প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ০৭:১৫
জাস্টিস যখন ইনজাস্টিসের কারিগর!
বিচারপতির দম্ভে নতজানু রাষ্ট্র, অপমানিত শিক্ষকতা

রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রবীণ শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালের অশ্রু কোনো ব্যক্তিগত অপমানের সীমায় আবদ্ধ নেই—এটি এখন একটি জাতির বিবেকের উপর আঘাত, একটি পেশার সম্মানহানির রক্তাক্ত দলিল। যে রাষ্ট্রে শিক্ষককে টেনে হিঁচড়ে বিচারপতির বাসভবনে নিয়ে গিয়ে ‘ক্ষমা ভিক্ষা’ করানো হয়, সেই রাষ্ট্র নিজেই তার নৈতিক বৈধতা হারাতে বসেছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি ক্ষমতার পচনধারার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
ভিডিও: রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে দেওয়া এক নির্মম দলিল
ক্যাপশন : ভিডিও সংগৃহীত।
ভিডিওটি কেবল একটি দৃশ্য নয়—এটি বিচারব্যবস্থার অন্তর্গত ভয়াবহ অসুখের এক্স-রে রিপোর্ট। সেখানে আমরা দেখি, একজন প্রবীণ শিক্ষক ভেঙে পড়েছেন, কাঁদছেন, মিনতি করছেন—আর অদৃশ্যভাবে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষমতার এক বিকৃত হাসি।
একজন বিচারপতি, যিনি আইনের রক্ষক হওয়ার শপথ নিয়েছেন, তিনি যদি নিজেই আইনের অপব্যবহারের ‘স্থপতি’ হয়ে ওঠেন—তবে আদালত আর ন্যায়বিচারের মন্দির থাকে না, সেটি পরিণত হয় ক্ষমতার ব্যক্তিগত কারাগারে।
এটি শাসন নয়, এটি ক্ষমতার সন্ত্রাস
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শাসন করবেন—এটাই শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু সেই শিক্ষার্থী যদি ‘ক্ষমতার সন্তান’ হয়, তবে কি শিক্ষক তার কর্তব্য পালন করবেন না?
আজ যে প্রশ্নটি জ্বলছে তা স্পষ্ট—
বাংলাদেশে কি শিক্ষকের মর্যাদা নির্ধারিত হবে ছাত্রের বাবার পদমর্যাদা দিয়ে?
যে বিচারপতি থানায় জিডি করার আইনি পথ বেছে নিতে পারতেন, তিনি কেন ব্যক্তিগত বাসভবনকে ‘বিকল্প আদালত’ বানালেন?
কেন একজন শিক্ষককে সেখানে নিয়ে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা হলো?
এটি বিচার নয়—এটি প্রতিশোধ।
এটি শাসন নয়—এটি ক্ষমতার সন্ত্রাস।
রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে পচন: বিচারপতি যখন অভিযুক্ত
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো—এখানে অভিযুক্ত কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, বরং বিচারব্যবস্থার একজন উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি।
যেখানে বিচারপতিরাই যদি ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ নিজেকে ভাবতে শুরু করেন, সেখানে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের আশা করা নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা।
এটি শুধু একজন দয়াল চন্দ্র পালের অপমান নয়—
এটি প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি ব্ল্যাকবোর্ডের অপমান।
রাজপথে বিস্ফোরিত ক্ষোভ: নীরবতা ভাঙার শুরু
উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাজ যে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে, তা নিছক আবেগ নয়—এটি একটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে ঘোষিত অনাস্থা।
স্মারকলিপি গেছে, স্লোগান উঠেছে, রাজপথ উত্তাল—
এটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে:
ক্ষমতার কালো কোট দিয়ে শিক্ষকের সাদা সম্মান ঢেকে রাখা যাবে না।
এই আন্দোলন যদি উপেক্ষিত হয়, তবে সেটি কেবল একটি ঘটনার অবমূল্যায়ন হবে না—এটি হবে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার চূড়ান্ত পতনের স্বীকৃতি।
উপসংহার: এখনই সিদ্ধান্তের সময়
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে বাধ্য—
এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার না হলে, বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের অবশিষ্ট আস্থাও ধ্বংস হয়ে যাবে।
দয়াল চন্দ্র পালের অশ্রু কেবল জল নয়—
এটি একটি রাষ্ট্রের বিবেকের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগপত্র।
ক্ষমতা যদি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তবে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না—সেটি হয়ে যায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরতন্ত্র।
আজ দয়াল বাবু কেঁদেছেন—
আগামীকাল যদি পুরো শিক্ষক সমাজ নীরব হয়ে যায়, তার দায় কার?
রাষ্ট্র কি শিক্ষককে রক্ষা করবে—
নাকি ক্ষমতার দম্ভকে আশ্রয় দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে।
প্রতিবেদক : অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
ডিসিকে /এমজেডএইচ







