প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৬
সৌদির কঠোর সিদ্ধান্তে প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য মতে, বিগত ২০২৫ সালে মোট ৭ লাখ ৫৩ হাজারেরও অধিক বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মসংস্থানের জন্যে সৌদি আরবে গেছেন। এরপরেই রয়েছে কাতারে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭ হাজার ৪৭২ জন । সিঙ্গাপুর ও কুয়েতে যথাক্রমে ৭০ হাজার ৫৬ জন এবং ৭২ হাজার ৭১৭ বাংলাদেশী তাদের ভাগ্য নির্ধারণের জন্যে পরিবার-পরিজন রেখে সুদূর প্রবাস জীবনের সূচনা করেন । দেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ১০টি জেলায় প্রবাসীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই জেলাগুলো থেকে প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা বরাবরের মতো সচল রাখে। তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর প্রবাসীরা রয়েছেন।
বিএমইটি’র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৫ সালে নারী-পুরুষ মিলে প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার শ্রমিক এশিয়া, ইউরোপ আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈধ পথে গমন করেন। সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে মোট ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪৫৩ জন শ্রমিক বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্যে গিয়েছিলেন। আর ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিলো ১০ লাখেরও অধিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিক তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমান।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর ২০২৫ রাজধানী রিয়াদে এই চুক্তি সই হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, এই চুক্তির মাধ্যমে দু দেশের মধ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে, সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের বাস্তবতায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে বলে অভিযোগ করছেন অনেক প্রবাসী। এর মধ্যে দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে নতুন নিয়ম-নীতিমালায় আরো দিশেহারা প্রবাসীরা। দেশটিতে থাকা শ্রমিকদের প্রতি একের পর এক আইন সামনে আসতেছে, আর প্রবাসীদের প্রবাস জীবনের আশার আলো ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন শ্রমিক নিয়োগের উদ্যোগকে অনেকেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর আগে বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানরত দক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বৈধ কিন্তু অদক্ষ শ্রমিকদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে তাদের জন্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তদারকির ব্যবস্থা করা হলে এসব শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (MHRSD) কর্তৃক প্রবর্তিত সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম QIWA Platform থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। প্রবাসীদের মুঠোফোনে বার্তা আকারে জানানো হয়, যেসব প্রবাসী শ্রমিকের ইকামা বা কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ আগামী ২৬ জুনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে, তাকে অবশ্যই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা নবায়ন করতে হবে। অন্যথায়, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলে তারা আইনগত জটিলতায় পড়তে পারেন।
দেশটির নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রবাসীর ইকামা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত একটি সীমিত সময়সীমা বিবেচনা করা হবে। এই সময়ের মধ্যে ইকামা নবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষের বিধান অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো কঠোর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সৌদি আরব প্রবাসীদের মতে, এই নতুন নিয়মের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা, যারা সংখ্যার দিক থেকে সৌদি আরবে বৃহৎ শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব, নিয়োগকর্তার অবহেলা বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সময়মতো ইকামা নবায়ন না হওয়ায় তারা ঝুঁকিতে পড়েন। তাই সংশ্লিষ্টদের দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা বলছে, তথাকথিত ফ্রি ভিসা অথবা (লোড-আনলোড ভিসা) বাস্তবে যতোটা স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবতা ততোটা সহজ নয়। সৌদি আরবের শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি কর্মীকে অবশ্যই নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার (কফিল) অধীনে থাকতে হয়। ফলে ফ্রি ভিসা বলে যে ধারণাটি প্রচলিত, তা মূলত বিভ্রান্তিকর। অনেক ক্ষেত্রে এই ভিসায় আসা শ্রমিকরা নির্দিষ্ট কাজ বা বৈধ নিয়োগকর্তা না থাকায় শুরু থেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।
অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি সাধারণ বিদেশগামী মানুষদের কাছে তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’ বা লোড-আনলোড ভিসা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব ধারণা তুলে ধরে, যার ফলে অনেকেই প্রবাস জীবনে দ্রুত সাফল্যের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। বাস্তবে, এই ভিসার কোনো নির্দিষ্ট বা নিশ্চয়তাপূর্ণ চাকরি থাকে না—তবে অনেকের মনে ভুল ধারণা তৈরি করা হয় যে, এটি মূলত মালবাহী গাড়ি থেকে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধরনের অস্পষ্ট ও অনুমাননির্ভর তথ্যের ওপর ভরসা করে অনেকেই বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই তারা বুঝতে পারেন যে, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই এবং তখন তাদের সেই স্বপ্ন দ্রুত ভেঙ্গে পড়ে।
বর্তমানে সৌদি সরকারের কড়াকড়ি তদারকির কারণে অনিয়মিত বা অনুমতিহীন কাজের সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে। আগের মতো রাস্তায় গাড়ি ধোয়া, ফুটপাতে পানি বিক্রি কিংবা যত্রতত্র দৈনিক শ্রমের কাজ করে আয় করার সুযোগ এখন কার্যত নেই বললেই চলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে এসব অননুমোদিত কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা, আটক কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ফ্রি ভিসায় আসা অনেক প্রবাসী বৈধ কাগজপত্র ও কাজের নিশ্চয়তা না থাকায় প্রায়ই ইকামা (বাসস্থান অনুমতি) সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন। নির্দিষ্ট স্পন্সর না থাকলে ইকামা নবায়ন, চাকরি পরিবর্তন বা সরকারি সেবা গ্রহণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা ধীরে ধীরে অবৈধ অবস্থানে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন, যা ভবিষ্যতে তাদের জন্যে বড়ো ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।
বাস্তবতা হচ্ছে, সৌদি আরবে কাজ করতে হলে বৈধ প্রক্রিয়া এবং নির্ভরযোগ্য নিয়োগকর্তার অধীনে আসাটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পথ। সাময়িক লাভের আশায় বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভিসায় বিদেশে আসা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য যাচাই করেই প্রবাস জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন দেশটিতে বেশিরভাগ প্রবাসীরা ।
অন্যদিকে বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, এই ধরনের ভিসার বড়ো একটি অংশই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। অনেক প্রবাসী এজেন্সির মাধ্যমে উচ্চ খরচে সৌদি আরবে এসে জানতে পারেন, তাদের ভিসার কোনো বৈধ স্পন্সর বা নির্দিষ্ট কাজ নেই। ফলে ৩ মাস পরই তারা অবৈধ হয়ে পড়েন এবং জরিমানা, গ্রেপ্তার বা দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়েন। এমনকি যাদের ১২ মাসের ইকামা দেওয়া হয়, তারাও অনেক সময় কাজের অভাব, বেতন অনিশ্চয়তা এবং আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন। সব মিলিয়ে, 'ফ্রি ভিসা' সাময়িকভাবে কিছু সুযোগ তৈরি করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রবাসীদের জন্যে বড়ো ধরনের ঝুঁকি ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সৌদি আরবে বলদিয়া বা রাস্তা পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের বাস্তবতা অনেক কঠিন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ ধরনের শ্রমিকদের মাসিক বেতন সাধারণত মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ রিয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে দীর্ঘ সময় রোদে দাঁড়িয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় । অতীতে সহানুভূতির কারণে পথচারীদের কাছ থেকে কিছু টিপস বা অনুদান পাওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।
সৌদি সরকার ভিক্ষাবৃত্তি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। নতুন আইনে কেউ ভিক্ষাকে পেশা হিসেবে নিলে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে । ফলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত আয়ের যে ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে, বাস্তবে তা এখন আর কার্যকর নয়। তবুও দুঃখজনকভাবে অনেক প্রবাসী শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে ৭–৮ লাখ টাকা খরচ করে এই পেশায় আসার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
মূলত ভুল তথ্য, দালালচক্রের প্রলোভন এবং ‘জাকাত-ফিতরার টাকায় আয় করা যাবে’—এমন ভ্রান্ত ধারণার কারণে তারা সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে এসে তারা বুঝতে পারেন, উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ, কম বেতন এবং আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই ভিসা পেতে শ্রমিকদের ঋণ নিতে বা সম্পদ বিক্রি করতে হয়, যা পরবর্তীতে তাদের আরও আর্থিক সংকটে ফেলে । ফলে এই ধরনের কম বেতনের পেশায় বিদেশে আসা এখন আর লাভজনক নয়, বরং এটি বড়ো ধরনের আর্থিক ও মানবিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মোহাম্মদ সানাউল হক : ফিচার লেখক।






