শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৬

শিক্ষকতায় রাজকীয় বিদায় যেন মর্যাদার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

অনলাইন ডেস্ক
শিক্ষকতায় রাজকীয় বিদায় যেন মর্যাদার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

যে সমাজে শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদা ক্রমক্ষীয়মাণ, যে সমাজে জ্ঞানচর্চার চেয়ে বস্তুগত প্রাপ্তিই মানুষের অর্জনের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে—সেখানে এক বা একাধিক শিক্ষকের রাজকীয় সংবর্ধনা নিয়ে কর্মজীবন শেষ করার দৃশ্য কেবল হৃদয়স্পর্শীই নয়, বরং গভীর আশাব্যঞ্জক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের লালগালিচা সংবর্ধনা, শোভাযাত্রা এবং ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজকীয় বিদায় জানানোর যে সুস্থ ও নান্দনিক চর্চা গড়ে উঠছে, তা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের ‘প্রত্যাশী রুস্তম আলী উচ্চ বিদ্যালয়’-এ আয়োজিত একটি বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এই ইতিবাচক ধারারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এই আয়োজনে মরণোত্তর একজনসহ মোট ছয়জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে যে অভাবনীয় সম্মান ও ভালোবাসায় সিক্ত করা হয়েছে, তা শিক্ষাঙ্গনে এক বিরল নজির গড়ে তুলেছে। ফুল দিয়ে সাজানো লালগালিচা, শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের হাত উঁচিয়ে অভিবাদন, ফুলের সাজে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি এবং মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রা নিয়ে শিক্ষকদের সসম্মানে নিজ নিজ বাসভবনে পৌঁছে দেওয়ার যে আয়োজন করা হয়েছিল, তা কেবল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়—তা ছিল দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি সমাজের এক বিনম্র অর্ঘ্য।

সাধারণত দেখা যায়, পরম নিষ্ঠায় আলো ছড়ানো মানুষ গড়ার কারিগরেরা কর্মজীবনের শেষ দিনে নিঃশব্দে, নিভৃতেই প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। বছরের পর বছর যে মানুষটি একটি প্রজন্মের নীতি, শিক্ষা ও চরিত্রের ভিত গড়ে তুললেন, তাঁর বিদায়বেলাটি প্রায়শই রয়ে যায় অনাদরে ও উদাসীনতায়। প্রত্যাশী রুস্তম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই অপসংস্কৃতি ভেঙে বার্তা দিলো যে, শিক্ষকদের অবদানকে তুচ্ছ করে কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। এমনকি মরহুম শিক্ষক আনোয়ার হোসেন গাজীর স্মৃতিকে শ্রদ্ধায় ধারণ করে তাঁর সন্তানের হাতে সম্মান তুলে দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে, এই মূল্যায়ন সাময়িক কোনো আড়ম্বর নয়, বরং এক আত্মিক কৃতজ্ঞতাবোধ।

এই ধরনের বর্ণাঢ্য আয়োজনের গুরুত্ব কেবল বিদায়ী শিক্ষকদের আত্মতুষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে পুরো সমাজ ও নতুন প্রজন্মের ওপর। একদিকে যেমন বিদায়ী শিক্ষকগণ দীর্ঘ পরিশ্রমের পর এক পরম তৃপ্তি ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বাড়ি ফেরেন, অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষক সমাজ তাঁদের কাজের মূল্যায়নে নতুন অনুপ্রেরণা পান। সর্বোপরি, এই দৃশ্য দেখে বর্তমান শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করতে শেখে যে, অর্থ ও বিত্তই সম্মানের শেষ কথা নয়—জ্ঞান বিতরণ এবং মেধা দিয়ে সমাজ গড়ার কাজটিই সবচেয়ে মহৎ। এটি নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতে শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে শ্রদ্ধার সাথে বেছে নিতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করবে।

প্রত্যাশী রুস্তম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষকবৃন্দ এবং বিশেষ করে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই যৌথ উদ্যোগ প্রংশসার দাবিদার। এটি প্রমাণ করে, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে একটি গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানও পুরো দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

আমরা মনে করি, শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার এই ইতিবাচক প্রবণতা কেবল দু-একটি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রতিটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই চর্চা একটি স্থায়ী নীতি ও সংস্কৃতি হিসেবে ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন। শিক্ষককে তার প্রাপ্য সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে বিদায় জানানোর এই প্রথা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক—কারণ শিক্ষককে সম্মান জানানোর অর্থ হলো জ্ঞান, নৈতিকতা ও একটি আদর্শ ভবিষ্যৎকে সম্মান জানানো।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়