শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৩৩

সাংস্কৃতিক নীলনকশা বিপন্ন শৈশব ও ঈমানি অস্তিত্বের লড়াই

মুফতি ইউসুফ হোসাইন

বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে, যেখানে সামরিক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দঁাড়িয়েছে ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’। একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এখন আর বোমার প্রয়োজন হয় না, বরং সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতি বদলে দিলেই কেল্লাফতে। মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের এই সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র আজ আমাদের দোরগোড়ায়। আমরা অজান্তেই আমাদের আদরের সন্তানদের এমন এক জীবনধারার দিকে ঠেলে দিচ্ছি, যা তাদের ঈমান, আমল এবং আখলাককে কুরে কুরে খাচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পোশাকের পরিবর্তন এবং বিজাতীয় কৃষ্টি-কালচারকে ‘আধুনিকতা’র নামে চালিয়ে দেওয়া।

পশ্চিমা বিশ্বের এই নীল নকশা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে কাজ করে। তারা জানে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আদর্শ পরিবর্তন করা কঠিন, কিন্তু একটি শিশুর মন সাদা কাগজের মতো। তাই তারা কার্টুন, এনিমেশন, ভিডিও গেম এবং খেলনার মাধ্যমে শিশুদের অবচেতন মনে পশ্চিমা বীরদের ছবি এবং তাদের অশালীন জীবনধারা গেঁথে দিচ্ছে। আমাদের শিশুরা আজ সাহাবায়ে কেরাম বা ইসলামের বীরদের চেয়ে স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান বা পশ্চিমা পপ তারকাদের অনুকরণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যখন একটি শিশু শৈশব থেকেই বিজাতীয় সংস্কৃতির পোশাকে অভ্যস্ত হয়, তখন তার ভেতর থেকে ইসলামের বিশেষ পরিচয় বা ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’ বিলুপ্ত হতে শুরু করে। সে নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেয়ে একজন ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করে, যার কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা নৈতিক সীমানা নেই।

বিশেষ করে পোশাকের ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রটি এখন চরম পর্যায়ে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ‘লেবাসুত তাকওয়া’ বা পরহেজগারির পোশাক। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া শিশুদের এমন সব অঁাটসঁাট ও অশালীন পোশাকে অভ্যস্ত করছে, যা শৈশব থেকেই তাদের লজ্জা ও শালীনতার বোধকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আধুনিকতার মোড়কে তারা ‘জেন্ডার নিউট্রাল’ বা লিঙ্গহীন সংস্কৃতির প্রচার করছে, যেখানে ছেলে ও মেয়ের পোশাকের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটি মহান আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্বের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, যে জাতি অন্য জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত হবে। অথচ আজ আমাদের সোনামণিরা যখন পশ্চিমা কায়দায় চুল কাটে কিংবা বিজাতীয় উৎসব পালন করে, তখন আমরা অভিভাবকরা উল্টো আনন্দিত হই এবং একে আভিজাত্য মনে করি। এটি মূলত আমাদের চরম মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়।

এই ভয়াবহ সমস্যার সমাধান কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন। সমাধানের প্রথম ধাপ হলো পরিবারকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলা। মা-বাবাকে বুঝতে হবে যে, সন্তানকে কেবল দামী পোশাক আর খাবার দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং তাদের ঈমান রক্ষা করা এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বঁাচানোই হলো বড় সফলতা। শৈশব থেকেই শিশুদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিতে হবে যে, আমরা শ্রেষ্ঠ জাতি এবং আমাদের সংস্কৃতিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও মার্জিত সংস্কৃতি। তাদের শেখাতে হবে যে, দামী ব্র্যান্ডের পশ্চিমা পোশাকের চেয়ে নবীর সুন্নাহ অনুসরণ করা অনেক বেশি সম্মানের।

দ্বিতীয়ত, বিনোদনের বিকল্প উৎস তৈরি করা সময়ের দাবি। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তাই তাদের সামনে পশ্চিমা হিরোদের পরিবর্তে ইসলামের ইতিহাসের মহানায়কদের জীবনী তুলে ধরতে হবে। গল্পের ছলে তাদের জানাতে হবে খালিদ বিন ওয়ালিদ, সালাহউদ্দীন আইয়ুবী কিংবা মুহাম্মাদ বিন কাসিমের বীরত্বগঁাথা। তারা যখন জানবে যে তাদের পূর্বপুরুষরা কতটা সাহসী ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তখন তারা বিজাতীয় কার্টুন চরিত্রের পেছনে ছুটবে না। একইসাথে মুসলিম উদ্যোক্তাদের উচিত শিশুদের জন্য এমন সব বিনোদনমূলক সামগ্রী ও মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা হবে সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত এবং রুচিশীল।

তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামি মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানো জরুরি। শিশুরা দিনের একটা বড় সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটায়। সেখানে যদি তারা বিজাতীয় সংস্কৃতির পাঠ পায়, তবে ঘরে এসে তাদের সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আদর্শিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের নৈতিক চরিত্র গঠন করতে হবে। অভিভাবকদের উচিত এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা যেখানে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনি পরিবেশ বিদ্যমান।

পরিশেষে, এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে বঁাচার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দুআর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান ফিতনার যুগে ঈমান নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের অবহেলায় যদি একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কিয়ামতের ময়দানে আমাদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পশ্চিমা ষড়যন্ত্র আমাদের শিশুদের কেবল দুনিয়াবি ক্ষতিই করছে না, বরং তাদের পরকালীন জীবনকেও বিপন্ন করে তুলছে। তাই সময় থাকতেই আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের ঘরগুলোকে জিকির ও সুন্নাহর নূরে আলোকিত করতে হবে, যাতে কোনো অপসংস্কৃতি সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। তবেই আমরা একটি শক্তিশালী ও আদর্শবান মুসলিম প্রজন্ম উপহার দিতে পারব, যারা দুনিয়া ও আখেরাতে উম্মাহর জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

মোঃ ইউসুফ হোসাইন : আল-আজহার ইউনিভার্সিটি কায়রো, মিশর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়