প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৬
বাবার দেয়া স্বল্প পুঁজি দিয়ে খামার শুরু, সোহাগ এখন বহুজাতীয় পশু-পাখির সফল হোলসেলার

চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নের বাঁশী স্কুল এলাকার হাফেজ সোহাগ গাজী একজন সফল খামারি ও উদ্যোক্তা। পারিবারিকভাবে তার বাবা মোটামুটি সচ্ছল হলেও চাকরির পেছনে না ছুটে নিজ উদ্যোগে কিছু করার স্বপ্ন থেকেই খামার ব্যবসায় নামেন তিনি। বাবার দেয়া স্বল্প পুঁজি ও নিজের পরিশ্রমে আজ তিনি বহুজাতীয় পশু-পাখির একজন পরিচিত হোলসেলার।
মো. সোহাগ গাজী একজন কোরআনে হাফেজ। তিনি বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে ফাজিল পাস করেন। উচ্চশিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন।
সোহাগ জানান, ২০২০ সালে চাঁদপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে খামার ব্যবস্থাপনা ও পশু-পাখি পালনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণের পরপরই নিজ বাড়ির আঙিনায় অল্প পরিসরে দেশি মুরগি পালন দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। সঠিক পরিচর্যা, সময়মতো টিকা ও মানসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফলে অল্প সময়েই তিনি লাভের মুখ দেখেন। বর্তমানে তার খামারে সোনালী মুরগী ও ব্রয়লার মুরগি, ইউরোপীয় কোয়েল পাখি, চীনা হাঁস পালন করা হচ্ছে। এসব পশু-পাখি তিনি খুচরা ও পাইকারি উভয়ভাবেই বিক্রি করেন। চাঁদপুর সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও হাটবাজারে নিয়মিত সরবরাহ রয়েছে তার।
আয়ের চিত্র
খামার ও হোলসেল ব্যবসা থেকে বর্তমানে প্রতি মাসে তার গড় বিক্রি প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে নিট লাভ থাকে আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ঈদ ও মৌসুমি সময়ে মুরগির চাহিদা বাড়লে আয় আরও বৃদ্ধি পায়। সোহাগের খামারে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ৩–৪ জন স্থানীয় যুবক কাজ করছেন, ফলে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
হাফেজ সোহাগ বলেন, খামারে আধুনিক ইনকিউবেটর মেশিন ব্যবহার করে মুরগি ও কোয়েলের ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করছি। এই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ফলে নির্ধারিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে অধিকসংখ্যক বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে ডিমে তা দেওয়ার তুলনায় সময় সাশ্রয় হয় এবং উৎপাদনের হারও বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডিম ফোটানোর কারণে রোগব্যাধির ঝুঁকি কম থাকে এবং বাচ্চার মৃত্যুহারও তুলনামূলকভাবে কমে আসে। ফলে খামারটি এখন শুধু পশু-পাখি বিক্রয়েই নয়, বাচ্চা উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রেও একটি নির্ভরযোগ্য হ্যাচারি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বর্তমানে অনলাইনে বিভিন্ন স্থান থেকে কোয়েল পাখির বাচ্চা ও চীনা হাঁসের বাচ্চা ক্রয়ের জন্যে যোগাযোগের মাধ্যম ০১৮৪৬-৬৬৩০৪৫ অথবা বাঁশী স্কুল সংলগ্ন মো. মজিবুর রহমান গাজী মেম্বারের বাড়ি।
হাফেজ সোহাগ বলেন, “শুরুতে পুঁজি ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিলো। তবে প্রশিক্ষণ আর ধৈর্য ধরে কাজ করায় আজ আল্লাহর রহমতে ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি। খামার করতে চাইলে অবশ্যই পরিকল্পনা ও নিয়ম মানতে হবে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, আধুনিক শেড নির্মাণ, উন্নত জাতের পশু-পাখি সংযোজন এবং নিজস্ব হ্যাচারি চালুর মাধ্যমে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।
এলাকাবাসীর মতে, হাফেজ সোহাগের সাফল্য প্রমাণ করেÑস্বল্প পুঁজি, সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রম থাকলে খামারভিত্তিক উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। এই সাফল্য তরুণদের খামারমুখী হতে উৎসাহ জোগাবে বলে তারা মনে করেন।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জৌতির্ময় ভৌমিক বলেন, “হাফেজ সোহাগ আধুনিক পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ইনকিউবেটর মেশিনের মাধ্যমে মুরগি ও কোয়েলের ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করা একটি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ। এতে খামারিরা স্বল্প সময়ে বেশি উৎপাদন করতে পারে এবং রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণও সহজ হয়।
যুবকদের জন্যে এটি একটি অনুসরণযোগ্য মডেল। সঠিক প্রশিক্ষণ, টিকাদান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে খামার পরিচালনা করলে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব। প্রাণিসম্পদ বিভাগ সবসময় এমন উদ্যোগকে কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”








