প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৪
ধারাবাহিক উপন্যাস-৪০
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)
প্রতিটি বাবার স্বপ্ন থাকে ছেলের বউ, নাতি-পুতি দেখে যেতে। নাতি-পুতির বিষয়ে জানি না তবে ছেলের বউ ঠিকই দেখে গেলাম। রাতে বসে ডায়েরিতে সবকিছুই লিপিবদ্ধ করেছি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাসপাতালে থাকায় যে আনন্দগুলো করতে পারিনি ডায়েরিতে লিখে তা করছি। স্বপ্ন দেখতে অর্থ লাগে না তাই নিজের মতো করে স্বপ্ন সাজাই। এর মধ্যে বিশাখাকে আর দেখতে পাইনি। বিয়ের বিষয়ে প্রতিটি মেয়েই লজ্জা বোধ করে বয়োজেষ্ঠ্যদের সামনে আর আমি তো পিতৃ সমতুল্য, এমন একটা বিষয়ে তার লজ্জা পাওয়াটা যথার্থ। এদিকে তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে বাসায় ফিরি। নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবার আমায় সাদরে অভিনন্দন জানাল। আজ বিশাখাকে দেখতে পাচ্ছি না হয়তো কলেজে গেছে কিন্তু ওর তো মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ তাহলে কলেজে গিয়ে কী করবে! বিকেলে যথারীতি বাগানে গাছগুলো নিয়ে মেতে আছি ঠিক তখনি বিশাখার আগমন কতগুলো ফুল হাতে নিয়ে।
‘কাকাবাবু এগুলো তোমার জন্য।’
‘এত ফুল আমি রাখব কোথায়?
‘সমস্যা নেই ফুলদানিও কিনে এনেছি তুমি নিজের ঘরে রেখে দিও।’
‘আরে দেখ দেখি মেয়ের কাণ্ড। এগুলো একদিন পর আবর্জনা হয়ে যাবে বরং আমার বাগানের ফুলগুলো প্রতিদিনই সতেজতা দিয়ে যায়। চল আজ তোকে কিছু দেই।’
‘কী?’
‘চল তাহলে নিজেই দেখতে পাবি।’
‘ঠিক আছে।’
‘মনমোহন...’
‘আজ্ঞে বড়বাবু।’
‘আমার কেবিনেটের চাবিটা দিয়ে যাও।’
‘আজ্ঞে আনছি।’
বিশাখা আর আমি আমার রুমে চলে আসি এদিকে মনমোহন গেছে চাবি আনতে। হাসপাতালে থাকা কালীন আমার রুমের সবকিছু মনমোহনের দায়িত্বে রাখা ছিল। বউ নেই, কাছে সন্তানও নেই তাই মনমোহনই আমার পরিবারের ভরসার কোনো একজন। বিশাখা তখনো জানে না তার জন্য কী রাখা আছে। মনমোহন চাবি দিয়ে গেলে ক্যাবিনেট থেকে রাজীবের মায়ের বালা জোড়া বের করে নেই।
‘আমার কাছে আয় দেখি। এগুলো তোকে তুলে দিলাম।’
‘এটা কী কাকাবাবু?’
‘রাজীবের মায়ের বালা জোড়া। এটা আমাদের বংশের পরম্পরাও বলতে পারিস। রাজীবের ঠাকুম্মা দিয়েছিল তনুশ্রীকে। সে তো বেঁচে নেই তাই পরম্পরার দায়িত্বটা আমাকেই বেছে নিতে হলো। তোকে এতদিন মেয়ের মতো ভাবতাম আজ থেকে ভাবছি ছেলের বউ হিসেবে।’
‘কাকাবাবু রাজীব আমাকে সেভাবে ভাবে কী না আমি জানি না তাই আমি চাই না আপনি ভুল প্রমাণিত হন। এটা আপনার কাছেই থাক কখনো সেরকম কিছু হলে না হয় আমায় পড়িয়ে দিবেন।’
‘আমার ছেলেকে আমার চাইতে তুইও ভালোভাবে চিনিস না তাই আমি ভুল হতে পারি না। ওর মনের গভীরে কী লালন করছে সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারি। আমার জানার ছিল তোর বিষয়ে। তোর যদি তাতে আপত্তি থাকে তাহলে আমি জোর করছি না।’
‘আপনি সত্যি বলছেন!’
‘আমি শুধু ওর বাবাই নই একজন বন্ধুও বটে তাই তোকে জানার প্রয়োজন ছিল। তাহলে কী আমি অন্য কিছু ভাবতে পারি! নাকি যা ভেবেছি সেটাকেই সঠিক মনে করব? উত্তরটা আমার কাছে নেই, তোর কাছে।’
কথাটা বলার সাথে সাথে বিশাখা হাত বাড়িয়ে দেয়। বালাগুলো তাকে নিজ হাতে পরিয়ে দিই। আজ তনুশ্রী বেঁচে থাকলে হয়তো দায়িত্বটা সে পালন করত। বিশাখাকে ছেলের বউ হিসেবে ভেবে আমার মনের বাসনা পূর্ণ হয়েছে, এখন পরপারের ডাক এলেও ভয় নেই। মৃত্যু চিন্তা ইদানীং বেশ ভর করছে মনে আর তাই জীবনের সকল কিছু গুছিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মাদের মতো হয়ে আছি। সময় যে বেশ অল্প আর জীবনের শেষ যাত্রাটা কখন শুরু হয় তার আগে অসম্পূর্ণ কাজগুলো যতটা সম্পন্ন করা যায়। নতুবা মরে গিয়েও হয়তো শান্তি মিলবে না। ইদানীং ইচ্ছে হয় সকলের সাথে দেখা করি, কুশল বিনিময় করি আর যারা ভুলে গেছে আমায় তাদেরও মনে করিয়ে দেই আমি আজও আছি তোমাদেরই একজন। সময় ফুরিয়ে এলে বোধ হয় মানুষ অনেকটা উদার হয়ে উঠে। কারো কোনো পাওনা আছে কী না নতুবা কেহ কখনো কষ্ট পেয়েছিল কী না? পাওনা চুকিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টাও এখান থেকেই শুরু হয়। ছেলেটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, মনে হয় যেন কাছে পেলে আগলে ধরি আর বলি আমাকে আর দূরে রাখিস না। আমার যাওয়ার বেলায় যেন তোকে দেখেই অন্তীমে পাড়ি দেই। কথাগুলো ডায়েরিতে লেখা রয়েছে কারণ আমি জানি এটা আমার পক্ষে করা সম্ভব না। জীবনের নিয়মে আমরা গতিশীল তাই এই নিয়মে আমিও বাঁধা।
[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]








