শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ১০:৪৯

বলাখাল প্রসঙ্গ এবং বোগদাদ কেন এলো, আইদি আসতে হলো কেন?

অনলাইন ডেস্ক
বলাখাল প্রসঙ্গ এবং বোগদাদ কেন এলো, আইদি আসতে হলো কেন?

চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা, চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা হয়ে ফেণী এবং চাঁদপুর থেকে কালিয়াপাড়া হয়ে কচুয়া, চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম এবং চাঁদপুর থেকে ঢাকা বাস সার্ভিস ছিলো স্বাধীনতা-পরবর্তী গণপরিবহনের চাঁদপুরকেন্দ্রিক রুট। চাঁদপুর-কুমিল্লা, চাঁদপুর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর-ফেণী রুটে কুমিল্লা মটর ড্রাইভার্স সমবায় সমিতি লিমিটেডের বাসগুলোর আধিপত্য ছিলো। এ তিনটি রুটে ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু বাসও চলতো। চাঁদপুর-কচুয়া রুটে চাঁদপুর শহরের লন্ডন ঘাটস্থ হেদায়েত উল্লাহ কোম্পানির ‘মমিন’ বাসের দাপট ছিলো। আর চাঁদপুর-ঢাকা, চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস চলাচল করতো, কোনো কোম্পানি বা ট্রান্সপোর্টের বাসের দাপট ছিলো না। কিন্তু এ সকল বাসই ছিলো লোকালের মতোই। যাত্রীর সংখ্যাধিক্য দেখলেই যেখানেসেখানে বাস থামাতো এবং যাত্রী নামাতো। কোনো নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ছিলো না। এ বিষয়টি কুমিল্লার আব্দুল হক নামে একজন পরিবহন ব্যবসায়ী খেয়াল করলেন। তিনি আশির দশকে বোগদাদ ট্রান্সপোর্ট নামে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটে দেড় ঘন্টা সার্ভিসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্দিষ্ট নীতি ও শৃঙ্খলায় আরামদায়ক সিট ক্যাপাসিটি সম্বলিত চেয়ার কোচ চালু করলেন। যেখানে লোকাল বাস চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা যেতে কিংবা কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর আসতে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগাতো, সেখানে মাত্র দেড় ঘন্টায় সাতটি স্টপেজ দিয়ে মাত্র ১৫ টাকা ভাড়ায় বোগদাদ চলাচল করতো। অসম্ভব জনপ্রিয়তার বিভবে বিভূষিত হয়ে গেলো বোগদাদ। তবে দ্রুত চলাচল অক্ষুণ্ন রাখতে গিয়ে বোগদাদ কতো শিশুর জীবন যে নাশ করেছে, কতো বেদনার কাব্য রচনার ভিত যে গড়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। ভালো সার্ভিসের গরিমায় এবং পরিবহন শ্রমিক নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করে মৃত জীবনের মূল্য ২০ হাজার টাকায় পরিশোধ করে বারবার পার পেয়েছে। বোগদাদ বাসের টিকেট অগ্রিম বুকিং দেয়া যেতো একসময়। ১৫ মিনিটের ব্যবধানে কাউন্টার থেকে ছেড়ে যাওয়া বোগদাদ তুমুল জনপ্রিয়তায় পাঁচ থেকে তিন মিনিটের ব্যবধানে ছাড়ার পর্যায়ে চলে যায়। এতে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক ও চাঁদপুর-কচুয়া রুট থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় লোকাল বাস। বোগদাদকে অনুসরণ করে চাঁদপুর-কচুয়া রুটে ‘ঈগল’ এবং কুমিল্লা-কচুয়া রুটে ‘আজমীর’ ক’বছর চললেও সিএনজি অটোরিকশা ও বোগদাদের দাপটে সেগুলোও হারিয়ে যায়। বোগদাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে গিয়ে ক’বছর আগে রিল্যাক্স নামের বাস নেমেছিলো আঁটঘাঁট বেঁধে। কিন্তু বোগদাদের কৌশল ও দাপটের চোটে হারিয়ে যায়। বোগদাদ না হারালেও সিএনজির দাপটে ও যানজটে সেটার পূর্বের গতি ও সুনাম হারিয়েছে। আড়াই ঘন্টার আগে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা যেতে এবং কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর আসতে পারে না বলা চলে। আর সাম্প্রতিক সময়ে বোগদাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আইদি পরিবহনের বাসের সাথে পুরো পথে রেষারেষি, হাতাহাতি, মারামারিতে আড়াই ঘণ্টা সময়ও রক্ষা করতে পারে না। বিবর্ণ, পুরানো বাসের কারণে বোগদাদের শ্রীহীনতায় আইদি নূতন বাস নিয়ে তুলনামূলক কম ভাড়ায় নেমে যাত্রীপ্রিয়তা অর্জন করলেও বোগদাদের আইনি বাধায় পরিশ্রান্ত হয়েছে বহুবার। বোগদাদ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ থেকেই শাহরাস্তির আমেরিকা প্রবাসী এক ধনাঢ্য ব্যক্তি নিজের ছেলের নামে নামিয়েছে আইদি পরিবহন। তিনি বৃদ্ধাশ্রমের অর্থায়নের প্রয়োজনে এ বাস সার্ভিস নামিয়েছেন বললেও কয়েক বছরেও বৃদ্ধাশ্রমের বাস্তবতা তুলে ধরতে না পারায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছেন। তিনি জগতপুরে ও ওয়ারুকে এলাকাবাসী ও যাত্রীদের ব্যারিকেডের মুখে নূতন স্টপেজ দিয়ে কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে চারটি স্টপেজ দেয়ার বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিজ উপজেলাবাসীর কাছে খুব ভালো সাজলেন। বোগদাদকেও একই স্টপেজে বাধ্য করলেন।আর শাহরাস্তির চেয়ে বড়ো উপজেলা হাজীগঞ্জে স্টপেজ বাড়ালেন না। এতে হাজীগঞ্জবাসী, বিশেষ করে হাজীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরবর্তী বলাখালবাসী তো তাদের ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় খেপবেই। সেজন্যে তারা জগতপুর ও ওয়ারুক থিওরিতে ব্যারিকেডে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমর্থনে সফলতা পেলো, কিন্তু সমন্বয়হীনতার অভিযোগ এনে সেটা দুদিনও টিকতে দিলো না দুটি পরিবহন কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে বোগদাদ ও আইদি কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে স্থানীয় এমপি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা না চেয়েই দুদিনের মাথায় যাত্রীদেরকে বলাখালে নামতে না দিয়ে বাকিলা ও হাজীগঞ্জে নামিয়ে দিলো। এতে কী হলো?-উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বলাখালে তাৎক্ষণিক ব্যারিকেড থিওরি প্রয়োগ করা হলো। যাত্রীরা ভুগলো, আর জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হলো। এটার জন্যে কাদের গোঁয়ার্তুমি দায়ী সে বিষয়ে মন্তব্য না-ই করলাম। আমরা কেবল সমস্যার সমাধান চাই। পরিবহন কর্তৃপক্ষ যদি পরিবহন শ্রমিক নেতা, ভাড়াটিয়া কিছু লোক লালন করে এবং কথায় কথায় ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে স্থানীয় এমপি ও প্রশাসনের চেয়ে নিজেদের বেশি ক্ষমতাধর মনে করেন, বাস চালানো বন্ধ রাখেন, তাহলে লাভ হবে সিএনজি অটোরিকশা ও অটোবাইক, কার ও মাইক্রোবাসসহ ক্ষুদ্র পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের, আর কম-বেশি দুর্ভোগ পোহাবে যাত্রীরা। আমরা রিজিডিটি বাদ দিয়ে ওয়ারুক ও জগতপুরের ন্যায় বোগদাদ ও আইদি পরিবহন কর্তৃপক্ষকে বলাখালের ব্যাপারে ফ্লেক্সিবল হতে পরামর্শ দেবো। আমরা অকপটে বলতে চাই, প্রায় চল্লিশ বছর যদি ওয়ারুক ও জগতপুরে স্টপেজ না দিয়ে চলা যায়, তারপরও চলা গেলো না কেন? মূলত দুটি পরিবহনের রেষারেষি ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে জগতপুর ও ওয়ারুকে ব্যারিকেড থিওরি কাজে লাগানো হয়েছে কিংবা নাটক করা হয়েছে। বেরসিকরা বলছেন, আইদি ও বোগদাদ ওয়ারুকে ও জগতপুরে স্টপেজ দিয়ে সস্তা যাত্রীপ্রিয়তা পেতে নিজেদের সার্ভিসে বস্তুত কুড়াল মেরেছেন, সেই কুড়াল এখন বলাখালে হয়েছে উদ্ধত, অদম্য। এ কুড়াল যে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্য কোথা থেকেও উদ্ধত হবে না, সেটা গ্যারান্টি দিয়ে কে বলতে পারবে?

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়