-১-এ, অন্যজন বারডেম-২-এ। সেই কঠিন সময়ে আমার বড় বোনের ছেলে সফিকুল ইসলাম রোমান অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। দিনের পর দিন হাসপাতালের করিডোরে কাটিয়েছে। একজনের খবর নিয়ে আরেকজনের কাছে ছুটেছে। তার সেই ত্যাগ আমাদের পরিবার কোনো দিন ভুলবে না।

শিউলির জন্যে দিতে হয়েছে ১১ ব্যাগ রক্ত। শিশুটির জন্যে আরও ২ ব্যাগ। প্রতিটি রক্তের ব্যাগ ছিলো নতুন আশার প্রতীক। প্রতিটি ফোঁটা রক্তের সঙ্গে মিশে ছিলো আমাদের প্রার্থনা। বিদেশে থাকা ভাই ওচমান প্রতিদিন ফোন করতেন। একটাই কথা বলতেন—চিকিৎসায় যেনো কোনো ত্রুটি না হয়।

আমরাও তাই করেছি। সামর্থ্যের শেষ বিন্দু পর্যন্ত চেষ্টা করেছি।

তিন সপ্তাহের নিবিড় চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা জানালেন, শিশুর অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল। তাই আমরা তাকে চাঁদপুরে নিয়ে এলাম। গ্রামের বাড়িতে নয়, আমার শহরের বাসায়। কারণ, নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে এটিই ছিলো সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

আমি ও আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার—দুজনই চাকরিজীবী। তারপরও নিজেদের ক্লান্তি, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত জীবন—সবকিছু ভুলে শিশুটিকে ঘিরেই নতুন জীবন শুরু করলাম। একজন মায়ের মতোই যত্ন নিয়েছিলেন আমার স্ত্রী।

আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তারের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। তিনি শুধু একজন চাচী ছিলেন না, তিনি যেন আরাফাতের আরেকজন মা হয়ে উঠেছিলেন। রাত জেগে খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, কান্না থামানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা—সবকিছুই তিনি অক্লান্তভাবে করেছেন। একবারও বিরক্ত হননি। আজও মনে হয়, আল্লাহ হয়তো তাঁর এই ত্যাগের মূল্য অবশ্যই দেবেন।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আজিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিলো। প্রতিবারই তিনি আশাবাদী কথা বলতেন। বলতেন, স্বাস্থ্য উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তবে সতর্কতার অংশ হিসেবে তিনি চোখের পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিলেন। আমরা নিয়ে গেলাম মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে। পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা জানালেন, প্রিম্যাচিউরিটির কারণে রেটিনার সমস্যা রয়েছে। ইনজেকশন দিতে হবে। ইনজেকশন দেওয়া হলো। চিকিৎসকেরা বললেন, শনিবার আবার ফলোআপে আসতে হবে। আমরা আশ্বস্ত হলাম। ভাবলাম, আর কয়েকটি দিন কষ্ট করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

এই ৩৭ দিনে আরাফাত শুধু একটি শিশু ছিলো না। সে ছিলো আমাদের প্রতিদিনের আলো। তার ছোট্ট হাত, নিষ্পাপ মুখ, অপলক তাকিয়ে থাকা চোখ, মৃদু নড়াচড়া—সবকিছুই আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিলো। অফিস থেকে ফিরে প্রথমেই তাকে দেখতে যেতাম। সে যেন আমাদের ক্লান্তি দূর করে দিতো। একটি শিশুর হাসি কতো বড় শক্তি হতে পারে, আরাফাত আমাদের তা শিখিয়েছে।

সেই সকাল, যা কোনো দিন ভুলবো না। সেদিন সকালে আমার ঢাকায় যাওয়ার কথা। ব্যস্ততার কারণে আরাফাতকে দেখে বের হতে পারিনি। সকাল ছয়টার লঞ্চে উঠলাম। একবারের জন্যেও মনে হয়নি, এটাই হবে শিশু আরাফাতের সঙ্গে আমাদের শেষ বিচ্ছেদ।

সকাল প্রায় পৌনে আটটার দিকে আমার স্ত্রীর ফোন। ভাবলাম, হয়তো আমার খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু ফোন ধরতেই শুনলাম তাঁর বুকফাটা কান্না। শুধু একটি বাক্য—'আরাফাত নেই।'

মুহূর্তেই পৃথিবী যেন থেমে গেলো। আমি তখন নদীর মাঝখানে। ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। নদীর বিশাল জলরাশির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ বলে মনে হচ্ছিলো।

একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেলো। ৩৭ দিনের পৃথিবীর সফর শেষ হলো। একজন বাবা হারালেন তাঁর সন্তান। প্রবাসে থাকার কারণে সন্তানের উষ্ণ আলিঙ্গনও পাননি। একজন মা হারালেন তার বুকের ধন। আমরা হারালাম আমাদের সবার আদরের ভাতিজাকে। যে ঘরে প্রতিদিন কান্নার শব্দ শোনা যেতো, সেই ঘর হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। যে বিছানায় ছোট্ট শরীরটি শুয়ে থাকতো, সেখানে এখন শুধু শূন্যতা।

যাঁদের ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না।

এই কঠিন সময়ে অনেকেই আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমার ভাগিনা সফিকুল ইসলাম রোমান দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ মানসিক সাহস জুগিয়েছেন। আমার বড় বোন উম্মে কুলসুম মায়ের মতো পাশে থেকেছেন। সিনিয়র রোটা. ডা. এম. জি. ফারুক ভূঁইয়া, চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. খবির উদ্দিন আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন। মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের রোটা. সঞ্জয় অধিকারী এবং রোটা. আল-আমিন সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের এই মানবিকতা আমাদের পরিবারের কাছে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আরাফাতের ৩৭ দিনের জীবন আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। জীবনের দৈর্ঘ্য নয়, গভীরতাই আসল। কেউ হয়তো শত বছর বাঁচেন, তবুও মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেন না। আবার কেউ মাত্র কয়েকটি দিন বেঁচেও অমর হয়ে থাকেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায়। আরাফাত তেমনই একটি নাম। সে হয়তো কথা বলতে শেখেনি। হাঁটতে পারেনি। বাবা বলে ডাকতে পারেনি। কিন্তু সে আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছে। একটি পরিবারের মানুষ কীভাবে একে অপরের জন্যে নিঃস্বার্থভাবে লড়াই করতে পারে, সেটিও সে আমাদের শিখিয়ে গেছে।

এই তো বারবার মনে পড়ছে শিশু আরাফাতের কথা। আমি অফিস থেকে ফোন করতাম—নাসরিন, ও কী খাচ্ছে? নড়াচড়া করছে? এখন কী অবস্থা? ওষুধগুলো খাওয়ানো হয়েছে? ও এখন কী করছে? কোনো সমস্যা হলে জানাবে। কিন্তু না, আমাদের শেষ সময়টুকুও সে দিলো না...

আজও কখনো কখনো মনে হয়, দরজার ওপাশে ছোট্ট আরাফাত শুয়ে আছে। অফিস থেকে ফিরে তাকে কোলে নেবো। তার নিষ্পাপ চোখ দুটি আমার দিকে তাকাবে। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। সে আর ফিরবে না।

তবুও বিশ্বাস করি, আল্লাহ যার পৃথিবীর জীবন মাত্র ৩৭ দিন লিখে রেখেছিলেন, তাঁর কাছেই সে আজ নিরাপদ আশ্রয়ে আছে। আমরা যারা রয়ে গেছি, আমাদের হৃদয়ে তার স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে। সময় হয়তো শোকের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে দেয়, কিন্তু প্রিয়জনের শূন্যতা কখনো পূরণ করে না।

আরাফাতের ছোট্ট জীবনের স্মৃতি আমাদের পরিবারকে কাঁদায়, আবার ভালোবাসার প্রকৃত অর্থও শেখায়। আল্লাহ যেন আমাদের প্রিয় ভাতিজা আরাফাতকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর মা শিউলি ও বাবা মুহাম্মদ ওচমান গনিকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন। আর আমাদের সবাইকে ধৈর্য, ঈমান ও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দান করেন।

আমীন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়