সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০৯:৩৪

১২ মে ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে

আমাদের নার্স, আমাদের ভরসা

হাসান আলী
আমাদের নার্স, আমাদের ভরসা

১২ মে ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে। এবারের প্রতিপাদ্য “আমাদের নার্স, আমাদের ভবিষ্যৎ জীবন রক্ষায় প্রয়োজন নার্সের ক্ষমতায়ন” আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক মৌলিক সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। সেই সত্যটি হলো নার্সরা শুধু স্বাস্থ্যসেবার একটি অংশ নন; তারা আমাদের আস্থা, ভরসা এবং মানবিকতার প্রতীক।

একজন রোগী যখন হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তার চারপাশে থাকে অনিশ্চয়তা, ভয় এবং দুশ্চিন্তা। এই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেশি যিনি পাশে থাকেন, তিনি একজন নার্স। চিকিৎসকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে রোগীর প্রতিটি পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, ওষুধ প্রয়োগ, জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রেই নার্সদের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু এর বাইরেও একটি বিষয় আছে, যা অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায় তা হলো তাদের মানবিক স্পর্শ। একজন নার্সের একটি আশ্বাসবাণী, একটি হাসি বা সহানুভূতির হাত একজন রোগীর সুস্থতার পথে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নার্সিং পেশার গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের দেশে এখনও চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। ফলে একজন নার্সকে অনেক সময় অতিরিক্ত রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। এতে করে সেবার মান যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তেমনি নার্সদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপও বেড়ে যায়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এসব বাস্তবতা তাদের পেশাগত জীবনে প্রতিনিয়ত প্রভাব ফেলে।

তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নার্সরা তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে। বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য। চিকিৎসকের অভাব যেখানে প্রকট, সেখানে নার্সরাই প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃসেবা, টিকাদান কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টা হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করছে নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে।

এই বাস্তবতায় “নার্সের ক্ষমতায়ন” শুধু একটি প্রয়োজন নয়, এটি একটি দায়িত্ব। ক্ষমতায়ন বলতে আমরা বুঝি তাদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা, উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদান, নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা। নার্সদের যদি যথাযথ সুযোগ ও সম্মান দেওয়া যায়, তাহলে তারা আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রোগীসেবার মানের ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের সমাজে এখনও নার্সিং পেশা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। এই ধারণাগুলো দূর করা জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম সব জায়গায় নার্সদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ, একজন নার্স কেবল একজন পেশাজীবী নন; তিনি একজন সেবাদানকারী, একজন সহমর্মী মানুষ, যিনি অন্যের জীবনের জন্য নিজের সময় ও শ্রম উৎসর্গ করেন।

স্বাস্থ্যখাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নার্সদের প্রতি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উন্নত নার্সিং শিক্ষা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়ন এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইসঙ্গে নার্সদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং পেশাগত সন্তুষ্টির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, “আমাদের নার্স, আমাদের ভরসা” এটি কোনো অলঙ্কারমূলক বাক্য নয়; এটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটি শক্তিশালী, মানবিক এবং কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নার্সদের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

এই ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঘঁৎংবং উধু-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক নার্সদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, তাদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ, আমাদের সুস্থতা, আমাদের নিরাপত্তা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে এই নিবেদিতপ্রাণ মানুষগুলোর ওপর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়