শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫  |   ৩০ °সে
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১১:৪৯

শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী বনাম প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গ

রাশেদা আতিক রোজী
শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী বনাম প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গ

প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপনান্তে শিশুর জন্য প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা একটি বহুল আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন। বাংলাদেশে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে, যা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। সে সময় কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় অংশ নিত এবং তাদের মধ্যেই বৃত্তি সীমাবদ্ধ ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা এবং তাদের উচ্চতর শিক্ষায় উৎসাহিত করা। উল্লেখ্য, অনেকে সচেতনভাবে বলে আসছেন যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিম্নবিত্ত, গরিব ও সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। আমি এই কথাটার সাথে একদম একমত নই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সব ধরনের পরিবারের ছেলেমেয়েরাই পড়তে আসে। তবে শহর এলাকায় নানাভাবে কারণে এই চিত্রের ব্যতিক্রম আছে। যাই হোক, এই পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীরা মাসিক বৃত্তি পেত, যা তাদের পড়ালেখার খরচ মেটাতে সহায়ক ছিল। সাধারণত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরীক্ষা আয়োজন করা হতো। এতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞান/সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো। সমাপনী পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বৃত্তি পরীক্ষা পরিচালিত হয়ে আসছে এবং বৃত্তি প্রদানও হয়ে আসছিল। কিন্তু শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটা অংশ (মেধাবীরা) অংশগ্রহণ করা এবং বৃত্তি প্রদান দিয়ে কোন প্রশ্ন কিন্ডারগার্টেন স্কুল করে নাই বা তাদের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি নিয়ে কোন দাবীও উত্থাপন হয়নি।

২০০৯ সালে পিইসি চালু হলে আলাদা বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। পিইসির ফলাফলের ভিত্তিতে বৃত্তি প্রদান শুরু হয়। এই ব্যবস্থায় এনসিটিবি (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) কারিকুলাম অনুসরণকারী সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়, যার মধ্যে কিন্ডারগার্টেনও অন্তর্ভুক্ত ছিল, অংশগ্রহণ করতে পারত। এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত মানোন্নয়ন এবং সকল শিক্ষার্থীর জন্য একটি অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিশ্চিত করা। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল কারণ তাদের পাঠ্যক্রম সরকারি বিদ্যালয়ের মতোই ছিল এবং পিইসি একটি জাতীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতো। শুধু তাহাই না, সমাপনী পরীক্ষাকে একটা পাবলিক পরীক্ষার রূপ দেওয়া হয়, যেখানে এনসিটিবি এর শিক্ষাক্রম অনুসরিত সবার জন্য এই সমাপনী পরীক্ষা আর এই পরীক্ষার উপর ভিত্তি করেই বৃত্তি প্রদান করা হয়ে থাকে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ২০২০ এবং ২০২১ সালে পিইসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২২ সালে পিইসি পরীক্ষা স্থায়ীভাবে বাতিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে প্রাথমিক স্তরে বৃত্তি প্রদান নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

দীর্ঘ ১৩ বছর পর, ২০২৩ সালে আবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়। এটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালে সরকার নীতিগতভাবে ২০২৫ সাল থেকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগের নিয়মেই ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২১ থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আর এই ফিরে আসাটার মধ্যে কোন নতুনত্ব এখনো পর্যন্ত নেই। এটাকে বলা যায় ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে’ অর্থাৎ ৬০ এর দশক হতে যে ফরমেটে ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ‘চালু হয়ে আসছিল সেটাই আবার নতুন করে শুরু। তাই সমাপনী অধ্যায় ভুলে গেলে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক করার অবকাশ নেই।

শিশুর অধিকার : বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ

শিশু কোন স্কুলে পড়বে তার চয়েস খুব একটা শিশুর কাছ থেকে নেয়া হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিতা-মাতার চয়েস প্রধান্য পেয়ে থাকে। একই বাড়ির বা একই ভবনের কিংবা একই ফ্লাটের দুই ভাইয়ের বাচ্চারা ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে পড়ে থাকে। তাই এক শিশু যখন দেখে অন্যজন বৃত্তি পরীক্ষা দিচ্ছে কিন্তু মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও স্কুলের কারণে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারছে না, যা তার অধিকার কে ক্ষুন্ন করছে। তাই বিষয়টি নিয়ে নীতি নির্ধারক মহলে ভাবা উচিত। কিন্তু ইতোমধ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে ফেলছে কিন্ডারগার্টেন ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তাদের সংগঠন। এটাকে নেতিবাচক না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত। কেননা, সবাই শিশুদের স্বার্থ নিয়ে ভাবছেন, শিশুদের নিয়ে কথা বলছেন। আর সর্বোপরি এসব শিশু তো আমাদেরই সন্তান। অনেক প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক তার বাসার পাশের কিন্ডারগার্টেনে সন্তান পাঠিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করছেন। তবে খারাপ হচ্ছে একে অপরের যোগ্যতা, দক্ষতা নিয়ে নেতিবাচক প্রশ্ন উত্থাপন করে সমাজের কাছে শিক্ষক পদের মর্যাদা হানি করছে।

কিন্ডারগার্টেনের অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি

শিক্ষার মানদণ্ড অভিন্নতা : অনেক কিন্ডারগার্টেন এনসিটিবি কারিকুলাম অনুসরণ করে, তাই তারা দাবি করে যে তাদের শিক্ষার্থীরাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতোই একই সিলেবাসে পড়াশোনা করে।

সুযোগের সমতা : যদি মেধার ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া হয়, তবে সকল যোগ্য শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত, সে যে ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়ুক না কেন।

জাতীয় স্বীকৃতি : বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধার একটি জাতীয় স্বীকৃতি তৈরি হয়, যা শুধুমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

কিন্ডারগার্টেন অংশগ্রহণের উপরোক্ত যুক্তি খণ্ডন

“শিক্ষার মানদণ্ড অভিন্নতা” যুক্তির খণ্ডন

গুণগত মান ও তদারকির অভাব : এনসিটিবি কারিকুলাম অনুসরণ করলেও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকদের যোগ্যতা, অবকাঠামো ও সরকারি তদারকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে সমতুল্য নয়। সরকারি স্কুলগুলো কঠোর নীতিমালা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের অধীন।

বাণিজ্যিকীকরণের ঝুঁকি : অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে সরকারি বিদ্যালয় সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত। ফলে সিলেবাসের বাইরে অতিরিক্ত প্রাইভেট কোচিং/প্রেশার নিশ্চিত করে যা প্রকৃত “অভিন্নতা” নষ্ট করে।

কারিকুলাম বাস্তবায়নে বৈষম্য : সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সম্পদ বরাদ্দে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকে; কিন্ডারগার্টেনে তা অনুপস্থিত। ফলে কারিকুলাম কোথাও এক হলেও বাস্তবায়নে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়।

“সুযোগের সমতা” যুক্তির খণ্ডন

অর্থনৈতিক বৈষম্যের উপেক্ষা : কিন্ডারগার্টেনে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণত উচ্চ আয়ের পরিবার থেকে আসে, যাদের বেসরকারি শিক্ষা, কোচিং ও উন্নত সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্যতা ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। বৃত্তির মূল উদ্দেশ্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা ও উচ্চ শিক্ষায় উৎসাহিত করা।

সমতা অভিন্নতা : সমতার অর্থ সবাইকে একই সুযোগ দেওয়া নয়, বরং প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করা। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকায় এই নীতিই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে।

সুবিধার দ্বৈততা : কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই উচ্চব্যয়ী শিক্ষা সুবিধা পায়; তাদের বৃত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করলে সরকারি স্কুলের দরিদ্র মেধাবীদের সুযোগ সংকুচিত হবে, যা সুযোগের সমতার বিরোধী।

“জাতীয় স্বীকৃতি” যুক্তির খণ্ডন

বৃত্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য বিকৃতি : প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মুখ্য লক্ষ্য জাতীয় স্বীকৃতি প্রদান নয়, বরং সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিশুদের আর্থিক সহায়তা ও শিক্ষায় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিফলিত হয়।

অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি : কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা বাণিজ্যিক কোচিং ও বাড়তি সম্পদের সুবিধা নিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে, ফলে প্রকৃতপক্ষে সরকারি স্কুলের মেধাবীরা “জাতীয় স্বীকৃতি” থেকেও বঞ্চিত হবে।

চূড়ান্ত দার্শনিক খণ্ডন

সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন : সরকারি তহবিল (যা জনগণের করমূলে পরিচালিত) শুধুমাত্র সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ব্যবহার হওয়া উচিত। বেসরকারি খাত ইতোমধ্যেই লাভজনক; তাদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংহতি : প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা মূলত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত। এই পরীক্ষা শিক্ষাব্যবস্থার মান যাচাই এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করার একটি মাধ্যমও বটে। বৃত্তি পরীক্ষা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করার কৌশলগত হাতিয়ার। কিন্ডারগার্টেনকে এর সাথে যুক্ত করলে এই নীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে প্রভাব : যদি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার নীতি নির্ধারণে এর প্রভাব পড়তে পারে।

সম্মানজনক সমাধানের পথ

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি পরীক্ষা চলবে, যেখানে মেধা ও প্রয়োজন (সবৎরঃ-পঁস-সবধহং) উভয়ই বিবেচনা করা হবে। এটার সাথে অন্যকোন ধরনের বিদ্যালয় সংযুক্ত করা যাবে না।

সরকার এনসিটিবি কারিকুলাম কঠোরভাবে অনুসরণকারী কিন্ডারগার্টেনগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র মেধাভিত্তিক বৃত্তি চালু করতে পারে। এই বৃত্তির সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য সরকারি বৃত্তির থেকে ভিন্ন হতে পারে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হতে পারে মেধার স্বীকৃতি। কেননা এই শিশুরাও এ মাটির সন্তান। তাদেরও অধিকার আছে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার ও বৃত্তি লাভের।

সুস্পষ্ট নীতিমালা : বৃত্তি পরীক্ষা এবং বৃত্তি বিতরণের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ এবং বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে অংশগ্রহণের মানদণ্ড, বৃত্তির উদ্দেশ্য এবং কাদের জন্য এটি প্রযোজ্য, তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকবে। কিন্ডারগার্টেনগুলোকে বৃত্তির আওতায় আনতে হলে তাদের জন্য এনসিটিবি কারিকুলাম অনুসরণের কঠোর বাধ্যবাধকতা এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হব।

কিন্ডারগার্টেনগুলোর রেজিস্ট্রেশন, ফি কাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ এবং কারিকুলাম অনুসরণের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এটি শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করবে এবং মান বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

এছাড়া, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক প্রতিনিধি, কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন এবং অভিভাবক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা যেতে পারে- এতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা সম্ভব। কেননা -শিশুর অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ হচ্ছে প্রতিটা শিশুর অধিকার। কোন অবস্থাতেই শিশুকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না

শিশু কোন স্কুলে পড়বে তার চয়েস খুব একটা শিশুর কাছ থেকে নেয়া হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিতা-মাতার চয়েস প্রধান্য পেয়ে থাকে। একই বাড়ির বা একই ভবনের কিংবা একই ফ্লাটের দুই ভাইয়ের বাচ্চারা ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে পড়ে থাকে। তাই এক শিশু যখন দেখে অন্যজন বৃত্তি পরীক্ষা দিচ্ছে কিন্তু মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও স্কুলের কারণে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারছে না, যা তার অধিকার কে ক্ষুন্ন করছে। তাই বিষয়টি নিয়ে নীতি নির্ধারক মহলে ভাবা উচিত। কিন্তু ইতোমধ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে ফেলছে কিন্ডারগার্টেন ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তাদের সংগঠন। এটাকে নেতিবাচক না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত। কেননা, সবাই শিশুদের স্বার্থ নিয়ে ভাবছেন, শিশুদের নিয়ে কথা বলছেন। আর সর্বোপরি এসব শিশু তো আমাদেরই সন্তান। অনেক প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক তার বাসার পাশের কিন্ডারগার্টেনে সন্তান পাঠিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করছেন। তবে খারাপ হচ্ছে একে অপরের যোগ্যতা, দক্ষতা নিয়ে নেতিবাচক প্রশ্ন উত্থাপন করে সমাজের কাছে শিক্ষক পদের মর্যাদা হানি করছে।

কিন্ডারগার্টেনের অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি

শিক্ষার মানদণ্ড অভিন্নতা : অনেক কিন্ডারগার্টেন এনসিটিবি কারিকুলাম অনুসরণ করে, তাই তারা দাবি করে যে তাদের শিক্ষার্থীরাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতোই একই সিলেবাসে পড়াশোনা করে।

সুযোগের সমতা : যদি মেধার ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া হয়, তবে সকল যোগ্য শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ থাকা উচিত, সে যে ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়ুক না কেন।

জাতীয় স্বীকৃতি : বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধার একটি জাতীয় স্বীকৃতি তৈরি হয়, যা শুধুমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

কিন্ডারগার্টেন অংশগ্রহণের উপরোক্ত যুক্তি খণ্ডন

“শিক্ষার মানদণ্ড অভিন্নতা” যুক্তির খণ্ডন

গুণগত মান ও তদারকির অভাব : এনসিটিবি কারিকুলাম অনুসরণ করলেও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকদের যোগ্যতা, অবকাঠামো ও সরকারি তদারকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে সমতুল্য নয়। সরকারি স্কুলগুলো কঠোর নীতিমালা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের অধীন।

বাণিজ্যিকীকরণের ঝুঁকি : অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে সরকারি বিদ্যালয় সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত। ফলে সিলেবাসের বাইরে অতিরিক্ত প্রাইভেট কোচিং/প্রেশার নিশ্চিত করে যা প্রকৃত “অভিন্নতা” নষ্ট করে।

কারিকুলাম বাস্তবায়নে বৈষম্য : সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সম্পদ বরাদ্দে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকে; কিন্ডারগার্টেনে তা অনুপস্থিত। ফলে কারিকুলাম কোথাও এক হলেও বাস্তবায়নে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়।

“সুযোগের সমতা” যুক্তির খণ্ডন : অর্থনৈতিক বৈষম্যের উপেক্ষা : কিন্ডারগার্টেনে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণত উচ্চ আয়ের পরিবার থেকে আসে, যাদের বেসরকারি শিক্ষা, কোচিং ও উন্নত সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্যতা ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। বৃত্তির মূল উদ্দেশ্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা ও উচ্চ শিক্ষায় উৎসাহিত করা।

সমতা অভিন্নতা : সমতার অর্থ সবাইকে একই সুযোগ দেওয়া নয়, বরং প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করা। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকায় এই নীতিই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে।

সুবিধার দ্বৈততা : কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই উচ্চব্যয়ী শিক্ষা সুবিধা পায়; তাদের বৃত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করলে সরকারি স্কুলের দরিদ্র মেধাবীদের সুযোগ সংকুচিত হবে, যা সুযোগের সমতার বিরোধী।

“জাতীয় স্বীকৃতি” যুক্তির খণ্ডন

বৃত্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য বিকৃতি : প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মুখ্য লক্ষ্য জাতীয় স্বীকৃতি প্রদান নয়, বরং সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিশুদের আর্থিক সহায়তা ও শিক্ষায় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিফলিত হয়।

অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি : কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা বাণিজ্যিক কোচিং ও বাড়তি সম্পদের সুবিধা নিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে, ফলে প্রকৃতপক্ষে সরকারি স্কুলের মেধাবীরা “জাতীয় স্বীকৃতি” থেকেও বঞ্চিত হবে।

চূড়ান্ত দার্শনিক খণ্ডন

সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন : সরকারি তহবিল (যা জনগণের করমূলে পরিচালিত) শুধুমাত্র সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ব্যবহার হওয়া উচিত। বেসরকারি খাত ইতোমধ্যেই লাভজনক; তাদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংহতি

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা মূলত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত। এই পরীক্ষা শিক্ষাব্যবস্থার মান যাচাই এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করার একটি মাধ্যমও বটে। বৃত্তি পরীক্ষা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করার কৌশলগত হাতিয়ার। কিন্ডারগার্টেনকে এর সাথে যুক্ত করলে এই নীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে প্রভাব

যদি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার নীতি নির্ধারণে এর প্রভাব পড়তে পারে। সম্মানজনক সমাধানের পথ।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি পরীক্ষা চলবে, যেখানে মেধা ও প্রয়োজন (সবৎরঃ-পঁস-সবধহং) উভয়ই বিবেচনা করা হবে। এটার সাথে অন্যকোন ধরনের বিদ্যালয় সংযুক্ত করা যাবে না।

সরকার এনসিটিবি কারিকুলাম কঠোরভাবে অনুসরণকারী কিন্ডারগার্টেনগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র মেধাভিত্তিক বৃত্তি চালু করতে পারে। এই বৃত্তির সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য সরকারি বৃত্তির থেকে ভিন্ন হতে পারে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হতে পারে মেধার স্বীকৃতি।

কেননা এই শিশুরাও এ মাটির সন্তান। তাদেরও অধিকার আছে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার ও বৃত্তি লাভের।

সুস্পষ্ট নীতিমালা : বৃত্তি পরীক্ষা এবং বৃত্তি বিতরণের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ এবং বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে অংশগ্রহণের মানদণ্ড, বৃত্তির উদ্দেশ্য এবং কাদের জন্য এটি প্রযোজ্য, তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকবে। কিন্ডারগার্টেনগুলোকে বৃত্তির আওতায় আনতে হলে তাদের জন্য এনসিটিবি কারিকুলাম অনুসরণের কঠোর বাধ্যবাধকতা এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হব।

কিন্ডারগার্টেনগুলোর রেজিস্ট্রেশন, ফি কাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ এবং কারিকুলাম অনুসরণের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এটি শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করবে এবং মান বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

এ ছাড়াও, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক প্রতিনিধি, কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন এবং অভিভাবক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা যেতে পারে- এতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা সম্ভব। কেননাÑশিশুর অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

রাশেদা আতিক রোজী : ইনস্ট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন

ট্রেনিং সেন্টার ( ইউপিইটিসি), হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়