প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৫
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাক্ষরতা দিবস
ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্ক খোঁজা জরুরি

অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিকভাবে চরম ভারসাম্যহীন পৃথিবীর বুকে প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়।’ ‘মানুষের জন্য সাক্ষরতা, এই গ্রহের জন্য সাক্ষরতা এবং সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য। অন্তর্ভুক্তিকরণ, টেকসই ভবিষ্যত, মানুষের জীবনধারণের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করাকে গুরুত্ব দিয়ে দিবসটি গোটা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আজ।
ডিজিটাল যুগে আরও এক ধাপ অগ্রসরমান প্রযুক্তি, যা এ আই নামে পরিচিত গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। মানুষ এখন চিন্তা কিংবা দুশ্চিতার মধ্যে আছে যে, তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন, যা কাজ বা চাকরি নামে পরিচিত অদূর ভবিষ্যতে সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না, কারণ মানুষেরই সৃষ্ট এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে তাদের জায়গা দখল করে বসেছে। কোনো বিষয় জানার জন্য কোনো বইয়ের দরকার হচ্ছে না, রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য মনুষ্য পুলিশ দরকার হচ্ছে না, বিশেষ কিছু খোঁজার প্রয়োজন নেই— কারণ এআইকে বলে দিলেই হলো। দুনিয়া সার্চ করে আপনার সামনে সমাধান নিয়ে হাজির হবে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি আর অগ্রসরমান জ্ঞানের ধারা মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে আর সেখানে সাক্ষরতা বলতে যা বোঝায়, তার সংজ্ঞাই কি হবে বা হওয়া উচিত এবং এ নিয়ে আমাদের কাজ কি এবং কতটা কি করতে হবে সেই বিতর্ক সামনে আসছে।
দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তির এই যুগে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পুরনো স্টাইলের সেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো নামক প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি পোস্টার টানিয়ে স্লোগান লিখে দু-চারজন মানুষ ডেকে কিছু কথা বলবে, আর ভুরিভোজের মাধ্যমে দিনটির গুরুত্ব শেষ করবে সেই সময়ে কি আমরা বাস করছি? বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম অগ্রগতি আর মানবতা ও মনুষত্বের চরম অবনতির যুগে কি ভূমিকা রাখা প্রয়োজন, কি করতে হবে সেটি কে বা কারা নির্ধারণ করবে?
যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষার মানকেও এই দিবসটির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু অক্ষর চিনতে পারা আর নিজের নাম লিখতে পারার নাম যে সাক্ষরতা দিবস নয়, তা বহু বছর আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিক্ষার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে যে মানহীন শিক্ষার প্রসার ঘটেছে সেটিকে রুখতে পারাও এই সংজ্ঞার মধ্যে ফেলতে হবে! শুধু খাতা ভর্তি করে দাগিয়ে আসলেই যেখান পাস ধরা হয়, সেটি সাক্ষরতার কোন পর্যায়ে পড়ে, সেটির ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন এই দিবসটিতে।
ডিজিটাল যুগের সঙ্গে লিটারেসির সম্পর্ক কি সেটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন। লিটারেসি দিবস পালনের ধারণা শুরু হয় সেই ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দর ২৬ অক্টোবর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ১৪তম অধিবেশনে ৮ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পালন শুরু হয় সেই ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ। জনসাধারণকে আরও শিক্ষিত, ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ এবং টেকসই সমাজ গঠনের জন্য সাক্ষরতার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য দিবসটি পালিত হয়ে আসছে; কিন্তু বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপট, শিক্ষাসহ জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি, আবার মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক সমাজের পরিবর্তে দেশে দেশে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান, অনুশীলন ও চর্চা, বাণিজ্য অবরোধ, মারণাস্ত্রের প্রসার এবং নিরীহ মানুষের জীবনহানি লিটারেসির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা এগিয়েছে, কতটা সামঞ্জস্যের কাছে গেছে সেই হিসাব কষতে হবে। এই জটিল পরিস্থিতিতে আমাদের হিসাব কষতে হচ্ছে- লিটারেসির অবস্থান, সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা ও কর্মপদ্ধতি।
ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৭৩ দশমিক ৯ কোটি কিশোর, যুবা ও প্রাপ্তবয়স্ক মৌলিক সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত, যাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই নারী বিদ্যালয়ে যায় না বা শিক্ষার আলো পায় না। বিশ্বের কোটি কোটি শিশু না খেয়ে ঘুমোতে যায় এবং মারা যায় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। আর এক দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য বা পঙ্গু করার জন্য আরেক দেশ তৈরি করছে কোটি কোটি বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আর যুদ্ধ বিমান! এর সঙ্গে কী সম্পর্ক এই সাক্ষরতার? আমার বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ষাট শতাংশের মতো মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করে পথে-ঘাটে, পাকিস্তানের বহু মানুষ এখনো অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায় অথচ এই দুই দেশের পারমাণবিক বোমা আর প্রতিরক্ষা ব্যয় আকাশচুম্বী। এ বাস্তবতায় একটি রুমে দু-চারজন মানুষ সাক্ষরতা দিবস কাকে বলে, কি এর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন আর গোটা দুনিয়া বুঝে ফেলবে এর গুরুত্ব সেটি বাস্তবতার কতটুকু দূরে, সে হিসাবে কে কষবে?
সাক্ষরতা সবার মৌলিক অধিকার; কিন্তু যে সমাজ আমরা সৃষ্টি করেছি, যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করেছি তাতে সাক্ষরতা ও শিক্ষা বিশেষ করে প্রকৃত শিক্ষা, মানসম্পন্ন শিক্ষা পেছনের সারিতে অবস্থান করছে। সমতার কথা, মানবিক অধিকারের কথা, মানবতার কথাও চলে আসে সাক্ষরতার সঙ্গে। সেই দৃষ্টিকোণ দিয়ে গোটা পৃথিবীর দিকে তাকালে আমরা অধিকারহীনতা, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মানুষের রক্তদান, আত্মাহুতি আর জীবন-মরণ সংগ্রামই দেখতে পাচ্ছি। সেখানে লিটারেসি, ডিজিটাল লিটারেসির জায়গা কোথায়? পৃথিবীর প্রায় ৭৭৫ মিলিয়ন অধিবাসীর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় অক্ষরজ্ঞানের অভাব রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি পাঁচজনের মধ্যে এখনো একজন শিক্ষিত নন এবং এই জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই নারী। বিশ্বের প্রায় ৬০ দশমিক ৭ মিলিয়ন শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং আরও অনেকে অনিয়মিত বা শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বে মানবজাতির জন্য যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তার মোটামুটি সুষম বণ্টন হলেও কি বিশ্বে সাক্ষরতা তথা শিক্ষিতের এই হাল হতো? গোটা বিশ্বে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেসব দিবস পালন করা হচ্ছে এবং সেখানে যেসব আলোচনা হয় বা পদক্ষেপের কথা বলা হয়, তা সবই আটকে যায় ঐ জায়গাটিতে। কাজেই এখন কথা বলতে হবে এগুলো নিয়ে, তা না হলে যুগ যুগ ধরে আমরা আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করে যাব আর বিশ্বের তাবত অর্থনীতি যারা ডিল করেন, যারা মানুষ মারার মারণাস্ত্র বানিয়ে গোটা মানবজাতিকে হুমকির মুখে ফেলে দেন, তারা এসব জায়াগাতেই বিনিয়োগ বেশি বেশি করতে থাকবেন। ফিলিস্তিনের অবরোধ শিশুরা যখন বাবা-মা, বাড়ি ঘর সব হারিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে, তার কাছে কেউ নেই, তার সামনে পেছনে ঘন অন্ধকার, ক্ষুধার জ্বালায় হাড্ডির সঙ্গে চামড়া লেগে গেছে, সে অবস্থায় ত্রাণের জন্য কারুর সঙ্গে গিয়ে গুলি খেয়ে আসতে হয়, সেই গ্রহে কিসের লিটারেসি, কাদের লিটারেসি, কেন লিটারেসি, এই লিটারেসির মানে কি, সেই উত্তর আমাদের বের করতে হবে।
সাক্ষরতা হলো মানুষের জন্য বিস্তৃত জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, মনোভাব এবং আচরণ অর্জনের একটি ভিত্তি। এটি সমতা, বৈষম্যহীনতা, আইনের শাসন, সংহতি, ন্যায়বিচার, বৈচিত্র্য এবং সহনশীলতার প্রতি আলোকপাত করে। উপযুক্ত সাক্ষরতা স্থায়ী শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলে। সাক্ষরতার এসব উদ্দেশ্য ও সংজ্ঞা থেকে আমরা বর্তমান বিশ্বের অবস্থান তুলনা করলে যেসব চিত্র দেখতে পাই, সেগুলোর সঙ্গে সাক্ষরতার সমন্বয় ঘটাতে হবে, তা না হলে অক্ষর দেখা, পড়া আর সই করতে পারা নিয়ে মিটিং, শোভাযাত্রা আর বড় বড় সেমিনার করার মধ্যে কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।
১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ ইউনেস্কো সাক্ষরতার যে সংজ্ঞাটি নির্ধারণ করে যে, ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে। এই সংজ্ঞাটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বহু বছর আগেই। একজন ব্যক্তি ভালভাবে বাংলা পড়তে পারলেন, সাধারণ যোগ-বিয়োগ পারলেন; কিন্তু বর্তমান যুগের ডিজিটাল ডিভাইসগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন, ব্যবহার করতে জানেন না, তাকে আমরা কি বলবো? একজন মানুষকে সাক্ষর বলা মানে তাকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করা যে, বর্তমান যুগের সঙ্গে তিনি তাল মেলাতে পারছেন; কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তিনি পারছেন না, কাজেই সাক্ষরতার সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে, আমাদের জীবন পাল্টে গেছে, শিক্ষাদান ও গ্রহণের পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। আরও একটি বিষয় এখানে চলে আসে, সেটি হচ্ছে বৈশ্বিক এই প্রেক্ষাপটে শুধু নিজের দেশের ভাষায় যদি একজন লোক সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হন, তাতে কিন্তু গ্লোবাল ভিলেজের নাগরিক হিসেবে প্রকৃত অর্থে তিনি সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নন কারণ যেসব প্রয়োজনীয় তথ্য একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সেটি স্বাস্থ্য সম্পর্কিত হোক আর নিরাপত্তা সম্পর্কিতই হোক, তাকে কিন্তু জানতে হচ্ছে আর সেটি জানার জন্য একটি গ্লোবাল ল্যাংগুয়েজের সঙ্গে পরিচিত হতে হচ্ছে। যেমন এখন ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা কিছু শেয়ার করা হয়, সেই সাক্ষরতা কিন্তু ইংরেজিতেই করতে হয়। শুধু বাংলায় করলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কিংবা এলাকা বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কাজেই সাক্ষরতার সংজ্ঞা এখন ব্যাপক ও বিস্তৃত হতে বাধ্য।
গোটা পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত। তরুণদের মধ্যে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রয়েছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। ১৩ থেকে ১৭ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগ প্রোফাইল রয়েছে। তারা দিনে দুঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে। ছাত্র-শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিশু-কিশোর, গৃহিণী, পেশাজীবী—এদের বেশিরভাগেরই এখন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ইউটিউব ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা ১৫০ কোটির বেশি, হোয়াটসঅ্যাপ ১২০ কোটির বেশি। আমরা এগুলো ব্যবহার করছি কেন? উত্তর সবারই জানা। এটি লিটারিসি নয়?
এগুলোর সঙ্গে সততা, মমত্ববোধ এবং মানবিকতাকেও পাশে ফেলে দেওয়া যাবে না। আপনি আধুনিক যুগের সব কিছুতেই পারদর্শী কিন্তু আপনার মমত্ববোধ নেই, মানবিকতা নেই, অর্থনৈতিক সততা নেই। কি দেবেন আপনি সমাজ ও দেশকে? সবকিছু জিইয়ে রেখে সাক্ষরতা বা শিক্ষা দিবস পালন করবেন, কার জন্য? তাই কিসের জন্য? মানবকেন্দ্রিক পুনরুদ্ধারের শক্ত ভীত গড়তে হবে। ব্যক্তি থেকে সেটি শুরু করতে হবে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ১০ বছর বয়সীদের প্রায় ৭০ শতাংশ একটি সাধারণ বাক্য পড়তে বা লিখতে পারে না এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৭৩ মিলিয়ন স্কুলছাত্রী ক্ষুধার্ত অবস্থায় স্কুলে যায়। গাজার পরিস্থিতি ব্যখ্যা করার জন্য অভিধানে উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তার মধ্যে শক্তিধর দেশগুলো প্রদর্শন করছে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং সামরিক কুচকাওয়াজ। কোথায় ফিলিস্তিন, কোথায় লেবানন, আর কোথায় আফ্রিকার অভুক্ত শিশু ও যুবারা? কোথায় তাদের বাঁচার অধিকার আর কোথায় সাক্ষরতার অধিকার? এ বিষয়গুলো আজ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে বিশ্বকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা না হলে সবই বৃথা!
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করার সহজ কৌশল
ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা—এসবের মধ্যেই একটা ব্যবসার আইডিয়া মাথায় ঘুরছে। মনে হচ্ছে এখনই শুরু করা দরকার, কিন্তু সাথে সাথে প্রশ্নও উঠছে, পড়াশোনার পাশাপাশি এটা আদৌ সম্ভব কিনা। বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়টাই ব্যবসা শুরু করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময়গুলোর একটা, ঠিক ব্যস্ততার কারণে না, বরং এই সময়ে থাকা সুরক্ষা আর সুযোগের কারণে।
মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ডের ডর্ম রুম থেকে ঋধপবনড়ড়শ শুরু করেছিলেন, মাইকেল ডেল টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় উবষষ শুরু করেছিলেন, এমন একটা ছোট শুরু পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৭৩.৫৪ বিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের একটা কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই গল্পগুলো ব্যতিক্রম মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের নীতিগুলো যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই প্রযোজ্য। চলুন দেখি— পড়াশোনার পাশাপাশি কীভাবে একটা ব্যবসা গড়ে তোলা যায়।
ছোট শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ
একটা পণ্য, একটা সার্ভিস, একধরনের ক্লায়েন্ট, এভাবেই শুরু করা উচিত। এমন কিছু যেটা বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বড় করা সহজ, বরং শুরুতেই অনেক বেশি ছড়িয়ে ফেলা একটা ব্যবসা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে ক্লাসের চাপের সাথে। ঝযড়ঢ়রভু-র একটা জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যবসা শুরু হয় প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা আগে থেকে থাকা দক্ষতা থেকে। নিজের পড়াশোনার বিষয়, শখ, বা এমন কোনো সমস্যা যেটা নিজে সম্মুখীন হয়েছ, সেখান থেকেই সবচেয়ে টেকসই আইডিয়া আসে।
ক্যাম্পাসই একটা ফ্রি রিসোর্স সেন্টার
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে একটা ফ্রি কো-ওয়ার্কিং স্পেস, মার্কেট রিসার্চ ল্যাব, আর নেটওয়ার্কিং চ্যানেল হিসেবে দেখা যায়। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎংযরঢ় পবহঃবৎ বা ইনকিউবেটর প্রোগ্রাম আছে, যেখানে মেন্টরশিপ, পিচ কম্পিটিশন, এমনকি সিড ফান্ডিংও পাওয়া যায়। জটগঅজঈ-এর মতো মার্কেটিং বা বিজনেস ক্লাব, ক্যারিয়ার সেন্টার, আর অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, এই সবকিছুই সম্ভাব্য মেন্টর, পার্টনার, আর প্রথম কয়েকজন গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করে দিতে পারে। এর পাশাপাশি স্টুডেন্ট ইমেইল দিয়ে অফড়নব ঈৎবধঃরাব ঈষড়ঁফ, ঘড়ঃরড়হ, এরঃঐঁন ঝঃঁফবহঃ উবাবষড়ঢ়বৎ চধপশ-এর মতো টুল বিনামূল্যে বা ছাড়ে ব্যবহার করা যায়, যা শুরুর খরচ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
থাকার খরচ আগে থেকেই মেটানো, এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা
শিক্ষার্থী হিসেবে থাকার খরচ, বাসাভাড়া, খাবার, এসব ইতিমধ্যে পরিবার বা বৃত্তির মাধ্যমে মেটানো থাকে। এর মানে ব্যবসাকে ‘লাভজনক’ বলার জন্য যে আয়ের সীমা দরকার, সেটা একজন চাকরিজীবীর তুলনায় অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্সাস ডেটা অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ শতাংশ ছোট ব্যবসা ২৫ হাজার ডলারেরও কম পুঁজি দিয়ে শুরু হয়। কম খরচে, কম ঝুঁকিতে শেখার এই সুযোগটাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
পিচ কম্পিটিশন আর প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া
টাকা খরচ করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎংযরঢ় পবহঃবৎ বা ইনকিউবেটরে খোঁজ নেওয়া উচিত। পিচ কম্পিটিশনে অংশ নিলে বিনামূল্যে মূলধন পাওয়ার সুযোগ থাকে, অনেক প্রতিযোগিতায় ১ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হয়। এষড়নধষ ঝঃঁফবহঃ ঊহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎ অধিৎফং-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও ২০২৬ সালে ৩৭টা দেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে, এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম শুধু ফান্ডিং না, নেটওয়ার্ক আর অভিজ্ঞতাও তৈরি করে দেয়।
দ্রুত একটা গঠচ লঞ্চ করা
নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে একটা নির্দিষ্ট লঞ্চ ডেডলাইন ঠিক করে ফেলা উচিত। একটামাত্র পণ্য বা একটামাত্র মূল সার্ভিস দিয়ে শুরু করা, প্রথম পাঁচজন পেয়িং কাস্টমার জোগাড় করা, আর তাদের কাছ থেকে টেস্টিমোনিয়াল নেওয়া, এটাই একটা বাস্তবসম্মত প্রথম লক্ষ্য হতে পারে। এরপর বিনামূল্যের চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া, ক্যাম্পাস ইভেন্ট, স্টুডেন্ট গ্রুপ, ব্যবহার করে ধীরে ধীরে মার্কেটিং প্ল্যান তৈরি করা যায়।
সময় ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
পড়াশোনা আর ব্যবসা একসাথে সামলানোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কোনো একটাতে অতিরিক্ত সময় দিয়ে অন্যটাকে অবহেলা করা। শুরুতে অল্প কমিটমেন্ট আর কম খরচ নিয়ে কাজ করাটাই নিরাপদ, যাতে ক্লাসের সময়সূচির সাথে সহজেই মানিয়ে নেওয়া যায়। সপ্তাহে নির্দিষ্ট কিছু ঘণ্টা ব্যবসার জন্য আলাদা করে রাখা, আর পরীক্ষার সময় সেই সময়টা কমিয়ে আনার নমনীয়তা রাখা, এই ভারসাম্যটাই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় ব্যবসা শুরু করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ব্যর্থ হলেও হারানোর তেমন কিছু থাকে না, কিন্তু শেখার সুযোগটা থেকে যায় সারাজীবনের জন্য। ছোট শুরু, ক্যাম্পাসের রিসোর্স কাজে লাগানো, আর বাস্তবসম্মত সময় ব্যবস্থাপনা, এই তিনটা মিলিয়েই তৈরি হয় একটা টেকসই শুরু। পড়াশোনা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে, এখনই শুরু করাটাই আসলে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সূত্র : স্পাইক স্টোরি।








