প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:১৫
মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মিলনমেলায় চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের ৫৩তম চার্টার নাইট উদযাপন

চাঁদপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের ৫৩তম চার্টার ও ফ্যামিলি নাইট। একইসঙ্গে চাঁদপুর রোটারী ভবনের আধুনিকায়নের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাবেক ও বর্তমান রোটারিয়ান, রোটারী স্পাউস এবং রোটারী লেটসদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। রোববার (১৪ এপ্রিল ২০২৬) বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের নূরুর রহমান কনফারেন্স হলে এ উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
|আরো খবর
শুরু থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে ছিলো উৎসবের আমেজ। সুশৃঙ্খল আয়োজন এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি মিলিয়ে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে এক আনন্দঘন মিলনমেলা। দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে মিলিত হয়ে ক্লাবের সাবেক ও বর্তমান সদস্যরা স্মৃতিচারণে মেতে ওঠেন। পারস্পরিক কুশল বিনিময়, আলাপচারিতা এবং সংগঠনের অতীত-বর্তমান নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রোটারী ভবনের আধুনিকায়নের শুভ উদ্বোধন। ক্লাব সভাপতি রোটা. মো. মোস্তফা (ফুল মিয়া) আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ভবনটি ভবিষ্যতে ক্লাবের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, রোটারী ক্লাব মানবসেবার এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। এই ভবনের আধুনিকায়নের মাধ্যমে আমরা আমাদের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে পারবো এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবো।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চার্টার সদস্য ও অনারারী রোটারিয়ান এমএ মাসুদ ভূঁইয়া। তিনি ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, চাঁদপুর রোটারী ক্লাব তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। আজকের এই ৫৩ বছরের যাত্রা সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
ভবন কমিটির সভাপতি রোটা. সুভাষ চন্দ্র রায় এবং সেক্রেটারী কাজী শাহাদাত প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তারা জানান, ক্লাবের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা এবং দীর্ঘদিনের শ্রমের ফলেই এই আধুনিকায়ন সম্ভব হয়েছে। তারা ভবিষ্যতে আরও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের একটি আকর্ষণীয় অংশ ছিলো সাবেক ও বর্তমান রোটারিয়ানদের স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য। তারা ক্লাবের বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং সফলতার গল্প তুলে ধরেন। এসব বক্তব্যে উঠে আসে ক্লাবের ঐতিহ্য, বন্ধুত্ব এবং সেবার মানসিকতার কথা, যা নতুন প্রজন্মের জন্যে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। রোটারী স্পাউস, লেটস এবং সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব খেলায় অংশগ্রহণ করেন। এতে যেমন আনন্দের সৃষ্টি হয়, তেমনি পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিলো পুরো আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র। রোটারী পরিবারের সদস্য এবং চাঁদপুরের স্থানীয় শিল্পীদের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয় মনোমুগ্ধকর গান, নৃত্য এবং আবৃত্তি। প্রতিটি পরিবেশনা ছিলো প্রাণবন্ত এবং দর্শকনন্দিত। বিশেষ করে দলীয় সংগীত সকলকে মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী ইসমত ফারজানা সুমি, কি-বোর্ড ও সংগীত পরিবেশন করেন শুভ্র রক্ষিত, গীটার ও সংগীত পরিবেশন করেন রাজিব, প্যাড ও সংগীত পরিবেশন করেন এমএইচ বাতেন, রোটা. কাজী শাহাদাতের স্পাউস রোটা. অ্যান. মাহমুদা খানম, রোটা. গোপাল সাহার স্পাউস রোটা. অ্যান প্রীতি রাণী সাহা, আবৃত্তি পরিবেশন করেন রোটা. উজ্জ্বল হোসাইনের লেটস নাওশাবা মেহেরিন নাফিসা। বর্ণ চক্রবর্তীর একতারার সুরের সাথে কণ্ঠ দেন রোটা. অ্যান মাহমুদা খানম, নাসরিন আক্তার, তানিয়া ইসলাম, শাহানা ইসলাম, আমেনা বেগম, খোদেজা মাহাবুব, ফাহমিদা খানম, খোদেজা বেগম প্রমুখ। এছাড়া চাঁদপুর শিশু পরিবারের শিশুদের সংগীত ও নাটিকা উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠানে ভবন আধুনিকায়নের কঠোর পরিশ্রমে বিশেষ অবদানের জন্যে রোটা. নাজিমুল ইসলাম এমিলকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। তার নিষ্ঠা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া ক্লাবের প্রেসিডেন্ট নমিনি রোটা. উজ্জ্বল হোসাইন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ায় তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত সদস্যরা তার এই সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে আরও অগ্রগতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এছাড়া রোটারী লেটসদের মধ্যেও পুরস্কার বিতরণ করা হয়, যা শিশু-কিশোরদের মাঝে আনন্দ ও উৎসাহ তৈরি করে। তাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান রোটা. পিপি শরীফ মাহমুদ ফেরদাউস শাহীন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। তার সাবলীল উপস্থাপনা এবং সময়োপযোগী পরিচালনায় অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। ক্লাব সেক্রেটারী রোটা. নাজিমুল ইসলাম এমিল সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন, যা অনুষ্ঠান সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কেক কেটে ৫৩তম চার্টার উদযাপন করা হয়। এসময় উপস্থিত সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য শুভ কামনা জানান।
সবশেষে আয়োজন করা হয় নৈশভোজের, যেখানে সবাই একত্রে অংশগ্রহণ করেন। সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি চলে প্রাণখোলা আড্ডা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা। এই নৈশভোজের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
সার্বিকভাবে চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের ৫৩তম চার্টার উদযাপন ও ফ্যামিলি নাইট ছিলো এক অনন্য মিলনমেলা, যেখানে আনন্দ, স্মৃতি, সম্মাননা এবং সংস্কৃতির এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং ক্লাবের ঐতিহ্য, ঐক্য এবং মানবসেবার অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
রোটারী ভবনের আধুনিকায়নের মাধ্যমে ক্লাবের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং সমাজসেবামূলক উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবসেবা, নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে এই ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের এই আয়োজন প্রমাণ করেছে, ঐক্য, সহযোগিতা এবং সেবার মানসিকতা থাকলে একটি সংগঠন কীভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। অতীতের গৌরবময় ইতিহাস এবং বর্তমানের সফলতা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এই সংগঠন—এমন প্রত্যাশা নিয়েই শেষ হয় এক আনন্দঘন সন্ধ্যা।







