সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪

খাল খনন এবং দখলদার উচ্ছেদ ও শাস্তি প্রদান চলুক একই সাথে

অনলাইন ডেস্ক
খাল খনন এবং দখলদার উচ্ছেদ ও শাস্তি প্রদান চলুক একই সাথে

গতকাল চাঁদপুর কণ্ঠের ‘কৃষিকণ্ঠ’ পাতায় মোস্তফা কামাল নামে এক লেখকের ‘২০ হাজার কিলোমিটার নদীনালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি নিয়েছে সরকার’ শিরোনামে পাঠক একটি লেখা যেমন পড়েছে, তেমনি প্রথম পৃষ্ঠায় পড়েছে ‘মহামায়ায় সরকারি খাল দখল করে পাকা দোকান নির্মাণ’ শিরোনামে কামরুজ্জামান টুটুলের একটি সচিত্র প্রতিবেদন। মোস্তফা কামালের লেখাটি পড়ে আশাবাদী হয়েছে অনেকেই, আর টুটুলের লেখাটি পড়ে হতাশ হতে হয়েছে সবাইকে।

মোস্তফা কামাল লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের এক মাসের মধ্যেই শুরু হলো খাল খননের অভিযাত্রা। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সরকার জানায়, ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্যে দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি গুরুত্ব পায়। পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র পদাঙ্ক অনুসরণ করে ২০২৬ সাল থেকে তিনি দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু করেছেন। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করা, সেচসুবিধা বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এই প্রকল্প। ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা থেকে দেশের ৫৩টি খালের খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনী ইশেতহারের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদীনালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে কৃষিখাতে ‘সবুজ বিপ্লব’ আনতে এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন শুরু করেন। তারেক রহমানের আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও জলাধার খননের প্রধান উদ্দেশ্য সেচসুবিধা বৃদ্ধি, বন্যা ও জলাবদ্ধতা দূর করা। খাল খননের পাশাপাশি এর তীরে ৭ হাজার বৃক্ষরোপণ এবং মাটির নিচের পানির স্তর ঠিক রাখতে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। খাল খনন ও পুনঃখননে কী প্রাপ্তি ঘটবে, এ বিষয়ে আগুয়ান ভূমিকার দায়িত্ব ছিলো পরিবেশবাদীদের। তারা সেখানে ছিলেন দায়সারা। মাঝেমধ্যে কিছু তাগিদ ও তত্ত্ব কথার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করেছেন পরিবেশবাদীরা। খাল বা নদী পুনঃখননের ক্ষেত্রে পরিবেশবাদীদের কেবল খনন কাজের তদারকি নয়, বরং খনন-পরবর্তী টেকসই ব্যবস্থাপনা ও দখলমুক্ত রাখার বিষয়টি নিশ্চিতকরণে এখনো তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। আলামত বা নমুনা বলছে, পরিবেশবাদীরা তাদের এ দায়িত্বে ঘাটতি করলেও সরকার এগিয়ে যাবে তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে। মানুষ অপেক্ষমান দেশের মৃতপ্রায় খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের ফলো আপ এবং সাফল্য দেখতে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপিদের খননযোগ্য খালের নাম, পরিধির তথ্য তৈরি করেছেন খুব কম সময়ের মধ্যে। বিভিন্ন জায়গায় খনন কাজে নেমে পড়েছেন তারাও। স্থানীয়ভাবে এই প্রকল্পে সমন্বয় করছে প্রশাসন। দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি শুরু করার পর পরিবেশসম্মত উপায়ে তার ‘প্রবাহ-প্রকৃতি’ ঠিক রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের বাড়তি মনোযোগ দরকার, কারণ দখল, দূষণ বন্ধ না হলে সুফল আসবে না।

জিয়াউর রহমানের সময় এ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ৬৭৫.১৮ মাইল দীর্ঘ ১৯৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী এলাকায় ‘বেতনা নদী’ পুনঃখনন কাজ যখন উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান, তখন তিনি সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তার এ কার্যক্রম শুরুর আগে দেশে ১০ শতাংশ জমিতে শুকনো মৌসুমে পানি সরবরাহ সম্ভব ছিলো। খাল খনন কর্মসূচির পর অন্তত ৫২ লাখ একর জমিতে সেচের সুবিধা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মাছ উৎপাদন, পানি নিষ্কাশন ও নৌ চলাচলে সহায়ক হয় ওই প্রকল্প। বৃদ্ধি পায় খাদ্য উৎপাদন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিলো গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, খাদ্যঘাটতি, প্রশাসনে অস্থিরতা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে নবীন রাষ্ট্রের সামনে ছিলো পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কৃষি খাত ছিলো বিপর্যস্ত। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল বিশ্বের নিম্নতমগুলোর একটি। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তববাদী, উৎপাদনমুখী এবং আত্মনির্ভর উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘সবুজ বিপ্লব’ ছিলো সত্তরের দশকের শেষের দিকে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে গৃহীত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এখন নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, এ কর্মসূচি কৃষি ও সেচ কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে একটা আশাবাদ সকলের মধ্যেই। এই কার্যক্রমের ফলে খরা প্রবণতা কমবে, অনদিকে বন্যা ও জলাবদ্ধতাও কমবে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুনঃখনন প্রকল্প শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা রয়েছে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর। এতে অনেক পরিবারের কমসংস্থান হবে। ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে নেওয়া খাল খননের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি ১৯৯২ সালে কয়েকটি জেলায় তা শুরু করেন। পরে তা আর ব্যাপকতা পায়নি।

স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। পলি ও বালিতে ভরাট হয়ে বর্তমানে নৌপথ কমে হয়েছে চার হাজার কিলোমিটার। বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে বর্ষা মৌসুমে যেখানে নৌপথ থাকে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার, শুষ্ক মৌসুমে নৌপথ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার ৩৪৭ কিলোমিটারে। একসময় গ্রামবাংলার জনপদ, কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে খালগুলোর সম্পর্ক ছিলো অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের অসংখ্য খাল আজ মৃতপ্রায়। এর ফলে জলাবদ্ধতা, সেচ সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ক্রমেই তীব্র হয়েছে।

কামরুজ্জামান টুটুল তার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে লিখেছেন, চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের চাঁদপুর সদর উপজেলার মহামায়া বাজারের সড়ক বিভাগের ব্রীজের নিচ দিয়ে ডাকাতিয়া নদীতে চলে যাওয়া খালের পশ্চিম পাশের অংশ পাকা করে ব্যক্তির দখলে যাচ্ছে। খালের তলদেশ থেকে পাকা দেয়াল তুলে স্থায়ী দোকান করা হচ্ছে। সেতুর একই অংশ ব্রীজের দক্ষিণ পাশের রেলিংসহ অর্ধেক অংশ দখল করে ইতোমধ্যে দোকান করা হয়েছে। যে খালের তলদেশ দখল করে পাকাকরণ করা হচ্ছে, সে অংশ দিয়ে অত্র অঞ্চলের পানি সড়কের উত্তর পাশ থেকে দক্ষিণ পাশ ধরে ডাকাতিয়াতে নামে। দখলে যাওয়া খালের অংশ উদ্ধার করা না গেলে পর্যান্ত পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হবে, পরিণামে এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে।

প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোনো ব্যক্তি এ বিধান লঙ্ঘন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে একটু আওয়াজ দেওয়া আমাদের পরিবেশবাদীদের মধ্যে আর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। অথচ পরিবেশবিদ-পরিবেশবাদী পরিচয়ে কতো সুযোগ-সুবিধা তারা হাসিল করেন। আলোচিত হন, পরিচিতি ব্যবহার করে প্রাপ্তি ঘটান। এই বাস্তবতার মধ্যেই আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি-যা শুধু একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলার একটি প্রতীক্ষা। খালগুলো পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার গোটা দেশকে কেবল কৃষি সমৃদ্ধি দেবে না, গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্পন্দন দেবে। বৃক্ষরোপণ ও সবজি চাষে মানুষের আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। কথা হলো, চাঁদপুর সদর উপজেলার মহামায়াসহ দেশের অনেক স্থানে সরকারি খাল দখলকে মেনে নিয়ে তথা এমন দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি চালালে সেটা কি সমালোচিত হবে না? আমরা চাই, একদিকে খাল খনন হোক, আর অন্যদিকে খাল থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হোক এবং উপরোল্লিখিত আইনে দখলদারদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। এক্ষেত্রে কাউকে দলীয় বিবেচনায় ন্যূনতম ছাড় দেয়া না হোক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়