প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৩
জাতীয় ঐক্যের জন্য মাও সেতুংয়ের পথ অনুসরণ করা জরুরি
— সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী —

যতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো, ব্রিটিশ আইন ও সমাজব্যবস্থায় 'আমিত্ব', 'আমার পরিবার', আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত দুর্নীতিবাজদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখব, ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের দুর্নীতি নির্মূল তো দূরের কথা, সহনীয় পর্যায়ে আনাও অসম্ভব।
|আরো খবর
বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত রেজিমের মতো সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্ত আমলা, সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী ও সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্ত রাজনীতিকদের প্রভাব ও বন্দনায় দেশের মজলুম জনগণের হতাশা দিন দিন বেড়েই চলেছে!
আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে বাস্তবতার আলোকে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অধ্যায়নের ওপর নির্ভর করেছেন। অনুশীলনের ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ, প্রয়োগ এবং ভুল-শুদ্ধ নিরূপণ করে তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাধারা আজ সারা বিশ্বে মেহনতি মানুষকে শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামে পথচলার দিশা দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের উপযোগী রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনে সফলতা অর্জন এবং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটন—এগুলোই হলো মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারার মৌলিক দিক। চীনের বিপ্লবের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা চীনে এবং সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও সমাদৃত, যা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এক অমূল্য সংযোজন। নয়া গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বিজ্ঞানভিত্তিক বিনির্মাণে মাও সেতুংয়ের নিখুঁত চিন্তাধারা নির্ভুল প্রয়োগে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
এই প্রসঙ্গে মাও সেতুংয়ের উক্তি : “মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কেবলমাত্র জনসচেতনতা ও সামাজিক অনুশীলন থেকেই আসে; সমাজের উৎপাদন সংগ্রাম, শ্রেণিসংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা—এই তিনটি অনুশীলন থেকেই আসে।” মাও আরও বলেন, মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বকের মাধ্যমে তা মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয়।
মার্কসবাদের তিনটি মৌলিক দিক—বস্তুবাদী দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব। কমরেড লেনিনের আবিষ্কৃত দ্বন্দ্ববাদের মৌলিক ভিত্তি ‘বিপরীতের ঐক্য’ নামক বস্তুবাদী দার্শনিক মতবাদকে মাও সেতুং আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বিকাশ ও অগ্রগতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
উৎপাদন ব্যবস্থা শুধু উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্ক, উপকরণের মালিকানা ও বণ্টনের ওপর নির্ভর করে না; জনসচেতনতা ও সামাজিক চেতনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনোজাগতিক চিন্তা-চেতনা যদি ভাববাদী, যান্ত্রিক ও প্রগতিপরিপন্থী হয়, তবে তা সামাজিক উৎপাদন সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তখন মেহনতি মানুষ তথা গণমানুষের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। আর এ কারণেই প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়। এই অপশক্তি ও অপসংস্কৃতিকে পরাজিত করতেই চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিচালনা করতে হয়েছিল।
মাও সেতুংয়ের উক্তি : “অর্থনীতিই ভিত্তি; রাজনীতি ও সংস্কৃতি হলো তার ঘনীভূত প্রকাশ।”
মাও সেতুং দেখিয়েছেন—অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি, এই তিনটির মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি সংস্কৃতির বিপ্লবী বিকাশ এবং অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত অধ্যয়ন ও অনুশীলন করেছিলেন। মাও সেতুং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তথা মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্তালিনের সাহিত্য গভীরভাবে পাঠ করেছিলেন। এর নিরিখে চীনের সমাজের বাস্তবতার বৈশিষ্ট্য বিচার-বিশ্লেষণ, সমন্বয়সাধন ও নিজস্ব উদ্ভাবনী তত্ত্বের সংযোজন করেন, যা ‘মাওয়ের চিন্তাধারা’ হিসেবে স্বীকৃত। এই মতাদর্শিক ধারার আলোকে কর্মসূচি নির্ধারণ, আন্দোলন, গণআন্দোলন, গণজাগরণ, দীর্ঘমেয়াদি লড়াই, সংগ্রাম ও বিপ্লবের মাধ্যমে চীনে জনগণতন্ত্র বা নয়া গণতন্ত্র কায়েম এবং সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে সফলতা অর্জিত হয়েছে।
কমরেড মাও সেতুং ভাববাদ, ডান-বাম বিচ্যুতি ও সুবিধাবাদী প্রবণতাকে পরাজিত করার জন্য দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অধ্যয়ন, গবেষণা ও অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। চীন বিপ্লব সফল করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদী অবস্থায় বিপ্লবের ধরণ কেমন হবে—তা তিনি অনুধাবন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব সংঘটন, বিপ্লব-পরবর্তীকালে লেনিন ও স্তালিনের নেতৃত্বে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতা মাও সেতুং গভীরভাবে পাঠ, গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণ করেন। এরপর চীনের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি পাঠ ও অনুশীলনের নিরিখে চীন একটি আধা-উপনিবেশিক ও আধা-সামন্তবাদী দেশ—এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে চীনের সমাজব্যবস্থার শ্রেণি বিশ্লেষণ করেন। কারা শত্রু? কারা মিত্র? প্রধান দ্বন্দ্ব ও গৌণ দ্বন্দ্ব কী? প্রধান দ্বন্দ্বের প্রধান দিক নির্ধারণ, পার্টি, গণসংগঠন, কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে কৃষক, মেহনতি মানুষসহ মধ্যবিত্ত, যুবক, নারী, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও জনতার সমাবেশ ঘটে। ফ্রন্ট গঠন এবং মূলত চীনের প্রধান সমস্যা ‘কৃষি সমস্যা’ নিরূপণ করে জনগণতান্ত্রিক বা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটনে তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন ও সফলতা অর্জন করেন।
কমরেড মাও সেতুং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে শুধু অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির তত্ত্বের সূত্রায়ন করেই ক্ষান্ত হননি; এর সঙ্গে তিনি সামরিক তত্ত্বও সূত্রাবদ্ধ করেন। মাও সেতুং-সৃষ্ট তত্ত্বই ‘মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা’, যা চীনে সফলতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয় এবং পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এর প্রয়োগের মাধ্যমে বিপ্লবে সফলতা অর্জিত হয়।
সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও সামরিক কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা এবং প্রগতি, গণতন্ত্র ও নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় শোষণমুক্তির সংগ্রামে শ্রমিক, কৃষক, নারী, যুবক, ছাত্র ও মেহনতি মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। মাও সেতুং নিজ প্রদেশ হুনানে জমিদারদের শোষণ, লুণ্ঠন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন।
কমরেড মাও সেতুং প্রদেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী সরকার গঠনের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও তাদের দালালদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করেছিলেন; বিভিন্ন স্থানে বিপ্লবী সরকার গঠন ও বিপ্লবী বাহিনীর বিকাশ ত্বরান্বিত করেছিলেন। এমনি সময় কৃষক ও ভূমিহীন খেতমজুরদের ওপর জমিদার-জোতদারদের শোষণ-নিপীড়ন দিন দিন বাড়তে থাকায় মাও সেতুং গরিব কৃষক ও ভূমিহীন খেতমজুরদের নিয়ে জাতীয় বিপ্লবী বাহিনী গড়ে তোলেন এবং এ নিয়ে প্রচুর অধ্যয়ন, গবেষণা ও অনুশীলন করেন।
তিনি ১৯২৬ সালে 'চীনের সমাজজীবনের বিভিন্ন শ্রেণি সম্বন্ধে একটি বিশ্লেষণ' শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বইটিতে মাও বলেন :
"কারা আমাদের শত্রু?
কারা আমাদের বন্ধু?
এটাই হলো বিপ্লবের জন্য
সর্বপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।"
বিপ্লবী পার্টি হচ্ছে জনসাধারণের পথপ্রদর্শক; বিপ্লবী পার্টি যখন জনগণকে ভ্রান্ত পথে চালিত করে, তখন কোনো বিপ্লবই সফল হতে পারে না।
সমাজ বিশ্লেষণ ও চীন বিপ্লবের শত্রুমিত্র নির্ধারণে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: "এটা সুস্পষ্ট যে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত সমস্ত সমরনায়ক, আমলা, মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণি, বড় জমিদার শ্রেণি এবং তাদের সঙ্গে সংযুক্ত বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ হলো আমাদের শত্রু। শিল্পকারখানায় কর্মরত সর্বহারা শ্রেণিই হলো আমাদের বিপ্লবের নেতৃস্থানীয় শক্তি। সকল আধা-সর্বহারা এবং পাতি-বুর্জোয়া আমাদের নিকটতম বন্ধু। দোদুল্যমান মাঝারি বুর্জোয়া শ্রেণির দক্ষিণপন্থীরা আমাদের শত্রু হতে পারে এবং বামপন্থীরা আমাদের মিত্র হতে পারে—কিন্তু আমাদের সর্বদাই সতর্ক থাকতে হবে এবং তাদেরকে আমাদের ফ্রন্টের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে দেওয়া চলবে না।" —মাও সেতুংয়ের ‘চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ' ও শত্রুমিত্র চিহ্নিতকরণ চীন বিপ্লবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মাও সেতুংয়ের চীন বিপ্লবের সফলতার মূল বিষয় ছিল গ্রামীণ কৃষকসমাজকে ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে চীনের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সফলভাবে সমন্বয় করা।
রাশিয়ার বিপ্লব শহরের শ্রমিকদের মাধ্যমে হলেও মাও বুঝতে পেরেছিলেন যে চীনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো কৃষক। তাই তিনি কৃষকদের সংগঠিত করে বিপ্লবের মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
প্রথমে গ্রামীণ অঞ্চলে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করা, কৃষকদের জমির অধিকার ও যুক্তি দিয়ে পক্ষে আনা এবং ধাপে ধাপে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করার সামরিক কৌশল নেন তিনি।
শত্রুর শক্তি যখন বেশি, তখন সরাসরি যুদ্ধ না করে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন (যেমন বিখ্যাত 'লং মার্চ' বা দীর্ঘ পদযাত্রা)।
বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাঝের একটি পর্যায় হিসেবে 'নয়া গণতন্ত্র'-এর ধারণা আনেন, যা বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে বিপ্লবের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করে।
আদর্শিক সুদৃঢ়তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাম্য ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা জাগিয়ে তোলেন।
বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়ক মাও সেতুং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা, গেরিলা সংগঠক, চীনা বিপ্লবী, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও এক অবিসংবাদিত রাজনৈতিক নেতা। ইতিহাসের চাকা বারবার বদলে দিয়েছেন চৈনিক এই মানুষটি। তিনি শ্রমিকের বদলে কৃষককে চিহ্নিত করেছেন বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে, গড়ে তুলেছেন সশস্ত্র রেড আর্মি, প্রচলন করেছেন আরণ্যক গেরিলা যুদ্ধের। বিশ্বময় তরুণরা আজও হাঁটছে তাঁর দেখানো পথে।
১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে এই অবিসংবাদিত মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ‘মাও সেতুং স্মৃতিসৌধ’।
সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী : লেখক ও গবেষক।








