শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৫

থেমে গিয়েছে কণ্ঠস্বর

হাসানাত রাজিব
থেমে গিয়েছে কণ্ঠস্বর

যেখানে দুটো পথ গিয়েছে বেঁকে কোন এক অসমাপিকা সবুজ অরণ্যে। সেখানেই আমার জীবনের মানে খুঁজে পাওয়া। এখানে জোছনারা সব ঢলে পড়ে নিসর্গ সৌন্দর্যের আবরনে। এখানেই আমি আমার অযাচিত মনের প্রত্যাশিত প্রশ্নের সব উত্তর খুঁজে পাই। এখানে ঝড় বৃষ্টির কোন প্রবেশাধিকার নেই। রোদ এখানে অনুমতিক্রমে আসার সুযোগ পায়। আমি আমার নিভৃত মনে যা কল্পনা করি তাই বাস্তবিক ব্যাবধান এড়িয়ে সামনে এসে হাজির হয়ে যায়। আমার মস্তিষ্কে কাউকে খুন করার বাসনা জাগে। আমি এখানে খুন করা শিখতে আসি। একটা খুন করতে চাই। নৃশংস খুন। ভীষণ নিষ্ঠুরতার সাথে খুনটি আমি করব। সাইনাকে কথা দিয়েছিলাম একটা খুন করেই আমি তার বাবার সামনে যাব।

একটা গাছের গুঁড়িতে শেওলা জমে গাছটাকেও গ্রাস করে ফেলেছে। গাছটা আরও বড় ছিল। গতকালকে কেউ হয়ত ক্ষুধার প্রকোপে গিলে খেয়েছে। যে যা সামনে পেয়ে যায় তাই নিজের মনে করে গিলে খায়। আমি তাদের দলভুক্ত হয়ে যেতে চাই না। আমি শুধু সাইনার জন্য একটা খুন করতে চাই। ‘আমি নিশ্চল, নির্বিকার আর অস্তিত্ববিহীন একটা পুতুল। আমি সামনে এগোই না, আমাকে এগিয়ে নেয়। আমি ততক্ষণ তোমার সম্পদ হব না, যতক্ষণ আমাকে হতে দেয়া না হয়।’ সাইনার অকপট এই কথাগুলো বলে যাওয়া আমাকে দ্বিখণ্ডিত করেছিল শত টুকরায়। তার কথাতে খুনের নেশা ছিল। নৃশংস খুনের নেশা। এতটুকু উপলব্ধিতে এসেছিল তাকে পেতে আামার তার মালিককে আগে পেয়ে যেতে হবে। তবে সেটা খুন করেই পেতে হবে তা আমার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে ততটা ঝেকে বসেনি তখনো।

আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন। সকালের সূর্য সন্ধ্যের আকাশে অস্ত যেতে ব্যাকুল হয়ে যাচ্ছে। আধারে পা ফেলে সাইনাকে হারানোর সাহস আমার হয় না। এই বিষয়টাতে বেজায় সতর্ক। পুরো শরীরটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পরছে। চিন্তার দৃশ্যপটে সাইনার বাবার সাথে কথোপকথনের একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট আঁকার চেষ্টা করছি। পুরো শরীর ঘামে ভেজা থাকবে। দু হাত আর শার্টেও বিভিন্ন জায়গায় রক্তিম বর্ণের একাট্টা আবহ বিরাজমান থাকবে। ‘আমি খুনি। খোলা আকাশের নিচে, নিসর্গ প্রকৃতির জোড়া করতালির মধ্যে আমি খুনটা করেছি। এই নিন রক্ত। বিনিময়ে আমার সাইনাকে দিন’। ভীষণ চিৎকার করে কথাগুলো বলেই থেমে যাব। শরীরের প্রত্যেকটা শিরা আর উপশিরা কাঁপতে থাকবে। বিক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর সেদিন ক্রমাগত বিদ্রোহী মিছিলের সেøাগানে প্রত্যেকটা জীবিত অস্বিত্বকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রব। সেদিন থেকে আমার এই অস্থিরতার ধারালো ছুড়ির মূহুর্মূহু করাঘাতের সমাপ্তি ঘটবে।

হঠাৎ আমার দুর্বলচিত্তে ভয়ংকর এক দৈত্য বিরবির করে বলছিল সাইনার বাবাকেই এর কোণঠাঁসা থেকে মুক্ত করে দিই। এই লোকটাই তো সমস্যা। খুনটা করেই ফেলি। কি নেই আমার! আমার সবকিছুই আছে। একটা মানুষের যা কিছু থাকলে তাকে সুস্থ বলা যাবে তার সবই আছে আমার মধ্যে। তবু কেণ এত বিপত্তি? আমার দুটো পা আছে যা দিয়ে আমি সাইনাকে নিয়ে স্বর্গের দরজা বরাবর দীর্ঘ পথ হেঁটে যাব। আমার দুটো হাত আছে যেগুলো দিয়ে সাইনার হাতের সরু রেখায় তার সুখের কারণ হব। আমার দুটো নিভু নিভু চোখ আছে যা সতর্ক পাহারায় জেগে থাকবে রাত্রিদিন।

হঠাৎ চেতনায় ফিরি। আবার খুনের নেশায় বুঁদ হই। সাইনা কি আমার দেহের প্রত্যেকটি শিরা উপশিরার সাথে ক্রমাগত আমার লড়াই দেখে না? নাকি দেখতে চায় না? যেদিন সাইনাকে প্রথম দেখেছিলাম, আমার দেখাতে সে এক মহাকাব্যিক বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে দিয়েছিল। কোন রাখঢাক না রেখেই হাত দুটোকে মুঠোবন্দি করে ভালবাসি জানিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে আচমকা প্রশ্ন করে বসলো আপনি চোখে দেখেন তো? শুধু আপনাকে দেখে উত্তাল তরঙ্গ পারি দিতে পারলে চলবে-মায়াভরা এই কথাটির মায়া সে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেদিনটির পর আর হেসেছি কিনা মনে করতে পারছি না। হাসতেই চাইনি আমি। আমাকে হাসতে দেয়া হয় না। একটা খুনের শেষে আমি মন খুলে হাসব।

ঠিক সন্ধ্যে নামার আগে আমার মনের গভীরে নেমে এসেছে একটি সহজ সরল প্রশ্ন। এই সহজ প্রশ্নটাই আমাকে আমার ব্যক্তিত্বের বিপরিত প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। সাইনা কি আমার মতোই ভেঙ্গেচুড়ে আবার নিজেকে গড়ছে, গড়ার পূর্বেই আবার ভেঙ্গে চুরমার হচ্ছে? নাকি পুরোটাই আমার মানসিক যুদ্ধ? আমাকে তার মুখোমুখি হতে হবে।

আজ দুজন মুখোমুখি। চারপাশ অদ্ভুত নিস্তব্ধ। বাতাস যেন থেমে গেছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের শব্দ যেন বিস্ফোরণের আওয়াজ। আমি দাঁড়িয়ে সাইনার সামনে। ভিতর থেকে কেউ যেন বলছে আজ কিছু একটা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, ক্রমাগত লড়াই করতে থাকা অভিমান আর চূড়ান্ত অবসাদ-এ সবকিছুই আজকে একটা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যাই। আর সে পেছনে পা ফেলে। আমার চোখে এক অস্বাভাবিক প্রশান্তি বিরাজ করছে। কোন কথা হচ্ছে না, নেই কোন অযাচিত প্রশ্ন। চারটি চোখ যেন বিড়বিড় করে কথা বলছে। হঠাৎ সাইনার চোখে ভয়। সে সরে যেতে চাইল। কিন্তু দেরি হয়ে গেল। সবকিছু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘঠে গেল। সাইনার নিথর দেহ পরে রইল। ভালবাসা যদি বেঁধে রাখতে না পারে, তাকে মুক্তি দিতে হয়। কিন্তু আমি সেটা শিখতে পারিনি-শিখিনি। আমি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে আর নিঃস্পন্দে। যে কণ্ঠস্বর উচ্চ প্রতাপে আমার ভেতর আর বাহির বিদীর্ণ করে দিয়েছিল, থেমে গিয়েছে সে কণ্ঠস্বর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়