বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ২২:৩১

রক্তাক্ত মার্চ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

—সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক
রক্তাক্ত মার্চ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

১৯৭১ সনের সমগ্র মার্চ মাস জুড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশই ছিলো পূর্ব বাংলার প্রথম এবং শেষ কথা। বাঁকবদল হয় পাকিস্তানিদের নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনার। অবশেষে বাঙালি পেয়ে যায় হাজার বছরের পরাধীনতার গ্লানি ধুয়ে-মুছে ফেলে স্বাধীনতার অমৃত স্বাদ আস্বাদনের অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জগদ্দল পাথরের মতো অন্যায়ভাবে চেপে বসার সুদীর্ঘ তেইশ বছরের সীমাহীন অপেক্ষার অবসানে সুনামির মতো জোয়ার আসে। বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। চারিদিকে শ্লোগান ওঠে "বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো," "তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা,যমুনা," "তোমার দেশ-আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ", "পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা" ইত্যাদি রক্ত গরম করা গগনবিদারী শ্লোগান।

চরম স্বৈরাচারী ভুট্টোর সঙ্গে সকল কুকাণ্ডের হোতা, ক্ষমতালোভী, রক্তচোষা ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের মিথ্যা মহড়া দিতে থাকে। আলোচনার নামে ভাঁওতাবাজি, টালবাহানা, শঠতার আশ্রয় নিয়ে অযথা সময় ক্ষেপণ করে। যুক্তির পরিবর্তে শক্তির দাপট দেখাতে ও সামরিক শক্তি দিয়ে গণজাগরণকে ভূলুণ্ঠিত করার অপপ্রয়াস নেয়। নৌপথে ও বিমানে করে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বিধ্বংসী সমরাস্ত্র দিয়ে ক্যান্টনমেন্টগুলো ভর্তি করে।

ইতোমধ্যে নিরপরাধ, নিরীহ, নিরস্ত্র, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, স্বাধীনতাকামী বাঙালি নিধনের জন্যে অফুরন্ত রসদসহ পাকি হানাদার বাহিনী প্রস্তুত। ঠিক ঐ সময়ে কসাই জল্লাদ ইয়াহিয়া খান ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে চোরের মতো পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার সময় নিষ্পাপ ও নিরীহ বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যার হুকুম দিয়ে যায় মানবতার শত্রু, হালাকু খানের জীবন্ত প্রতিমূর্তি টিক্কা খানকে। হায়েনা, রক্তপিপাসু, কসাই, নরঘাতক জেনারেল টিক্কা খান দম্ভোক্তি করে পাকি সৈন্যদের নির্দেশ দিলো-"আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না। ঢাকা শহরে এমন তাণ্ডব তৈরি করতে হবে যেনো আতঙ্কে দুগ্ধবতী মায়ের বুকের দুধ জমে দই হয়ে যায়।"

নিরীহ হাজার হাজার বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের কোনো চিহ্ন বিশ্ব যেনো দেখতে এবং জানতে না পারে সে জন্যে নিরাপত্তার নামে সব বিদেশি সাংবাদিককে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকে রাখলো। কিন্তু সত্যানুসন্ধানী বিখ্যাত সাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবন বাজি রেখে লুকিয়ে হালাকু খানদের অতি সামান্য কিছু ধ্বংসলীলার চিত্র ধারণ করেন। সেই ধ্বংসলীলার কিছু চিত্র নিয়ে 'The Daily Telegraph' পত্রিকায় তিনি লিখলেন-- “ আল্লাহর নামে আর অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ভীতসন্ত্রস্ত নগরী। ঠাণ্ডা মাথায় পাকিস্তানী বাহিনী ২৪ ঘন্টা ধরে গোলাবর্ষণ করেছে। ওই নগরীর ৭,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। বিশাল-বিস্তীর্ণ এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।"

এখানেই শেষ নয়। ১৯৭১-এর সেই ২৫ মার্চের কালো রাতের ধ্বংসলীলা সম্পর্কে সাইমন ড্রিং আরও করুণ বর্ণনা দিয়েছেন-"সকাল হবার কিছুক্ষণ আগে গোলাবর্ষণ থেমে গেলো। এক ভৌতিক নীরবতা নগরীকে গ্রাস করলো। পরিত্যক্ত ও মৃত এই নগরীতে শুধু শোনা যাচ্ছে কাকের ডাক, মিলিটারি কনভয়, ট্যাংকের ঘর্ঘর শব্দ। দুপুরে আচমকা সৈন্যদলের গাড়ি পুরনো ঢাকায় ঢুকে পড়লো। গোলকধাঁধার মতো গলিতে ১০ লাখ মানুষ বাস করে। পরের ১১ ঘন্টা ধরে চললো ধ্বংসযজ্ঞ। অগ্রবর্তী দলের পেছনে পেছনে সৈন্যরা পেট্রোলের টিন হাতে করে যাচ্ছিলো। যারা পালাতে চেষ্টা করছিলো তাদের গুলি করা হলো। যারা পালালো না, তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হলো।" এভাবেই ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যায় মেতে উঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন এ সম্পর্কে লিখেছেন-"সেই ২৫ শে মার্চ রাতে সাত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হয় আরও তিন হাজার। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। লুট আর ধ্বংস যেনো তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো, সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শ্মশান ভূমি।"

এই গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ১৯৭১ সনের পহেলা মার্চ থেকে ২৫ শে মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫শে মার্চ কালো রাতের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নাম দেয় 'অপারেশন সার্চ লাইট'। বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে বিভীষিকাময় ভয়াল কালরাত। রক্তের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলো বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে। সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সনের ১০ এপ্রিল নরপিশাচ টিক্কা খান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব বুঝে দেন নরঘাতক লে. জেনারেল নিয়াজিকে। এই অপারেশন সার্চ লাইটের নামে কী নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে টিক্কা খান তার বিবরণ স্বয়ং নিয়াজি তার বয়ানে বলেন, "একাত্তর সনের ২৫/২৬ মার্চ জেনারেল টিক্কার আঘাতে সুনসান রাতে বিলাপ-কান্না আর আগুনে পুড়লো বাংলাদেশ। জেনারেল টিক্কা তার শক্তির সবটুকুই ব্যবহার করলেন বিভ্রান্ত বাঙালিকে আক্রমণ করে। সামরিক অভিযানটি ছিলো নিষ্ঠুর, যা বোখারা ও বাগদাদে চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের অথবা জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনারেল ডায়ারের আক্রমণের চেয়েও নৃশংস। বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র ও বাঙালি নেতাদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব ছিলো তার। এটা না করে তিনি পোড়ামাটির নীতির আশ্রয় নেন।" জেনারেল রাও ফরমান আলীও অপারেশন সার্চ লাইটের বর্ণনা দেন। তিনি লিখেছেন-"পূর্ব পাকিস্তানের মাটি লাল করে দিতে হবে।"

২৫ শে মার্চ কালো রাতে নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালি নিধনে পাকি সেনাবাহিনীর সামরিক শাসকদের বর্ণনা প্রকৃত নৃশংসতার অতি সামান্য এবং খণ্ডিত অংশমাত্র। জাত ভাইয়ের বিরুদ্ধে সঠিক-সত্য তথ্য তুলে ধরার কোনো মানসিকতা তাদের ছিলোই না।

জাতিসংঘের 'গণহত্যা কনভেনশনের' মতে, যার মূল লক্ষ্য হলো বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করা।

এ সংজ্ঞায় সুস্পষ্ট যে, এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণে তাদের বিচারের আওতায় আনা আবশ্যক।

২৫শে মার্চ রাতে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ঠিক তার পূর্ব মুহূর্তে ২৬ মার্চ প্রথমার্ধেই তিনি ঘোষণা করেন বাঙালির হাজার বছরের অপেক্ষার পরম আরাধ্য 'স্বাধীনতার ঘোষণা'। যা পরবর্তীতে চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নানসহ অনেকেই পাঠ করেছিলেন। ঐ ঐতিহাসিক মুহূর্তে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউরের কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা সশস্ত্র বাহিনীসহ আপামর জনগণের মধ্যে শক্তি সাহস জোগায়।

ঐ একটি ঐতিহাসিক নির্দেশের অপেক্ষায়ই ছিলো ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি পেয়ে গেলো স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। "ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল" এবং "যার যা আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো" এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রহণ করে দেশ স্বাধীন করার অগ্নি-শপথ। এবার আর কোনো প্রতিবাদ নয়, সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই প্রতিরোধ যুদ্ধই হলো গেরিলা যুদ্ধ। যিনি যেভাবে পেরেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন। তথাকথিত পৃথিবীর সেরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত অসম যুদ্ধ রূপ নেয় জনযুদ্ধে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে, নৈতিক-বুদ্ধিভিত্তিক, সামরিক, কূটনৈতিক সমর্থনে ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের সঙ্গে মুক্তি বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, যুদ্ধ করে দীর্ঘ নয় মাস পরে ছিনিয়ে আনলো মহান স্বাধীনতার লাল সূর্য। পৃথিবীর কোনো দেশ স্বাধীনতার জন্যে এতো রক্ত দেয়নি। ত্রিশ লাখ শহীদ, দু লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর এসেছে আমাদের মহান স্বাধীনতা।

জনগণের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা চিরদিনের জন্যে স্বৈরশাসকমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, বাংলাদেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার জাতীয় ঐক্য।

সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী :

লেখক ও গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়