বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ১১:০২

স্বপ্ন যাবে বাড়ি-ঈদের খুশিতে, মানুষের গল্প

উজ্জ্বল হোসাইন
স্বপ্ন যাবে বাড়ি-ঈদের খুশিতে, মানুষের গল্প

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলন। আর এই মিলনের সবচেয়ে বড়ো আকাক্সক্ষা স্বপ্ন যাবে বাড়ি। শহরের ব্যস্ত জীবন, কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি, একঘেঁয়েমি-সবকিছুকে পেছনে ফেলে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার যে টান, সেটিই ঈদের সবচেয়ে বড়ো আবেগ। এই আবেগ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সংযোগের গভীর প্রতিচ্ছবি।

প্রতি বছর ঈদ এলেই দেশের বড়ো শহরগুলো বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহনে করে ছুটে চলে গ্রামের দিকে। তাদের চোখে থাকে একরাশ স্বপ্ন, মনে থাকে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার অদম্য আকাক্সক্ষা। বাড়ি ফেরা যেন এক মহাযাত্রা, যেখানে কষ্ট আছে, ভোগান্তি আছে, তবুও আনন্দের ঘাটতি নেই।

ঈদযাত্রা আমাদের দেশের একটি বড়ো বাস্তবতা। এই যাত্রা যেমন আনন্দের, তেমনি ভোগান্তিরও। অতিরিক্ত যাত্রী চাপ, যানজট, টিকিট সংকট, বাড়তি ভাড়া-সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জন্যে এটি অনেক সময় দুর্ভোগে পরিণত হয়। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাটে দেখা যায় মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এসব ভোগান্তি লাঘবে সরকার ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেয়া হয় নানান পদক্ষেপ। তবুও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, গাদাগাদি করে যাত্রা এসব যেন ঈদের আনন্দেরই অংশ হয়ে গেছে। তবুও মানুষ থামে না। কারণ, তাদের কাছে সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো বাড়ি পৌঁছানো, মা-বাবার মুখ দেখা, সন্তানের হাসি দেখা। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে-ঈদযাত্রা কি শুধুই কষ্টের গল্প হয়ে থাকবে, নাকি এটি হতে পারে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা?

অর্থনীতি ও ঈদের প্রভাব : ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি বড়ো চালিকাশক্তি। ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যে আসে নতুন গতি। পোশাক শিল্প, পরিবহন খাত, খাদ্যপণ্য সবখানেই বাড়ে চাহিদা। কিন্তু এর পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সুযোগ নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নিম্নমানের পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি এসব ঘটনা ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত জরুরি।

ঈদের সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য হলো সামাজিক বন্ধন। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়া। দীর্ঘদিন পর একত্রিত হওয়ার এই সুযোগ মানুষের মনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে।

গ্রামে ঈদের দিন সকাল থেকে শুরু হয় ভিন্ন এক আবহ। নতুন পোশাক, নামাজ, কোলাকুলি, সেমাই-পায়েস, শিশুদের নানা বাঁশির সূর, রঙিন পোশাক সব মিলিয়ে এক অনন্য উৎসব। শহরের কৃত্রিম ব্যস্ততার বাইরে এই সরল আনন্দই মানুষের মনে প্রকৃত তৃপ্তি এনে দেয়।

যারা দেশের বাইরে থাকেন, তাদের জন্যে ঈদ অনেক সময় আনন্দের চেয়ে বেদনার। পরিবার থেকে দূরে থেকে ঈদ পালন করা সহজ নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকলে প্রিয়জনের সরাসরি উপস্থিতির অভাব পূরণ হয় না।

তাদের স্বপ্ন যাবে বাড়ি অনেক সময় স্বপ্নই থেকে যায়। তাই আমাদের উচিত প্রবাসীদের এই মানসিক অবস্থাকে উপলব্ধি করা এবং তাদের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা। ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর নজরদারি। সরকার, পরিবহন মালিক, চালক এবং যাত্রী—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই একটি সুন্দর ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ঈদ আমাদের শুধু আনন্দই দেয় না, এটি আমাদের শেখায় মানবিকতা, সহানুভূতি ও ভাগাভাগির শিক্ষা। সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা-এটাই ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য। আজও অনেক মানুষ আছে, যারা নতুন পোশাক পায় না, ভালো খাবার পায় না। তাদের কথা ভাবা, তাদের পাশে দাঁড়ানো-এটাই হওয়া উচিত আমাদের ঈদের অন্যতম অঙ্গীকার। স্বপ্ন যাবে বাড়ি-এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের অনুভূতি। এটি শুধু একটি যাত্রা নয়, এটি একটি আবেগ, একটি টান, একটি ভালোবাসা। শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের নীরবতা, মায়ের হাতের রান্না, শৈশবের স্মৃতি-সবকিছু মিলিয়ে বাড়ি যেন এক স্বপ্নের জায়গা। আর সেই স্বপ্ন পূরণ হয় ঈদের সময়ে।

ঈদ আমাদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ, ভালোবাসা ও নতুন আশার বার্তা। ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ এই চিরন্তন আকাক্সক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের শেকড় রয়েছে আমাদের পরিবার, আমাদের গ্রাম, আমাদের প্রিয়জনদের কাছে। তাই আসুন, ঈদের এই আনন্দকে শুধু ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতায় না রেখে সমাজের সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করি, নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং মানবিক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করি। যেন প্রতিটি মানুষ বলতে পারে হ্যাঁ, আমার স্বপ্ন সত্যিই বাড়ি পৌঁছেছে।

লেখক : উজ্জ্বল হোসাইন, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়