রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:১৭

ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়

হযরতের মূল পূর্বপুরুষগণ মোমেন

অনলাইন ডেস্ক
হযরতের মূল পূর্বপুরুষগণ মোমেন

প্রসঙ্গ : হযরত আদম (আ.) থেকে হযরত আবদুল্লাহ ও বিবি আমেনা (রা.) পর্যন্ত হুজুর (দ.)-এঁর মূলধারার পূর্বপুরুষ ও নারীগণ সকলেই মোমেন ছিলেন।

হুযুর আকরাম (দ.)-এঁর ঊর্ধ্বতন মূলধারার পূর্বপুরুষ নর-নারী সকলেই মু’মিন ছিলেনÑ এ বিষয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে।

প্রথম প্রমাণ : কোরআন মজিদের সূরা শুয়ারা, আয়াত নং ২১৯-এ আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “হে রাসুল! সিজদাকারী মু’মিনগণের মধ্যে আপনার আবর্তন আমি লক্ষ্য করেছি।” হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবেÑ “আপনার পূর্ববর্তী সকল নর-নারী যাদের মাধ্যমে আপনি আবর্তিত হয়ে এসেছেনÑতাঁরা সকলেই ছিলেন সিজদাকারী মু’মিন।” (তাফসীরে ইবনে আব্বাস)।

দ্বিতীয় প্রমাণ : নবী করিম (দ.)-এরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তায়ালা পর্যায়ক্রমে আমাকে পবিত্র ঔরস (মু’মিন পুরুষ) হতে পবিত্র গর্ভের (মু’মিন নারী) মাধ্যমে পাক-সাফ অবস্থায় স্থানান্তরিত করে পৃথিবীতে এনেছেন।”

হাদীসখানা এতো পরিষ্কার এবং এতো শালীন ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে যে, যুগ-যুগান্তরের শিরক ও কুফরীর অপবিত্রতা এবং চরিত্রগত ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে হুযুর (দ.)-এঁর পূর্ব পুরুষগণের মুক্ত থাকার পরিষ্কার ইঙ্গিত তাতে পরিষ্ফুট হয়ে উঠেছে। কোরআনের পরিভাষায় পবিত্র নর-নারী বলতে ঈমানদারকেই বুঝানো হয়েছে। (সুরা মু’মিনুন ১৮ পারা)

তৃতীয় প্রমাণ : ইবনে মোহাম্মদ কলবীর বর্ণনা সূত্রে তাঁর পিতা মুহাম্মদ কলবী (র.) বলেন, অর্থ : “আমি নবী করিম (দ.)-এঁর বংশধারার পূর্ববর্তী পাঁচশত মায়ের তালিকা প্রস্তুত করেছি। তাঁদের মধ্যে আমি চরিত্রহীনতা এবং জাহেলিয়াতের কিছুই পাইনি।” (বেদায়া-নেহায়া)

জাহেলিয়াত অর্থ কুফরী ও শিরকী। চরিত্রহীনতা অর্থ যিনা। সুতরাং হুযুরের ঊর্ধ্বতন মহিলারা ছিলেন শিরক, কুফর ও চরিত্রহীনতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তÑ অর্থাৎ মু’মিনা ও সতী-সাধ্বী নারী ছিলেন। সুতরাং উপরোক্ত তিনটি অকাট্য দলিলের দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নবী করিম (দ.)-এঁর পিতা-মাতা মু’মিন ছিলেন এবং মিল্লাতে ইব্রাহীমীর উপর তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের পর দশম হিজরীতে যখন নবী করিম (দ.) হজ করতে মক্কা শরীফে আগমন করেন, তখন হাজুন নামক কবরস্থানে (বর্তমানে জান্নাতুল মুয়াল্লা) আল্লাহ পাক তাঁর পিতা-মাতাকে এনে পুনর্জীবিত করে দ্বীনে মুহাম্মদী (দ.) গ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ইমাম সোহায়লী ও খতিবে বাগদাদী সূত্রে হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত এ সম্পর্কীয় হাদীসখানা বেদায়া-নেহায়া গ্রন্থে ইবনে কাসির এবং মাওয়াহেব গ্রন্থে ইমাম কাস্তুলানী, ফতোয়া শামীতে আল্লামা ইবনে আবেদীন প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু বিদ’আতি ওহাবী আলেমগণ বলে থাকেন যে, এসব হাদীস নাকি জাল বা মওযু। এ কারণেই উপরে তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র উল্লেখ করা হলো। ওহাবীদের মতে, হযরত আবদুল্লাহ ও বিবি আমেনা (রা.) নাকি কুফরী হালতে ইন্তিকাল করেছেন (নাউযুবিল্লাহ!)। তারা যুক্তি হিসেবে বলে থাকে যে, হযরত আবদুল্লাহ (রা.) রাসুল (দ.)-এঁর জন্মের পূর্বে এবং বিবি আমেনা (রা.) হুযুরের ছয় বছর বয়সে ইনতিকাল করেছেন। তাই তাঁরা ইসলাম গ্রহণের যুগ পাননি। তাদের এই কুটযুক্তি উপরের তিনটি দলিলের দ্বারা অসার প্রমাণিত হয়েছে। তারা আর একটি যুক্তি দেখায় যে, বিবি আমেনার (রা.) কবর যিয়ারত করতে চাইলে আল্লাহ তায়ালা নবী করিম (দ.)-কে অনুমতি দেন। কিন্তু মাগফিরাতের দোয়ার অনুমতি চাইলে প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং তাদের মতে তিনি মু’মিনা ছিলেন না।

আল্লামা মানাভী এর জবাব এভাবে দিয়েছেনÑ কবর যিয়ারতের অনুমতি প্রদানই প্রমাণ করে যে, বিবি আমেনা (রা.) মু’মিনা ছিলেন। আর তিনি নেককার ছিলেন বলেই ঐ সময় মাগফিরাতের প্রার্থনা নামঞ্জুর করা হয়।” তবে নবী করিম (দ.) উম্মতের শিক্ষার জন্য সবসময় মাতাপিতার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতেনÑ যার বর্ণনা নিম্নে করা হবে।

বি:দ্র: এখানে সুন্নীদের পক্ষ হতেও এ ধরনের প্রশ্নের উদয় হতে পারে। মায়ের প্রার্থনা নামঞ্জুর করার কারণ হলোÑ তিনি ছিলেন নেককার। তাহলে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়Ñ নবী করিম (দ.) সবসময় নিজের জন্য এবং পিতামাতার জন্য মাগফিরাত কামনা করতেন। তাহলে কি নবীজী এবং তাঁর পিতামাতা বদকার বা গুনাহগার ছিলেন? নাউযুবিল্লাহ!

এ বিষয়টির জবাব তাফসীরে রুহুল বয়ান ২৬ পারা সূরা আল-ফাতাহ ২য় আয়াতের ব্যাখ্যায় এভাবে বলা হয়েছেÑ “হে রাসুল, আপনার উছিলায় আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের গুনাহ্ আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন”Ñ আল্লাহর এই বাণীর বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেননা তিনি তো ছিলেন বেগুনাহ। সুতরাং আয়াতে “আপনার গুনাহ্ “-এঁর অর্থ হবে “আপনার উম্মতের গুনাহ।”

আর “মাগফিরাত”-এর তিনটি অর্থ রয়েছে যথা : (১) অপরাধ ক্ষমা করা (২) অপরাধ থেকে হেফাযত করা (৩) অপরাধের খেয়াল থেকে নিরাপদ রাখা। প্রথম অর্থ হবে সাধারণ গুনাহ্গারদের বেলায়। দ্বিতীয় অর্থ হবে নেককার ও আল্লাহর অলী এবং নবীজীর পিতামাতা ও সাহাবীগণের বেলায়। তৃতীয় অর্থ হবে নবীগণের বেলায়।

উক্ত ব্যাখ্যার দ্বারা বুঝা গেলোÑ নবী করিম (দ.) নিজের জন্য যে মাগফিরাত কামনা করতেনÑ তার অর্থ হবে “হে আল্লাহ, আমাকে সদাসর্বদা গুনাহ বা অপরাধের খেয়াল থেকে বাঁচিয়ে রেখো।” হুযুরের পিতা-মাতার জন্য মাগফিরাত কামনার অর্থ হবে “হে আল্লাহ, আমার পিতা-মাতাকে গুনাহ থেকে হেফাযতে রেখো।” আর সাধারণ উম্মতের জন্য মাগফিরাত কামনার অর্থ “হে আল্লাহ! তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিও।” (রুহুল বয়ান, সূরা ফাতহ আয়াত-২)

এখন পরিষ্কার হয়ে গেলোÑ হুযুরের পিতামাতা নেককার ছিলেন এবং নবীজী তাদের গুনাহ হতে হেফাযতের জন্যই দোয়া করতেন এবং গুনাহ ও যাবতীয় অপরাধের খেয়াল থেকে নিজেকে নিষ্পাপ রাখার জন্য তিনি সর্বদা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন (তাফসীরে রুহুল বয়ান)। (চলবে)

সূত্র : নূরনবী, লেখক : অধ্যক্ষ এমএ জলিল (র.)।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়