প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:১৯
৫২ বছরের পথচলায় অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী

‘নাটক’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ অভিনয়যোগ্য সাহিত্যগ্রন্থ বা দৃশ্যকাব্য। এই গ্রন্থ বা দৃশ্যকাব্যকে যারা জীবন্ত কর তোলেন, অর্থাৎ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে দৃশ্যাকারে তুলে ধরেন, আমরা তাদেরকে অভিনয় শিল্পী বলে আখ্যায়িত করে থাকি। চাঁদপুরের অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী ও অভিনয় শিল্পী সৃষ্টির এক দক্ষ প্রতিষ্ঠান।
‘আমরা অনন্যা-নাটক আমাদের রক্ত ঘামের ফসল’ মূলত এ স্লোগানকে ধারণ করে ১৯৭৪ সালের ২৪ অক্টোবর অনন্যা চাঁদপুরের নাট্যাঙ্গনে পথচলা শুরু করে। পরবর্তীতে অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী নামে যার প্রসার ঘটে। এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা হলেন : প্রয়াত অ্যাডভোকেট হরিপদ চন্দ, প্রয়াত সাংবাদিক অজিত কুমার মুকুল, মোহাম্মদ হানিফ পাটওয়ারী, সফিকুর রহমান ও শাহআলম স্বপন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে এখনো অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর সাথে জড়িয়ে আছেন নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক ও নাট্যভিনেতা মোহাম্মদ হানিফ পাটওয়ারী।
দীর্ঘ ৫২ বছরের প্রাচীনতম নাট্য সংগঠন অনন্যা তার পথচলায় ৪৫টি নাটক প্রযোজনায় ৪৮২টি প্রদর্শনী সম্পন্ন করেছে। তন্মধ্যে ‘ইংগিত’ নাটকের ৭৪টি প্রদর্শনী, ‘রূপভান’ নাটকের ৫৫টি প্রদর্শনী উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণ ছাড়া রংপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, কক্সবাজার এবং চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, বলাখাল, ফরিদগঞ্জ, মতলব ও হাইমচরেও নাটক মঞ্চায়ন করে সুনাম বয়ে এনেছে চাঁদপুরের অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অনুদানে ২০১১ সালে অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর তরুণ নাট্যকার জসীম মেহেদী রচিত ‘ভাঙন’ নাটকটি জাতীয় নাট্যোৎসবের উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে মঞ্চস্থ হয়। পরবর্তীতে জসীম মেহেদীর রচিত ‘ভাঙন’ নাটক ঢাকার বেইলী রোডে অবস্থিত মহিলা সমিতি মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়। সে সময়কালে ঢাকার নাট্যপাড়ায় নাট্যশিল্পীদের মাঝে বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছিলো ‘ভাঙন’ নাটকটি।
অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর নিজস্ব আয়োজনে ও ব্যবস্থাপনায় বেশ ক’টি ছোট-বড় আন্তঃজেলা নাট্যোৎসব আয়োজন করা হয় চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ মাঠে, চাঁদপুর ক্লাব মাঠ ছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে। চাঁদপুরে নাট্যাঙ্গনে আমরা গর্ব করে বলতে পারি, একমাত্র অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব প্রযোজনা নিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ৫ দিনব্যাপী ‘ফিরে দেখা’ শিরোনামে নাট্যোৎসবের আয়োজন করে। নাটকের নিজস্ব প্রযোজনাগুলো হলো : রূপভান, রাক্ষুসী, ঘরজামাই, সুবচন নির্বাসনে ও নবাব সিরাজ উদ দৌলা। অনন্যার জন্যে এটি ছিলো বড়ো চ্যালেঞ্জিং।
‘অনন্যা’ এ যাবত যেসব নাটক মঞ্চায়ন করেছে, তার প্রায় সবই আমাদের দেশ, দেশের জনগণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে রচিত। এ সকল নাটকগুলোতে রয়েছে : ইংরেজদের শোষণ, নিপীড়ন, পর্তুগীজ জলদস্যুদের অত্যাচার, পাক-হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, স্বৈরাচারের লোলুপতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সামাজিক অনাচার-দুর্নীতি, দুঃশাসনের কথা, রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য ইত্যাদি। নাটক জীবনের প্রতিচ্ছবি। নাটকের মাধ্যমে অনন্যা সমাজের নানা অসঙ্গতি অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।
অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ে যারা সরব ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই নিজ নিজ দক্ষতায় জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। চাঁদপুর তথা অনন্যা’র আজীবন সদস্য প্রখ্যাত গীতিকার ও সাংবাদিক কবির বকুল, কণ্ঠশিল্পী এসডি রুবেল, আমেরিকা প্রবাসী মডেল ও অভিনয় শিল্পী রেহনুমা দিলরুবা চিত্রা, কণ্ঠশিল্পী দিনাত জাহান মুন্নি ও উপস্থাপিকা নাফিসা জেরিন তিন্নি।
অনন্যা নাট্যগোষ্ঠী একটি বৃহৎ পরিবার। জাতীয় ও চাঁদপুরের নাট্যাঙ্গনে রয়েছে এর সুপরিচিতি। এ পরিবারের সম্পৃক্ত সদস্যরা সমাজ ও মানবতার সেবায়ও যথেষ্ট কাজ করে যাচ্ছে। নাটক মঞ্চায়নের পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ ও বন্যা দুর্গত মানুষের সহায়তায় কাজ করে থাকে। শুধু তা-ই নয়, অনন্যা’র পরিবারে থাকা অসহায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াসহ আর্থিক সহায়তার কার্যক্রমটি সর্বদা চলমান রয়েছে। এমনকি সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সংবর্ধনা দিয়ে থাকে। এটিও অনন্যা’র একটি অন্যতম কার্যক্রম।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ সময় পর্যন্ত অনন্যা’র প্রযোজনাগুলো হচ্ছে : জীবন বৃত্ত পেরিয়ে, অন্ধকারের নিচে সূর্য, বিষের পেয়ালা, বিবর্ণ বিস্ময়, সুবচন নির্বাসনে, স্পাটাকাস বিষয়ক জটিলতা, ফলাফল নিম্নচাপ, যোগফল শূন্য, প্রতিধ্বনি, এখানেই শেষ নয়, কী পেলাম, কবর, একটি অবাস্তব গল্প, কিন্তু নাটক নয়, আলোয় কালোয়, ডাকঘর, শেষ কোথায়, বৌদির বিয়ে, মানুষ, পোস্ট মাস্টার, সংবাদ কার্টুন, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, সভাপতি বলবেন, পাহাড়ী ফুল, মুক্তিমুক্তি, সাত পুরুষের ঋণ, তোমরাই, ইংগিত, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মহাপুরুষ, ঘুম দাও, দ্যাশের মানুষ, রাক্ষুসী, ঘরজামাই, বালক স্বরূপানন্দ, একাত্তরের পালা, রাজাকারের ফাঁসি, রূপভান, দেবদাস, ফুলপরীর দেশে ও আমাদের স্কুল, ভাঙন, জীবন যেখানে যেমন, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও ১৯৭১।
অনন্যা পরিবার মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্থানগুলোতে প্রতি বছর আনন্দ ভ্রমণে অংশ নিয়ে থাকে। এমনকি মাহে রমজানে ইফতার, বাংলা বর্ষবরণসহ রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে সাংগঠনিকভাবে অংশ নিয়ে থাকে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি’র রেপাটরী থিয়েটার প্রযোজিত সরকারি নাটকগুলোতে এ সংগঠনের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, অভিবাসন ইস্যুতে সিসিডিএ আয়োজিত ‘ফ্রি ভিসার ফাঁদে’ সচেতনতামূলক গণনাটক চাঁদপুর জেলার ৬টি উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রদর্শনীর কাজটি চুক্তিভিত্তিক মঞ্চায়ন করে আসছে। জসীম মেহেদীর নির্দেশিত ‘ফ্রি ভিসার ফাঁদে’ গণ নাটকটির ১৮৫ তম মঞ্চায়ন ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।








