মঙ্গলবার, ০৫ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬, ১২:৫৮

রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই যেন রোগী

গত দু দশকে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল অবস্থা

মাসুদ রানা মনি, রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) থেকে
রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই যেন রোগী

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার সাড়ে চার লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নিজেই যেন রোগী। লোকবল সহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, দু দশক ধরে চলা এক প্রশাসনিক প্রহসন ও অবহেলার ভয়াবহ চিত্র। রোববার রাত ৩টা, রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২৩ জন রোগীর গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। শয্যা না পেয়ে কেউ মেঝেতে, বারান্দায়, কেউবা অন্যের বিছানার পাশে শুয়ে আছেন। এর মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং। ঘুটঘুটে অন্ধকারে রোগীদের শেষ সম্বল হয়ে দাঁড়ায় হাতে থাকা মোবাইলের টর্চলাইট।

গরমে হাঁসফাঁস করা রোগীদের জন্যে মাত্র একটি ফ্যান থাকলেও তা ঘুরছে না। এই চরম প্রতিকূলতায় তিন শিফটে পুরো হাসপাতাল সামলাচ্ছেন হাতে গোণা কয়েকজন নার্স। আর বিশাল এই ভবনের সব ময়লা পরিষ্কারের ভার—ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের কাঁধে। সূত্র জানায়, রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হবে বলে ২০০৪ সালে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরের বছরই শুরু হয় ভবন নির্মাণের কাজ। এরপর ২০১২ সালে প্রশাসনিক ভবন হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু সেখানেই থমকে যায় সব। ভবন হলো, শয্যা বসলো—কিন্তু সেই শয্যার বিপরীতে জনবল নিয়োগের ‘প্রশাসনিক অনুমোদন’ আর এলো না। ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর সিভিল সার্জন বরাবর অন্তত সাতবার চিঠি পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অবশেষে ২০২০ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি আদেশ আসে। ২০২২ সাল থেকে হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে ৫০ শয্যায় চলছে ঠিকই, কিন্তু জনবল রয়ে গেছে সেই পুরনো ৩১ শয্যারই তাও অর্ধেকের কম।

হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ মো. গিয়াছ উদ্দিন ভূঁইয়া হতাশার সুরে বলেন, ‘৫০ শয্যার জনবল তো দূরের কথা, ৩১ শয্যার জনবলই আমাদের নেই। বিগত ১৫ বছর এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সবার দ্বারস্থ হয়েছি। সবাই কাগজ নিয়ে গেছেন, কিন্তু কেউ প্রশাসনিক অনুমোদনের ব্যাপারে সহযোগিতা করেননি।’

কাগজে-কলমে ৫০ শয্যার হাসপাতালে নার্স থাকার কথা ৪৫ জন, তবে তার বিপরীতে সেখানে আছেন মাত্র ১৯ জন। ৫ জন সুইপারের জায়গায় আছেন মাত্র একজন। তিনজন ওয়ার্ড বয়ের জায়গায় একজন এবং দুজন আয়ার জায়গায় আছেন একজন। তবে নেই কোনো নৈশপ্রহরী বা মালি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, হাসপাতালের একটা অ্যাম্বুল্যান্স আছে, কিন্তু চালানোর কেউ নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া চালক এক বছর বেতন না পেয়ে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র দুটিতে চিকিৎসক আছেন। বাকি ৮টি সাব-সেন্টার বছরের পর বছর শূন্য। সেখানে না আছেন কোনো মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, না আছেন আয়া-পিয়ন। একজন ডাক্তারকে এক গ্লাস পানি দেওয়ার বা রুম ঝাড়ু দেওয়ার লোকটুকুও নেই ইউনিয়ন পর্যায়ে।

হাসপাতালে প্রতিদিন আউটডোরে ৭০০ থেকে ৮০০ এবং ইনডোরে প্রায় ১৩০ রোগী চিকিৎসা নেন। মাসে হাসপাতালে যাতায়াত করেন ১৫ থেকে ১৭ হাজার মানুষ। কিন্তু হাসপাতাল থেকে খাবার বরাদ্দ মেলে মাত্র ৫০ জনের। মাসের ২০ তারিখ পার হলেই শেষ হয়ে যায় সাধারণ সর্দি-জ্বর বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধও। রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, দিনে মাত্র দুবার ডাক্তার আসেন। এদিকে বাথরুমের দুর্দশা এতটাই ভয়াবহ যে, আব্দুর রহিম নামে এক রোগী বলেন, এত নোংরা পরিবেশ বাংলাদেশের কোথাও দেখিনি। মশার প্রাদুর্ভাব এত বেশি যে, আমার ছেলেও এখানে এসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে।

দাঁতের চিকিৎসার একমাত্র চেয়ারটিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। সহকারী ডেন্টাল সার্জন ডা. কানিজ ফাতেমা মিতু বলেন, চেয়ার না থাকায় রোগী দেখাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিন-চারবার চিঠি দেওয়ার পর মেকানিক এসে ঠিক করলেও কয়েকদিন পর আবার নষ্ট হয়ে গেছে। একই অবস্থা ল্যাবেও। জেনারেটর না থাকায় লোডশেডিংয়ে থমকে যায় প্যাথলজি পরীক্ষা। রোগীর যাতায়াতে ধুলায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি। ১২৩ জন রোগীকে মাত্র চারজন নার্স মিলে সেবা দেওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান সিনিয়র স্টাফ নার্স মোসলেমা খাতুন। তিনি বলেন, চারজন আয়া-সুইপার দিয়ে পুরো হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা অসম্ভব। এত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে আমাদের সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে। প্রতি মাসে এই হাসপাতাল ল্যাব ফি, অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া ও অন্যান্য সেবা থেকে প্রায় দেড়-দুই লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। অথচ হাসপাতালের ময়লা পরিষ্কারের জন্য একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

এত সব সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন ধমকের সুরে বলেন, ‘ডাক্তার এখন কম নেই। কয়দিন আগেই আট-নয়জন যোগ দিয়েছেন।’ প্রশাসনিক অনুমোদনের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে আধাঘণ্টা লাগবে বলে তিনি ফোন কেটে দেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান অবশ্য সংকটের কথা স্বীকার করে জানান, তিনি নিজেও এই করুণ দশা দেখেছেন।

রামগঞ্জে সদ্য যোগ দেওয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, জনবল সংকটই মূল সমস্যা। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বিষয়ে বেশ তৎপর। তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিব বরাবর আবেদন দিয়েছেন।স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘৫০ শয্যার নামে আগে মিথ্যাচার করা হয়েছে। আমি মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে দেখা করেছি। দ্রুতই এই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হবে।’

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়