প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯
পাঠক ফোরামের কবিতা

ইমরান শাকির ইমরু একটি শিশুর ভূগোল
বোমার আঘাতে যে শিশুটি মারা গেল,
সে জানলোই না
মানচিত্রের বুকে টানা একটি কালো রেখা
কীভাবে একই মাটিকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে।তার অজানা ছিল,
আকাশের কোনো সীমান্ত নেই;
এক দেশের মেঘ অন্য দেশের আকাশেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে,
নদী তার স্রোতের কাছে কোনো পাসপোর্ট চায় না,
বাতাসও ভিসার অনুমতির অপেক্ষায় থাকে না।
প্রজাপতির ডানায় কোনো জাতীয়তা লেখা থাকে না,
ফুলের সুবাস কোনো সীমান্ত চেনে না।কার্তিকের মেঘ দেশ থেকে দেশে ভেসে যায়,
শীতের কুয়াশা নীরবে অতিক্রম করে সব চেকপোস্ট,
পাখিরা সীমানার ওপর দিয়ে উড়ে যায়
তাদের বিরুদ্ধে কোনো অনুপ্রবেশ মামলা হয় না।কেবল মানুষ!
নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে দাবি করে,
তবু মানুষের পথ রুদ্ধ করার জন্য
কাঁটাতার, প্রাচীর আর বন্দুকের পাহারা বসায়।শিশুটি এসব কিছুই জানতো না।
সে জানতো,
রাত নামলে সব দেশের আকাশে একই চাঁদ জ্বলে,
ভোর হলে প্রতিটি জানালায় এসে দাঁড়ায় একই সূর্য।
মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ার ভাষা সর্বত্র এক,
ক্ষুধার কান্নার কোনো অনুবাদ লাগে না,
রক্তের রংও মানুষের শরীরে ভিন্ন হয় না।তাই তার বিশ্বাস ছিল
একটি আকাশের নিচে পৃথিবীও একটাই দেশ,
মানুষও একটাই জাতি।ছোট্ট হৃদয় মানচিত্র পড়েনি,
কিন্তু মানুষ চিনেছিল।
রাষ্ট্র চিনেনি,
কিন্তু মমতা চিনেছিল।
পতাকা চিনেনি,
কিন্তু অশ্রুর ভাষা চিনেছিল।তারপর একদিন
বড়দের সভ্যতা তার সামনে হাজির হলো
একটি বোমার বেশ ধরে।
এক মুহূর্তে থেমে গেল তার শ্বাস,
নিভে গেল তার ছোট্ট জীবনের সমস্ত আলো।
কিন্তু তারও আগে ভেঙে গিয়েছিল একটি স্বপ্নÑ
যে পৃথিবী সবার,
যে আকাশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়,
যে মাটি কোনো কাঁটাতারের উত্তরাধিকার হতে পারে না।সেদিন শুধু একটি শিশুই মারা যায়নি;
নিহত হয়েছিল মানবতার সবচেয়ে সরল স্বপ্নও-
যে স্বপ্ন বলত,
পৃথিবী একটাই।
মানুষও একটাই।মাহমুদ হাসান সজীব
ভাঙা বিশ্বাসএকসময় কিছু মানুষ ছিল খুব আপন,
তাদের হাসিতেই ভরে উঠত সারাটা মন।
বিশ্বাসের হাত ধরে হেঁটেছিলাম অনেক দূর,
ভাবিনি তারাই হবে একদিন এত নিষ্ঠুর।অভিমান জমে আছে নীরব রাতের ভেতর,
কিছু প্রশ্ন আজও ঘুরে ফিরে আসে নিরন্তর।
কেন মানুষ বদলে যায় সময়ের অজুহাতে,
কেন ভালোবাসা হেরে যায় স্বার্থেরই হাতে?তবু আমি এখনো ভাঙিনি পুরোপুরি,
কষ্টগুলো লুকিয়ে রাখি নিঃশব্দ অন্ধকারে জড়ি।
কারণ জানি, রাত শেষ হলে সকাল আবার হবে,
শুকিয়ে যাওয়া মনটাও একদিন নতুন রঙে রবে।যারা ছেড়ে গেছে, যাক না দূরে হারিয়ে, আমি আবার বাঁচতে শিখবো নিজেকে আগলে নিয়ে।
এম আর এম শোভন
বেদনার উৎসববিরহ শূন্যতা নয়,
সে এক নিভৃত উৎসব,
যেখানে কোলাহল থেমে গেলে
শুরু হয় ভালোবাসার আসল আনন্দ।
দূরত্ব তোমায় হারিয়ে দেয়নি,
বরং বুকজুড়ে এঁকেছে,
এক চিরন্তন মানচিত্র।
মিলনে যা ছিল
কেবল ক্ষণিক স্পর্শ,
বিরহে তা হয়ে উঠেছে,
এক অনন্ত প্রার্থনা।
চোখের জলের প্রতি ফোটায়
জ্বলে ওঠে অনুভূতির প্রদীপ,
তুমি কাছে নেই বলেই তো
প্রতিটি নিঃশ্বাসে
এত তীব্র তোমার উপস্থিতি।
এই যে পাওয়ার তীব্রতা
অসীমে ছড়িয়ে পড়াÑ
তার চেয়ে বড় আনন্দ
আর কী হতে পারে?
বিরহ তো হারানো নয়,
সে তো প্রেমের
এক পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠা উৎসব।সামিরা মেহনাজ নুসরাত আজ নয় কাল
চাঁদপুরে বাস করে হারাধন পাল,
সব কথাতেই বলে আজ নয়-কাল।
বাড়িওয়ালা তার কাছে চায় যদি ভাড়া,
আজ নয় কাল দেব, কেন এত তাড়া?
বউ যদি মার্কেটে যেতে বলে তাকে,
আজ নয়-কাল যাবো কোনো এক ফাঁকে।
ছেলে বলে, বাবা আমি চায়নিজ খাবো,
বাবা বলে, আজ নয় কাল নিয়ে যাবো।
একদিন জ্বরে পড়ে কাঁবু হল হারা,
ডাক্তার ডাকো বলে মাতালো সে পাড়া।
সবাই জবাব দিল ঝেড়ে খুব ঝাল।
ডাক্তার ডাকা হবে আজ নয় কাল।
হারার মাথায় পড়ে বিনা মেঘে বাজ,
সেই থেকে বলে হারা কাল নয় আজ।মো. ফরহাদ হোসেন স্বপ্ন
জন্ম আমার পাখির বাসায়
উড়ার স্বপ্ন নিয়ে,
তবুও আমি উড়তে পারিনি
পশু মানবের ভয়ে।
বললাম মাকে আকুতি করে
আমায় নিও সাথে!
তবেই আমি উড়তে পারবো
তোমাদের মতোই করে।
কত ভয়ানক গল্প শুনালো
রাত্রি ভরে মা,
আরো কত ভয় দেখালো
করলো আমায় মানা।
কে এসবে কান দিয়েছে
কেবা শুনে কথা
কাল সকালে মুক্ত হবো
আমি পাখির ছানা।
সকাল হলো খুশি মনে
উড়বো বলে মায়ের সাথে!
বোঝার আগেই হয়েছি শিকার
পশু মানবের হাতে!
স্বপ্ন আমার স্বপ্নই থাকলো
পূরণ হলো আর কই!
আমি যে এক অবুঝ ছানা
ডানা ভেঙ্গে রই!
উড়বার স্বপ্ন নাই বা আর হোক
এই পাখিটির মনে
তবেই আমি থাকবো খুশি
ওই বিধাতার কোলে।আসাদুজ্জামান খান মুকুল বিবর্তনের পাঠ
আমাদের মাঝে এখন
এক বিশাল আলোকবর্ষ সমান দূরত্ব।
যেখানে হৃদয়ের সব ব্যাকরণ আজ বড়ই অর্থহীন।
আমি চেয়েছিলাম এক স্থিরবিন্দুর মতো পাশে থাকতে,
কিন্তু তুমি চললে সময়ের অমোঘ স্রোতে।
মস্তিষ্কের কোষে চলে
অবিরত ভাঙাগড়ার এক নিদারুণ খেলা,
যেখানে বিসর্জন মানেই আসলে এক নতুন অভিযোজন।
শৈবাল যেমন পাথর আঁকড়ে বেঁচে থাকে বহুকাল,
আমিও তেমনি
তোমার না থাকাটাকে অভ্যাসে বদলেছি।
অস্তিত্বের এই দহনে কোনো ধ্রুবক নেই,
মানুষ কেবল বদলে যাওয়ার এক চলমান করুণ ইতিহাস।








