শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৪

গ্যাস সরবরাহে স্বস্তি ফিরছে : বিকল্প আমদানির উৎস খুঁজছে সরকার

এফএসআরইউর ত্রুটি মেরামতের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু।। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বহুমুখী কৌশল

প্রেস বিজ্ঞপ্তি
এফএসআরইউর ত্রুটি মেরামতের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু।। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বহুমুখী কৌশল

কক্সবাজারের মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের পর জাতীয় গ্রিডে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট ২০২৬) থেকে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ফলে গত দু সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। শিল্পাঞ্চল, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট আবারও প্রমাণ করেছে যে শুধু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সঞ্চালন শুরু হয়েছে এবং আগামী দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাইপলাইনের চাপও বৃদ্ধি পাবে এবং গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও ধীরে ধীরে চালু করা সম্ভব হবে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, মেরামত শেষে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হওয়ায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। মহেশখালীর অপর ভাসমান টার্মিনাল থেকে আরও প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। এর ফলে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট থেকে নেমে আসে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহক—সব খাতেই সংকট দেখা দেয়।

শিল্প উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পেরেছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও বেড়ে যায়। চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে কয়েকদিন সরবরাহ নেমে এসেছিল ১৯ থেকে ২০ কোটি ঘনফুটে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ একটি এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি হলেও এর মূল কারণ দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। ২০১৭ সালে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। এই ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহ অবকাঠামোর ঝুঁকিও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চাপ সৃষ্টি করেছিল, তেমনি সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাতও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের এলএনজি পরিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে এলএনজির মূল্য, সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়তে পারে, যার ঝুঁকি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও বহন করতে হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় সরকার তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি—দু ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর পূর্ণ সক্ষমতা দ্রুত ফিরিয়ে আনা, এলএনজির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা, চীনের সহযোগিতায় নতুন এফএসআরইউ স্থাপন এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাব্যতা নিয়েও কাজ চলছে।

দীর্ঘমেয়াদে সরকার দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা, স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান জোরদার, পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার মনে করে, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় বর্তমান সংকট অনেকটাই প্রশমিত হবে। তবে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং সরবরাহ অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করাই হবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়