প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৩
মাহবুব আনোয়ার বাবলুর জন্যে গভীর শোক

রাজনীতির মাঠে মত ও পথের ভিন্নতা থাকবেই। কিন্তু একজন প্রকৃত রাজনীতিকের মূল্যায়ন হয় তঁার আচরণ, আদর্শ, মানবিকতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। চঁাদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি, জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট লেখক মাহবুব আনোয়ার বাবলুর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্যে নয়, বরং চঁাদপুরের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাহিত্যাঙ্গনের জন্যে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী কাউকে কষ্ট না দিয়ে গত শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন, আর শনিবার দিবাগত রাতে চিরপ্রস্থান করলেন। তঁার মৃত্যুর আকস্মিকতায় তাই শোকস্তব্ধ সকলে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মাহবুব আনোয়ার বাবলু নানা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তঁার দর্শনধারী ছিলো গুণবিচারীর চেয়েও অনেক বেশি। তিনি চঁাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদে ভিপি-জিএস হওয়ার চেয়ে নিজ দলের মনোনয়নে এ দুটি শীর্ষ পদে যোগ্যদের নির্বাচিত করার ব্যাপারে ছিলেন অধিক মনোযোগী। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কিংবা ব্যক্তিগত অসুস্থতা—কোনো কিছুই তঁাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তঁার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু তঁার ব্যক্তিগত সততা, সহকর্মীদের প্রতি আন্তরিকতা এবং রাজনৈতিক সৌজন্যবোধ সম্পর্কে বিভিন্ন মহলের বক্তব্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে—তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি বিরোধিতাকে শত্রুতায় রূপ দিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বিপর্যয়, অর্থ সঙ্কটসহ কম-বেশি প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। কিন্তু তঁার কথা, আচরণ ও লেখালেখিতে সেসবের ছাপ দেখা যেতো না৷ দেখা যেতো দৃঢ়চেতা মনোভাব, রম্যরস ও কৌতুক।
মাহবুব আনোয়ার বাবলুর জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী, সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে, ব্যক্তি মাহবুব আনোয়ার বাবলু দলীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিভাজনের এই সময়ে এমন দৃশ্য আমাদের আশাবাদী করে তোলে।
আজ দেশের রাজনীতিতে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্যে শুভ নয়। অথচ একজন প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে দলমত নির্বিশেষে যে শোক ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়।
একজন রাজনীতিকের প্রকৃত পরিচয় তঁার পদ-পদবি নয়; বরং মানুষের স্মৃতিতে তিনি কেমনভাবে বেঁচে থাকেন, সেটিই তঁার সবচেয়ে বড় অর্জন। মাহবুব আনোয়ার বাবলুর জীবন ও মৃত্যু সেই সত্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে তঁার যে মানবিক, হাস্যোজ্জ্বল ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্বের চিত্র উঠে এসেছে, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্যেও শিক্ষণীয়।
আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উচিত প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; থাকবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবিকতা।
মাহবুব আনোয়ার বাবলুর বিদায়ে চঁাদপুর এক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক অভিভাবককে হারালো। তঁার রাজনৈতিক অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তঁার জীবন থেকে যদি আমরা সহনশীলতা, শালীনতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তবে সেটিই হবে তঁার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমরা মাহবুব আনোয়ার বাবলুর মৃত্যুতে জেলাবাসীর পক্ষে গভীর শোক প্রকাশ করছি, তঁার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা চাই, তঁার কর্মময় জীবন চঁাদপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকুক। তঁার নামে নাগরিক শোকসভা করে স্মরণের আভরণে মরণেরে যত্নে ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।








