প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭
হাজরা গ্রামকে রক্ষা করুন

নদীমাতৃক বাংলাদেশের বাস্তবতায় নদী যেমন জীবন ও জীবিকার উৎস, তেমনি কখনো কখনো মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার নির্মম কারণ। চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের হাজরা গ্রাম আজ ডাকাতিয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে তেমনই এক মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হচ্ছে। দিনের পর দিন নদীভাঙনে গ্রামের শতাধিক পরিবারের বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও কবরস্থান বিলীন হয়েছে। এবার হুমকির মুখে রয়েছে আরও অর্ধশতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, একটি মক্তব ও কবরস্থান। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত মানুষ নিঃস্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর অধিকাংশই দরিদ্র দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। যাদের জীবনের একমাত্র সম্বল কয়েক শতক জমির ওপর গড়ে তোলা বসতভিটা। সেই শেষ আশ্রয়টুকুও যদি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে তাদের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কী অবশিষ্ট থাকবে? নদীভাঙন শুধু কিছু জমি বা ঘরবাড়ি হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, শেকড়, জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের বসবাসের ইতিহাস।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতীর ঘেঁষে বালুবাহী বাল্কহেডের বেপরোয়া চলাচল ও সৃষ্ট ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। পাশাপাশি নদীর প্রবল স্রোত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও সেগুলো রক্ষা করতে পারেনি গ্রামটিকে। বরং জিও ব্যাগের নিচের মাটি সরে গিয়ে সেগুলোও নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, শুধু দায়সারা বা সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দিয়ে হাজরা গ্রামকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নদীর গতিপ্রকৃতি ও ভাঙনের কারণ নিরূপণ করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন।
আমরা মনে করি, হাজরা গ্রামের ভাঙন রোধে আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে অবিলম্বে ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন, জরুরি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নদীতীর ঘেঁষে বাল্কহেড চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও প্রয়োজনে সাময়িক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জরুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দ্রুত ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের যে আশ্বাস দিয়েছেন, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, এই আশ্বাস যেন কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।
মনে রাখতে হবে, নদীভাঙনে একটি গ্রামের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলে তা আর সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই সর্বস্ব হারানোর পর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার চেয়ে আগেই মানুষের বসতভিটা ও জীবন-জীবিকা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। হাজরা গ্রামের মানুষের আর্তনাদ যেন প্রশাসনের দপ্তরে পৌঁছানোর পর ফাইলবন্দি হয়ে না থাকে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাই—অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। ডাকাতিয়ার ভাঙন থেকে রক্ষা করুন হাজরা গ্রামকে। রক্ষা করুন অর্ধশতাধিক পরিবারের শেষ আশ্রয়, তাদের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই বাঁচুক হাজরা গ্রাম।





