প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৯:২৩
দেনমোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারিবারিক দর-কষাকষি ও পাত্রীর সম্মানহানি

ভূমিকা
মুসলিম বিবাহব্যবস্থায় ‘দেনমোহর’ বা ‘মোহরানা’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক উপাদান। এটি কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি স্ত্রীর প্রতি সম্মান, দায়িত্ববোধ ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। ইসলামে বিবাহকে সহজ, মর্যাদাপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সমাজে দেনমোহরকে ঘিরে এমন এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দর-কষাকষির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে পাত্রীর সম্মানহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক পরিবার দেনমোহরকে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে, আবার কেউ কেউ ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অজুহাতে অবাস্তব অঙ্ক নির্ধারণ করে। ফলে বিবাহের পবিত্রতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে পাত্রীর সামনে দেনমোহর নিয়ে প্রকাশ্য দর-কষাকষি অনেক সময় নারীর ব্যক্তিসত্তা ও মর্যাদাকে আর্থিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত করে, যা মানবিক ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
এই প্রবন্ধে শরিয়ত অনুযায়ী দেনমোহরের ধারণা, দেনমোহর নির্ধারণের নীতি, অতিরিক্ত ও অতি কম দেনমোহরের প্রভাব, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিভিন্ন মুসলিম দেশের বিধান এবং বর্তমান সামাজিক সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করা হবে।
শরিয়ত অনুযায়ী দেনমোহর কী?
দেনমোহর বা ‘মাহর’ হলো মুসলিম বিবাহের একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক অধিকার, যা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদান করতে হয়। ইসলামী শরিয়তে এটি স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অন্য কারো এ সম্পদের ওপর অধিকার নেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
“আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করো।”- সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪
এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দেনমোহর স্ত্রীর প্রতি সম্মান ও অধিকার হিসেবে প্রদান করতে হবে; এটি কোনো অনুগ্রহ নয়।
হাদিসেও সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিবাহের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন-
“সর্বোত্তম বিবাহ হলো সেই বিবাহ, যা সহজ ও কম ব্যয়সম্পন্ন।”
ইসলামে দেনমোহরের নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন ফিকহি মাজহাবে ন্যূনতম পরিমাণ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। আধুনিক মুসলিম পারিবারিক আইনে অধিকাংশ দেশে নির্দিষ্ট সীমা না থাকলেও ইসলামের মূলনীতি হলো—দেনমোহর এমন হতে হবে, যা সম্মানজনক, বাস্তবসম্মত এবং স্বামীর সামর্থ্যের মধ্যে থাকে।
দেনমোহরের প্রকারভেদ
মুসলিম আইনে সাধারণত দেনমোহর চার প্রকার :
১. নির্দিষ্ট দেনমোহর (Specified Dower / Mahr-i-Musamma); যে দেনমোহর বিবাহের সময় উভয়পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারণ করা হয়।
২. উপযুক্ত দেনমোহর (Proper Dower / Mahr-i-Misl); যদি বিবাহের সময় দেনমোহর নির্ধারণ না করা হয়, তবে স্ত্রীর পারিবারিক মর্যাদা, সামাজিক অবস্থান এবং অনুরূপ নারীদের দেনমোহরের ভিত্তিতে তা নির্ধারিত হয়।
৩. ত্বরিত দেনমোহর (Prompt Dower); যা স্ত্রী দাবি করলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করতে হয়।
৪. বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred Dower), যা পরবর্তীতে, সাধারণত তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর সময় প্রদানযোগ্য হয়।
শরিয়ত অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণের নীতি
ইসলামী শরিয়ত দেনমোহর নির্ধারণে ভারসাম্য, ন্যায় ও বাস্তবতার নীতি অনুসরণ করে।
১. স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা; দেনমোহর এমন হওয়া উচিত, যা স্বামী বাস্তবে পরিশোধ করতে সক্ষম। ইসলামে কাউকে অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি নেই।
২. স্ত্রীর মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান; দেনমোহর নির্ধারণে স্ত্রীর সম্মান, পারিবারিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় রাখা উচিত।
৩. সহজ ও বাস্তবসম্মত হওয়া; ইসলাম অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অহেতুক চাপ সৃষ্টি নিরুৎসাহিত করেছে। তাই কাল্পনিক বা প্রদর্শনমূলক দেনমোহর ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৪. পারস্পরিক সম্মতি; দেনমোহর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
৫. প্রদানের আন্তরিকতা; শুধু কাবিননামায় বিশাল অঙ্ক উল্লেখ করে বাস্তবে তা পরিশোধের কোনো ইচ্ছা না রাখা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী।
অতিরিক্ত দেনমোহর নির্ধারণের ফলাফল
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে কোটি টাকা বা অস্বাভাবিক উচ্চ অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। বাস্তবে এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী--
১. বিবাহকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে; অতিরিক্ত দেনমোহর অনেক যুবকের জন্যে বিবাহকে কঠিন করে তোলে।
২. পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে; অযৌক্তিক দেনমোহর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চাপ ও অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
৩. আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়; বাস্তবে পরিশোধে অক্ষমতা মামলা-মোকদ্দমা ও দীর্ঘ আইনি বিরোধের কারণ হতে পারে।
৪. সামাজিক প্রদর্শন প্রবণতা বৃদ্ধি পায়; অনেক পরিবার সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্যে অবাস্তব দেনমোহর নির্ধারণ করে, যা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
৫. দেনমোহর প্রতিশোধমূলক উপকরণে পরিণত হয়; কখনো কখনো বিবাহ বিচ্ছেদের আশঙ্কা থেকে প্রতিশোধমূলকভাবে অতিরিক্ত দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়, যা ইসলামের ন্যায় ও ভারসাম্যের নীতির পরিপন্থী।
অতি কম দেনমোহর নির্ধারণের ফলাফল
অন্যদিকে অতি কম দেনমোহরও সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
১. নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা; অত্যন্ত কম দেনমোহর অনেক সময় নারীর অধিকারকে গুরুত্বহীন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
২. আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা; দেনমোহরের একটি উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অতি কম দেনমোহর সেই উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।
৩. শরিয়তের উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে পড়ে; দেনমোহর শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি দায়িত্ব ও সম্মানের প্রতীক।
বাংলাদেশে দেনমোহর বিষয়ক প্রচলিত আইন
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন ও শরিয়তের আলোকে দেনমোহর সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধান বিদ্যমান।
১. Muslim Family Laws Ordinance, 1961
এই অধ্যাদেশ মুসলিম পারিবারিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান আইন।
ধারা ৫ : মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ করতে হয়।
ধারা ১০ : যদি দেনমোহরের পরিশোধের সময় নির্ধারণ করা না হয়, তবে তা ‘prompt dower’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
২. Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974
এই আইনের অধীনে মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। কাবিননামায় দেনমোহরের বিবরণ সংরক্ষণ করা হয়।
৩. Family Courts Act, 2023
বর্তমানে বাংলাদেশে পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ অনুযায়ী দেনমোহর আদায়ের মামলা পারিবারিক আদালতে বিচারযোগ্য।
স্ত্রী তার দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।
৪. Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939
এই আইন মূলত মুসলিম নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার সম্পর্কিত। যদিও এটি দেনমোহরের মূল আইন নয়, তবে মুসলিম পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক আইন হিসেবে বিবেচিত হয়।
আদালতের দৃষ্টিতে দেনমোহর
বাংলাদেশের আদালত বিভিন্ন রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, দেনমোহর স্ত্রীর বৈধ অধিকার এবং এটি স্বামীর ওপর আরোপিত আইনগত দায় বা ঋণ (debt) হিসেবে গণ্য।
স্বামীর মৃত্যুর পরও স্ত্রী তার দেনমোহর স্বামীর সম্পত্তি থেকে আদায় করতে পারেন। আদালত এটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং কার্যকর আইনগত অধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন।
বিভিন্ন মুসলিম দেশে দেনমোহর নির্ধারণের প্রচলিত ব্যবস্থা
সৌদি আরব
সৌদি আরবে শরিয়াভিত্তিক পারিবারিক আইন অনুসরণ করা হয়। দেনমোহর (মাহর) সাধারণত বর ও কনের পরিবারের পারস্পরিক সম্মতি, সামাজিক মর্যাদা এবং স্থানীয় রীতিনীতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। অনেক অঞ্চলে কনের শিক্ষা, পারিবারিক অবস্থান ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত দেনমোহরের কারণে বিয়ের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার, আলেম সমাজ এবং সামাজিক সংগঠনগুলো যুক্তিসঙ্গত ও সহজসাধ্য দেনমোহর নির্ধারণে সচেতনতা সৃষ্টি করছে।
পাকিস্তান
পাকিস্তানে Muslim Family Laws Ordinance, 1961 কার্যকর রয়েছে। বিবাহ নিবন্ধনের সময় নিকাহনামায় দেনমোহরের পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। নির্ধারিত দেনমোহর পরিশোধে ব্যর্থ হলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে তা আদায় করতে পারেন। পাকিস্তানের আদালতগুলো বিভিন্ন রায়ে দেনমোহরকে স্ত্রীর আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
ভারত
ভারতে মুসলিম পার্সোনাল ল’ অনুযায়ী দেনমোহর বাধ্যতামূলক এবং এটি স্ত্রীর একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিবাহের সঙ্গে সঙ্গেই দেনমোহরের অধিকার সৃষ্টি হয়। স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে তা আদায়ের দাবি করতে পারেন। ভারতীয় আদালতগুলো বহু ক্ষেত্রে দেনমোহরকে নারীর আর্থিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
মিশর
মিশরে বিবাহচুক্তিতে দেনমোহর উল্লেখ বাধ্যতামূলক। সাধারণত দেনমোহরের একটি অংশ তাৎক্ষণিকভাবে এবং অপর অংশ ভবিষ্যতের জন্যে স্থগিত (deferred) রাখা হয়। মিশরের পারিবারিক আদালত বাস্তবসম্মত ও পরিশোধযোগ্য দেনমোহরকে উৎসাহিত করে এবং অত্যধিক বা অবাস্তব পরিমাণ নির্ধারণকে নিরুৎসাহিত করে। নারীর অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দেনমোহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ায় অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ইসলামিক ফ্যামিলি আইন অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারিত হয়। এখানে ‘মাস কাহউইন’ (Mas Kahwin) নামে পরিচিত দেনমোহরের জন্যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ন্যূনতম পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে। যদিও এই পরিমাণ সাধারণত প্রতীকী, তবুও এটি কনের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
ইউএইতে Federal Personal Status Law অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। আইন স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিকে গুরুত্ব দেয়। সরকার ও বিচার বিভাগ অযৌক্তিকভাবে উচ্চ দেনমোহর নির্ধারণকে নিরুৎসাহিত করে, কারণ এটি বিবাহকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। আরব আমিরাতে মধ্যম ও বাস্তবসম্মত দেনমোহর নির্ধারণের জন্যে সামাজিক প্রচারণাও পরিচালিত হয়েছে।
দেনমোহর নিয়ে পরিবারিক দর-কষাকষি : একটি সামাজিক সংকট
বর্তমান সমাজে দেনমোহর অনেক ক্ষেত্রে ‘আর্থিক দর-কষাকষির বিষয়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাত্রীর সামনে দেনমোহর নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা ও দর-কষাকষি অনেক সময় নারীর ব্যক্তিসত্তা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।
সমস্যার কারণসমূহ
১. সামাজিক প্রতিযোগিতা : বেশি দেনমোহরকে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
২. পাত্রীর মতামত উপেক্ষা : অনেক ক্ষেত্রে পাত্রীর মতামত ছাড়াই পরিবার দেনমোহর নির্ধারণ করে।
৩. শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতা : দেনমোহরের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে।
৪. আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত ভয় : অনেকে মনে করেন, বেশি দেনমোহরই নারীর একমাত্র নিরাপত্তা।
৫. সামাজিক প্রদর্শন প্রবণতা : দেনমোহরকে ‘স্ট্যাটাস’ প্রদর্শনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সমস্যার সমাধানে করণীয়
১. শরিয়তভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি : ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতে হবে—দেনমোহর সম্মান ও দায়িত্বের প্রতীক, প্রদর্শনের নয়।
২. বাস্তবসম্মত দেনমোহর নির্ধারণ : দেনমোহর এমন হওয়া উচিত, যা বাস্তবে পরিশোধযোগ্য।
৩. পাত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া : কারণ দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার; তাই তার মতামত অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
৪. অপমানজনক দর-কষাকষি বন্ধ করা : দেনমোহরকে বাজারমূল্যের আলোচনায় পরিণত করা বিবাহের মর্যাদা নষ্ট করে।
৫. আইনগত সচেতনতা বৃদ্ধি : মানুষকে বোঝাতে হবে যে, দেনমোহর একটি কার্যকর আইনগত দায়।
৬. ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের ভূমিকা : ইমাম, আলেম, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।
৭. প্রাক-বিবাহ কাউন্সেলিং চালু করা : বিয়ের আগে উভয় পরিবারকে অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা গেলে অনেক বিরোধ কমে যাবে।
উপসংহার
দেনমোহর ইসলামী বিবাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা নারীর সম্মান, অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু বর্তমান সমাজে এটিকে কেন্দ্র করে যে অস্বাস্থ্যকর দর-কষাকষি, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও অবাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অতিরিক্ত দেনমোহর যেমন বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করে, তেমনি অতি কম দেনমোহরও নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই দেনমোহর নির্ধারণে প্রয়োজন ভারসাম্য, বাস্তবতা, পারস্পরিক সম্মান ও আইনি সচেতনতা।
বিশেষ করে পরিবারগুলোর উচিত পাত্রীর সম্মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং দেনমোহরকে কোনো অপমানজনক দর-কষাকষির উপকরণে পরিণত না করা। ইসলামের মূল শিক্ষা অনুসরণ করে সহজ, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল বিবাহব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সমাজে সুস্থ পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র ও আইনগত রেফারেন্স
১. পবিত্র কুরআন, সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪।2. Muslim Family Laws Ordinance, 1961
3. Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974
4. Family Courts Act, 2023
5. Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939
6. MullaÕs Principles of Mohammedan Law|
7. Fyzee, Outlines of Muhammadan Law|
8. Dr. Tahir Mahmood, Muslim Law in India and Abroad|
9. Banglapedia : Muslim Family Law Ordinance, 1961|
লেখক পরিচিতি৷ : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড সাইন্সেস (ইউআইটিএস)। মে. তাওহীদুল ইসলাম





