শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০:১২

বাস্তুসর্প ও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প শৈলীর প্রবর্তক নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন

মোস্তাফা কামাল যাত্রা
বাস্তুসর্প ও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প শৈলীর প্রবর্তক নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন

বালক বয়সে গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় সম্পৃক্ত হলেও খেলাঘর, ছাত্র ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠতাহেতু রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিভ্রমণসহ ইত্যাকার প্রসঙ্গের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার ধারাবাহিকতা আমার ব্যক্তি মানস গড়ে তুলতে রেখেছে অনস্বীকার্য ভূমিকা।

মাধ্যমভিত্তিক অগ্রজদের সাহচর্য আমাকে বরাবরই করেছে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর। এই ক্ষণে প্রয়াত, জীবিত সেসব অগ্রজদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ পরিক্রমায় বর্তমানে সম্পৃক্ত আছি ‘ইউনাইট্ থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাকশন্ (টঞঝঅ/উৎস)’ নামক উন্নয়ন সংস্থাতে। নিরবচ্ছিন্ন নাট্যকলা শ্রমিক হিসেবে বিগত ২ যুগ ধরে কর্মরত আছি গ্রুপ থিযেটার ঘরানার নাট্যক্রিয়ায়।

যেসব অগ্রজের সাহচর্য আমার শিল্প ভাবনা ও শিল্প চৈতন্য গড়ে তুলতে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছিলো, তাঁদের অন্যতম হলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তাঁকে নিয়ে এবং তাঁর প্রাচ্যধারার শিল্প দর্শন এবং তার উপর ভিত্তি করে আমাদের ঐতিহ্যিক বাংলা নাট্যের ভিত্তিমূল বা শিকড় অনুসন্ধান অভিপ্রায়, আবিষ্কারের প্রত্যয়ে আমার আজকের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

আচার্যগণ ক্ষমতা, দক্ষতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সপ্রতিভ হবেন--এটাই স্বাভাবিক ও বাস্তবতা। আমাদের আলোচ্য নাট্যাচার্যও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে তিনি ছিলেন একজন বাস্তুসর্প। যে সর্প বা সাপ বাস্তুভিটা সংরক্ষণে থাকেন সদা সচেষ্ট। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন প্রাচ্য ভাবধারার সংরক্ষণে যেমন ছিলেন উচ্চকণ্ঠ, তেমনি ছিলেন বিলুপ্তপ্রায় প্রাচ্য ঘরানার ঐতিহ্য বিশ্লেষক। শুধুমাত্র উক্ত ভূমিকাতেই যে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন তা নয়, উপরন্তু তিনি

প্রাচ্যধারার শিল্প ঘরানার স্বকীয়তা সংশ্লেষণে প্রবর্তন করেছেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ শিরোনামের নবধারার শিল্পশৈলী। যা তাঁর কথনে, কথকতায় আর সৃজনে পেয়েছে জীবন্ত রূপ। চর্চা ও তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সেই শিল্প দর্শনের পরিচর্যায় ও প্রসারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই শিল্পবন্ধু নাছিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও শিল্প-সুহৃদ সহকর্মী ড. আফসার আহমেদসহ তাঁর ভাবশিষ্যগণ।

সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে লালখান বাজার (শহীদনগর) এলাকায় স্বাধীনতোত্তর শিশু ও শৈশবকাল অতিবাহিত করার কারণে সমসাময়িক অগ্রজদের সাথে প্রয়াত নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের তৎকালীন ইস্পাহানী মোড়স্থ বাসভবনে আমার যাতায়াতের সুয়োগ হতো প্রায়শই।

আশির দশকের শুরুর দিকের বছরগুলোতে জিয়া স্যারের বাসায় প্রথম মুখোমুখি হই নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের। আড্ডার কনিষ্ঠতম কর্মী হিসেবে নাট্যাচার্যের আমাকে ইংগিত করে করা এক মন্তব্যে উপস্থিত সকলে অট্টহাস্যে ফেটে পড়েছিলো। যা স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তবে কী মন্তব্য করেছিলেন স্মরণে নেই। সে সময় তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়স্থ বাংলা বিভাগের শিক্ষক, আর জিয়া স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়স্থ চারুকলা বিভাগের নাট্যকলা শাখার অধ্যাপক।

১৯৮৬ সালের শেষের দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক নাট্যকার সেলিম আল দীন তাঁর অপর দু সহকর্মী ড. আফসার আহমেদ ও রশীদ হারুন কর্তৃক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ খোলার জন্যে দুটি কক্ষ দখল করা নিয়ে যে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো এবং একটি নাট্যকলা বিভাগ খোলার যৌক্তিক দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়স্থ চারুকলা বিভাগের নাট্যকলা শাখার শিক্ষার্থীদের আহ্বানে আহূত নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পাদদেশের এক সমাবেশ, মানববন্ধনে যোগ দিয়েছিলাম। সেই সমাবেশে বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন ও চর্চার বিকাশে সেলিম আল দীন ও তাঁর গড়ে তোলা ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর নাট্যক্রিয়ার অগ্রণী ভূমিকার কথা বক্তাদের মুখে শুনে নাট্যাচার্যের প্রতি আমার সৃষ্টি হয় গভীর শ্রদ্ধাস্পদ মনোভাব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্য শিক্ষার জন্যে একটি স্বতন্ত্র নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ গড়ে তুলতে জনাব সেলিম আল দীনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন স্বধীনতাপূর্বকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়স্থ বাংলা বিভাগে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার গোড়াপত্তনকারী নাট্যজন অধ্যাপক জিয়া হায়দার। সুযোগ পেলেই নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন চট্টগ্রাম আসতেন এবং নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের কাছ থেকে এই সংক্রান্ত মতামত ও পরামর্শ নিতেন। এই সময় নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের কাছে বাংলা নাট্যের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যিক শিকড় অনুসন্ধানের দীক্ষা নিয়েছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন । মূলত এই সময়কালেই নাট্যাচার্যের পূর্বপুরুষ নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণার গতি-প্রকৃতি, তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে নিজেকে আলোকিত করার হাতেখড়ি হয়েছিলো। যা নাট্যাচার্যের পথচলায় এনেছিলো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও পদ্ধতিগত পরিভ্রমণ। আর আমরা পেয়েছি বাংলা নাট্যের ঐতিহাসিক পটভূমি আর স্বাতন্ত্রিক ও সমৃদ্ধ নাট্য বৈশিষ্ট্য।

১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে আমি সহপাঠী বর্তমানে ঢাকা আরণ্যক কর্মী বিশিষ্ট অভিনেতা বন্ধুবর জয়রাজ ও মেহেদীসহ গ্রুপ থিয়েটার ‘মঞ্চমুকুট’-এ যোগ দেই । দীর্ঘ ১ দশক ‘মঞ্চমুকুট’ কর্মী হিসেবে চট্টগ্রামে বিভিন্ন নাট্য সংগঠন ও নাট্য মোর্চা আয়োজিত নানান অনুষ্ঠানে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের উপস্থিতি ও নাট্য অভিজ্ঞতার সহযাত্রী হিসেবে তাঁকে যেভাবে জেনেছি-বুঝেছি, তাঁর নাট্যসৃষ্টি ও শিল্প দর্শনকে যেভাবে উপলব্ধি করেছি, তা আমার নাট্য ভাবনা ও শিল্প মানসের বিকাশ ঘটাতে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়েই নাট্যাচার্য প্রতিবার প্রভাবক হিসেবে আমার কাছে ধরা দিয়েছেন।

১৯৯১-৯২ সেশনে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে নাট্যকলা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ নেওয়ার অভিপ্রায়ে পরিবারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় স্নাতক ১ম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়ে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের পাশাপাশি নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে কামাল উদ্দিন নীলু, রহমত আলী স্যারের সাহচর্যে আধুনিক নাট্য বিজ্ঞানের যে শিখন আমার নাট্যশিক্ষাকে ব্যাপক ও ব্যাপৃত করেছিলো, তাতে ছেদ ধরাতেন নাট্যাচার্যের প্রাচ্য ঘরানার নাট্য অভিব্যক্তি ও অনুসন্ধিৎসানির্ভর মতামত এবং তাঁর প্রকাশিত নাটক ও সংশ্লিষ্ট রচনাবলি।

বাংলা নাট্যের বৈচিত্র্যময় নাট্যকৃত্য এবং সেসবের শৈল্পিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং প্রাচ্য ভাবধারার অনুসরণে পাশ্চাত্য নাট্যধারা গড়ে ওঠার সপক্ষে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের যৌক্তিক মতামত ও অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর দৃঢ়তা সর্বদাই আমাকে করেছে প্রভাবিত। যার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়েই বাংলা নাট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘বৈঠকি ঢং’ অবলম্বনে পরিকল্পনা করি নব নাট্য আঙ্গিক ‘সভা নাটক’ বা ‘মিটিং প্লে’ ঘরানার নাট্যধারার এবং দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প দর্শনের তাত্ত্বিকতার ভিত্তিতে নির্মাণ করি ফটোগ্রাফিক ড্রামা, ড্রামাজিক প্লে, নেগেটিভ-পজিটিভ ড্রামা, টাইম সুইট ইন থিয়েটার ইত্যাদি নাট্য অভিধা তথা ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ উজ্জীবিত নাট্য রচনা ও উপস্থাপনা শৈলীর প্রচলন।

বাংলার ভূমিজ ও কৃত্যমূলক সাংস্কৃতিক উপাদানে সমৃদ্ধ নাট্য ভাবনার, নাট্য রচনার, নাট্যতত্ত্বের প্রভাবক শক্তির সৃজনশীল আগ্রাসনের যৌক্তিকতার আলোকে উল্লেখিত ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্প স্মারক সৃষ্টিতে আমাকে উদ্বুদ্ধকারী নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের প্রতি জানাই বিনম্র কৃতজ্ঞতা। কারণ আমার সেই পাঠের হাতেখড়ি তাঁরই শিল্পদর্শন ও শিল্পতত্ত্বের অনুশাসনেই হয়েছিল।

প্রস্তাবিত ও পরিকল্পিত উল্লেখিত নাট্য আঙ্গিক ও বৈচিত্র্যময় নাট্য অভিধা যথাক্রমে মিটিং প্লে, ড্রামাজিক প্লে, টাইম সূইচ ইন থিয়েটার, নেগেটিভ-পজিটিভ ড্রামা, ফটোগ্রাফিক ড্রামা ঘরানার অনুশীলন, উপস্থাপনায় ও রচনায় ইতোমধ্যে যে অংশগ্রহণমূলক প্রবণতার উন্মেষ ঘটেছে, তা দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। তাকে চর্চা, ব্যবচ্ছেদ ও পুনঃ নির্মাণের অভিপ্সায় নবীন ও আগ্রহী নাট্যজন, নাট্যামোদী এবং শিল্প সমালোচকবৃন্দ কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে নাট্যাচার্যের ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্প বৈশিষ্ট্য ও ধারার বিকাশ এবং ব্যাপ্তি ঘটাতে এগিয়ে আসবেন বলে আমার প্রত্যাশা। সর্ব মহলের পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও পরামর্শ উল্লেখিত নাট্য ঘরানাসমূহের আনবে সমৃদ্ধি । এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী, আহম্মদ কবীর, ইউসুফ ইকবাল দিপু, জাহেদুল আলম, আলী আহাম্মদ মুকুল প্রমুখকে এক্ষণে জানাই বিনম্র অভিবাদন।

দেশজ নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের অভিপ্রায়ে বাংলার ঐতিহ্যময় জীবনাচারের পরতে পরতে যে শিল্প বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো, তাকে ‘সালোক-সংশ্লেষণ’ প্রক্রিয়ায় পুনরুদ্ধারের শিল্পযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে এবং সে সকল নাট্যকৃত্যের ভাবাদর্শে পাশ্চাত্যের কোন্ কোন্ নাট্য অভিধা গড়ে উঠেছিলো তাকে বিশ্লেষণাত্মক ও যৌক্তিকতার মনোভাব নিয়ে ব্যাখ্যা করতে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন বরাবরই ছিলেন একরৈখিক ও দৃঢ়চেতা।

প্রকৃতপক্ষে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন ছিলেন একজন বঙ্গজ শিল্পানুসন্ধিৎসু ‘বাস্তুসর্প’। দেশজ শিল্প ও সাহিত্যের ঐতিহ্য সুসংহত করতে, তার মৌলিকত্ব সুরক্ষা করতে, তার মেধাস্বত্ব ও ঐতিহ্যিক ধারাবাহিকতার শিকড় আবিষ্কার করতে, নিজস্ব নাট্যভাষা সৃষ্টি ও সংরক্ষণে তিনি ছিলেন বাস্তুসর্প তুল্য। তাঁর সেই অবস্থান বিশ্বনাট্যে আমাদের বাংলানাট্য ধারার স্থান সুনির্দিষ্ট করার পাশাপাশি চর্চা ও অনুশীলনে ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে রেখেছিলো অগ্রগণ্য ভূমিকা।

পাঠকের সদয় অবহিতির অভিপ্রায়ে এ প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান যে কতো সুদৃঢ় ছিলো, তা পর্যলোচনার জন্যে একটি ঘটনা উপস্থাপন করছি। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের আমন্ত্রণে কলা অনুষদের গ্যালারীতে অনুষ্ঠিত সেমিনারে যোগ দিতে চট্টগ্রাম আসেন নাট্য শিক্ষক সেলিম আল দীন। আমি তখন নাট্যকলায় সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। নাট্যাচার্যের নাট্য রচনা ও উপস্থাপনা শৈলী এবং বর্ণনাত্মক অভিনয় রীতি নিয়ে সেই সেমিনারে আমার এক কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জানলে তা বোধগম্য হবে।

আমার প্রশ্ন এবং সংশয়মূলক বক্তব্যটি ছিলো : আপনার নাট্য সাহিত্যের রচনাশৈলী সর্বজনের বোধগম্য নয়, তদুপরি আপনার রচিত নাট্যসাহিত্যভিক্তিক নাট্য উপস্থাপনা রীতিও ব্যাপক মাত্রায় চর্চিত নয়। হতে গোণা ২/৩ জন ব্যক্তি ড. জামিল আহমেদ ও নাছির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ছাড়া অপরাপর নাট্য নির্দেশক বা পরিচালকগণ এই ধারার নাট্য নির্মাণ ও উপস্থাপনার সিদ্ধহস্ত নন। ফলে আমি মনে করি এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেছি : আপনার নাট্যসাহিত্য ও নাট্য উপস্থাপনা রীতি কালোত্তীর্ণ হবে না। সেই সাথে আপনার নাট্য সৃষ্টির অনুশীলক ও দর্শকবৃন্দ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীবদ্ধ। আমার এ অভিমতের বিপরীতে আপনার মতামত জানতে চাই।

খানিকক্ষণ চুপ থেকে তিনি রবীন্দ্র নাট্যের সমকালীন চর্চার সাথে তাঁর নাট্যের তুলনামূলক পরিপ্রেক্ষিত ব্যক্ত করে বেশ দৃঢ়তার সাথেই বলেছিলেন, “আমার নাট্যসৃষ্টি শুধু সমকালীন কেন যুগোত্তীর্ণও হবে। ১০০ বছর পরেও যদি ররীন্দ্র নাটক প্রযোজনা বা মঞ্চস্থ হয়, তবে আমার নাটক ১০০০ বছর পরেও নাট্যসাহিত্য ও নাট্য প্রযোজনা হিসেবে টিকে থাকেবে। রবীন্দ্র ও নজরুল নাট্য যদি বাংলা নাট্য উপস্থাপনা শৈলীকে সুনির্দিষ্টভাবে আত্মীকরণ না করেও শতবর্ষী হতে পারে, তবে আমার নাট্য সৃষ্টি অবশ্য অবশ্যই কালেত্তীর্ণ হতে বাধ্য। কারণ আমি বাংলা নাট্যের কৃত্যমূলক ধারাকে উপজীব্য করে সুনির্দিষ্ট আঙ্গিকনির্ভর নাট্যসহিত্য রচনা করেছি। যা অনেক বেশি সুচিন্তিত ও নির্দিষ্ট উপস্থাপনা রীতি তথা ঘরানার প্রাধান্য নিয়ে সুসংহতভাবে গ্রন্থিত হয়েছে।”

অন্য দিকে নাট্যাচার্যের নাট্য নির্মাণধর্ম বর্ণনাত্মক রীতি না বুঝলে তাঁর নাট্য সাহিত্যের মঞ্চরূপে নির্মাণও দুরূহ বলে তিনি মন্তব্য করে বলেন, “ব্রেখট যেমন সমাজতান্ত্রিক না হলে তাঁর নাটক নির্দেশনা বা অভিনয় করতে নিষেধ করেছেন, আমিও তেমনি বলবো বাংলার ঐতিহ্যিক নাট্য রচনা ও অভিনয় রীতি বর্ণনাত্মক ধারার বোদ্ধা যারা নন, আমার নাটক পড়ার বা প্রযোজনা করার অধিকারও তাদের নাই। আমার শিল্পবন্ধু নাছিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বর্তমানে এই নাট্যরীতির সফল মঞ্চরূপকার বলেই সে আমার নাটক প্রয়োজনা করার অনুমতি পেয়েছে। আমার প্রত্যশা, শিল্পবন্ধু বাচ্চুর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাংলা নাট্যের ভাষা, রীতি, প্রকৃতি একদিন মহীরূহে পরিণত হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বর্ণনাত্মক ধারাকে নতুন প্রজন্মের শিল্প শ্রষ্টাগণ আত্মস্থ করে বাংলার শিকড় সন্ধানী নাট্য রীতির বিকাশ ঘটাবে। এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাংলার নিজস্ব নাট্যশৈলী হিসাবে বর্ণনাত্মক রচনা ও প্রযোজনা এবং অভিনয় রীতি স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্ব নাট্যের ইতিহাসে স্থান করে নেবে। আধুনিক নাট্য ঘরানার অনেক উপাদানের আদিরূপ আমাদের নাট্য সংস্কৃতির সমকালীন নাট্য বৈশিষ্ট্য। যা চোর্যবৃত্তির বা অনুকরণের বেড়ীতে বেষ্টিত হয়েছে কেবল। আমার গবেষণা সেখানেই, সেই নাট্য ঐতিহ্য অনুসন্ধানে ব্যাপৃত।”

প্রিয় পাঠক, নাট্যাচার্যের নাট্য দর্শন, নাট্যতত্ত্ব এবং শেকড় সন্ধানের প্রক্রিয়া ও তার সত্যাসত্য সম্বন্ধে যে আস্থা ও দৃঢ় অবস্থান তিনি লালন করতেন, তাকে সুরক্ষা দান সর্বোপরি তার অনুসরণ ও অনুকরণে পাশ্চাত্য নাট্যধারা সৃষ্টির প্রতি তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গী অবলোকন করেছি, তা প্রকৃতপক্ষে একজন বাস্তুসর্পের প্রতিরূপ মাত্র।

বর্ণিত সেমিনারশেষে আমরা ফিরে এসে যোগ দেই নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার স্যারের ক্লাসে। নাট্যাচার্য বাংলা বিভাগের সাথে আনুষ্ঠানিকতা শেষে আসেন চারুকলা বিভাগের নাট্যকলা শাখায়। উদ্দেশ্য নাট্যসন্তের সাক্ষাৎ। জিয়া স্যারের ব্যক্তিগত কক্ষে আমাদের ক্লাস হতো বিধায় নাট্যাচার্য কক্ষে প্রবেশ করেই আমাকে দেখে বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে পর্যবেক্ষণোত্তর জিয়া স্যারের অনুমতি নিয়ে, মধ্যযুগীর বাংলা সাহিত্যের অন্তর্গত নাট্যাভিমুখী সম্ভাবনাসমূহের আলোকে তাঁর নাট্যদর্শন ও নাট্যতত্ত্বের ভিত্তিভূমি আলোকপাত করে বোঝানোর চেষ্টা করেন; যার বিস্তার ও বিস্তৃতি আমাদের কৃত্যধর্মী উপস্থাপনাশৈলী ও ঐতিহ্যময় সাহিত্যিক ধারা থেকে উদ্ভূত, তা কখনও স্থায়িত্বশীল না হয়ে পারে না। কারণ তাঁর নাট্যভাবনার শেকড় একেবারেই বঙ্গজ। কোথাও থেকে ধার করা নয়।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে পেশাগত কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সাথে মনোবিকাশক নাট্য সংস্থা ‘উৎস’ আয়োজিত জাতীয় প্রতিবিধানমূলক (থেরাপিউটিক) নাট্য কর্মশালা আয়োজন সংক্রান্ত যোগাযোগ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে নাট্যাচার্যের সাথে পুনরায় আমার সাক্ষাৎ হয়। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে সাক্ষাৎ হলেও তাঁর উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং ‘থেরাপিউটিক থিয়েটার’-এর বিভিন্ন অনুষঙ্গের প্রয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর আগ্রহ আমাকে উজ্জীবিত করেছিলো। উক্ত কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাট্য সাহিত্যের রচনায় ‘থেরাপিউটিক থিয়েটার’-এর উপাদানগুলোকে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা নিয়ে তাঁর আগ্রহমূলক বক্তব্যও সকলকে উৎসাহিত করেছিলো । ৫ম ও ৬ষ্ঠ জাতীয় থেরাপিউটিক থিয়েটার কর্মশালা অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে নাট্যাচার্যের ক্যাম্পাসের বাসায় ও প্রত্যুষ পদভ্রমণে তাঁর সাথে যে আলাপচারিতা এবং নাট্যকলা বিষয়ক কথোপকথন বাংলা নাট্যের স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকত্ব অনুধাবন করতে রেখেছিলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট নাট্যধারার রচনা, অভিনয় ও উপস্থাপনা প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-যৌক্তিকতা আমার জ্ঞান পিপাসাকে করেছে স্বনির্ভর। যার প্রভাব ইতোমধ্যে আমার নাট্যক্রিয়া ও নাট্যযজ্ঞে প্রতিফলিত হচ্ছে নিজেরই অজান্তে। অবচেতনভাবেই নাট্যাচার্যের প্রভাব পড়ছে আমার নাট্যসৃষ্টিতে। তাঁর সেই সংস্পর্শ আর অকৃত্রিম অনুদানের জন্যে আমি নাট্যাচার্যের কাছে চিরঋণী।

কর্মশালা চলাকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ক্যাম্পাসস্থ ব্যাচরল শিক্ষক কোয়ার্টারে আমার এবং আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত বিশ্ববিখ্যাত থিয়েটার থেরাপিস্টদের থাকার ব্যবস্থা করতো। কর্মশালা পরিচালনায় জন্যে আমরা বিভাগের থিয়েটার ল্যাবরটরীতে থাকাকালীন তাঁর অফ পিরিয়ডে ন্যাট্যাচার্য আমাকে ডেকে নিয়ে মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞানের প্রসারে এবং অনুশীলনের ক্ষেত্রে নিজস্ব অভিমত দেওয়ার পাশাপাশি, দেশজ তথা বঙ্গজ রীতিতে কীভাবে ‘থেরাপিউটিক থিয়েটার’ চর্চা করা যায় এবং সেক্ষেত্রে তাঁর বিবেচনায় কী কী সম্ভাবনা আছে তা তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আলোকপাত করতেন। তাঁর সেই মতামত ও পরামর্শ আমার জন্যে ছিলো নতুন দিশা।

থেরাপিউটিক তথা প্রতিধানমূলক নাট্যের পাশ্চাত্য টার্মস ও টার্মোলজিগুলোকে বাংলা অভিধা দেওয়ার বিষয়ে নাট্যাচার্যের আগ্রহের ব্যাপারটি ছিলো অতি উচ্চকিত। আত্মীকরণের পথ পরিক্রমায় মনোবিশ্লেষক নাট্যধারাকে দেশজ উপস্থাপনা রীতিতে কীভাবে লক্ষ্য জনগোষ্ঠী এবং মানসিক সমস্যার ধারণানুসারে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, এ বিষয়ে বাংলাদেশে এই নাট্যবিজ্ঞানের অনুশীলন সূচনাকারী সংস্থা ‘উৎস’ নানাবিধ পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। নাট্যাচার্যের অভিমত ও পরামর্শ অনুসরণ করেই নাট্য সংস্থা ‘উৎস’ থেরাপিউটিক থিয়েটারের অনুশীলন ও প্রয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। এ ক্ষেত্রে বিভাগীয় শিক্ষক ড. আফসার আহমেদ এবং রশীদ হারুনের পরামর্শ এবং অনুপ্রেরণাও আমাদের জন্যে আশীবার্দ হিসেবে গণ্য।

‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্প দর্শন-তত্ত্ব-প্রকরণের তাত্ত্বিকতার আলোকে ব্যক্তিগত অভিমতের আনুপূর্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশে ‘থেরাপিউটিক থিয়েটার’ পদ্ধতির প্রয়োগ প্রক্রিয়ার যে দেশজ রূপ অনুশীলন ও প্রয়োগ বহুমত্রিকতায় বিকশিত হবে তারও প্রস্তাবক নেপথ্য পুরুষ হয়ে ইতিহাসে স্থান পাবেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। মনোচিকিৎসা বিজ্ঞান ও নাট্যবিজ্ঞানের সমন্বয়ে পাশ্চাত্যের দার্শনিক ড. জেকর লেভী মরেনো আধুনিক নাট্যশৈলী ‘থেরাপিউটিক থিরেটার’-এর যে প্রয়োগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলো বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে, তা একবিংশের প্রারম্ভে এসে বাংলা ঐতিহ্যিক নাট্য ঘরানার সংশ্লেষণে যে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্প শৈলীর সৃষ্টি করবে তার প্রস্তাবক হিসাবে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন বঙ্গজ মনোবিশ্লেষক নাট্যধারার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের এই ধারার নাট্যবিজ্ঞান অনুশীলক থিয়েটার থেরাপিস্টগণ এ প্রসংগে সৃজনশীল ও স্বতঃস্ফূর্ততার উন্মেষ ঘটিয়ে কালের সাক্ষী হিসেবে নাট্যাচার্যের প্রত্যাশার পূর্ণতা দেবে, যা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

নাট্যাচার্য থেকে তখন সংগৃহীত পার্বত্য আদিবাসীদের মিথ ও রূপকথা সংক্রান্ত একটি চটি বইয়ের গল্পগুলোর উপর ভিত্তি করে অগ্রজ নাট্যজন ও নাট্যকার খন্দকার মূর্তজা আলী রচনা করেন পার্বত্য আদিবাসী আখ্যান ‘ভগা কাইন’। তখন মূর্তজা ভাইকে বইটি দিয়ে বলেছিলাম, বইটিতে উল্লেখিত আদিবাসী মিথগুলোকে ব্যবহার করে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন প্রবর্তিত বর্ণনাত্মক রীতিতে পার্বত্য আদিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনের সংকট ও সম্ভাবনার আলোকে একটি নাটক রচনা করতে। যেই কথা, সেই কাজ। মূর্তজা ভাই লেগে পড়েন তার স্বভাব সুলভ নিষ্ঠা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট পঠন-পাঠন, পুনঃপাঠের সুবিধার্থে ‘নাট্যাধার’-এর উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বাংলা নাটকের ভাষা শৈলী ও রচনাভঙ্গি নিয়ে সেমিনার। মূর্তজা ভাই যে আয়োজনে সেমিনার পেপার উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি চলে ‘ভগা কাইন’-এর রচনা প্রচেষ্টা।

ইতোমধ্যে নাট্যাচার্য নাটকে একুশে পদক পাওয়ায় ‘নাট্যাধার’ ঢাকাস্থ জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজন করে নাট্যাচার্যের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও দলীয় প্রয়োজনা আনন জামান রচিত ‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকের প্রদর্শনী। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে আমাদের আয়োজনকে সমৃদ্ধ করায় তাদের জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। সংবর্ধনা সভায় তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলা নাট্যের যে ঐতিহ্যিক স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটাকে ধারণ করে আমাদের পরবর্তী নাট্য রচনা, নির্মাণ ও উপস্থাপনা শৈলীকে এগিয়ে নেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। যাতে করে বিশ্ব নাট্যের ইতিহাসে বাংলা নাটক নিজস্ব চরিত্র নিয়ে কালোত্তীর্ণ অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে। সংবর্ধনায় নাট্যাচার্যকে দেয়া মানপত্রটি রচনা করেছিলেন তাঁর আরেক ভাবশিষ্য নাট্যকার রুবাইয়াত আহমেদ। এই সুযোগে তাকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

এখানে উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তমঞ্চে ‘নাট্যাধার’ প্রযোজনা ‘শিখণ্ডী কথা’ অবলোকন করে নাট্যাচার্য বর্ণনাত্মক রীতিতে উপস্থাপিত নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বেশ কিছু মতামত দেন। যার উপর নির্ভর করে পরবর্তীতে প্রয়োগকার হিসেবে নাটকটিতে পরিবর্তনগুলো এনে প্রযোজনাটির মান উন্নয়ন করেছিলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ও পরবর্তীতে শিক্ষক এবং নাট্যাচার্যের আরেক ভাবশিষ্য আনন জামান রচিত নাটকটির নামকরণও করেছিলেন নাট্যাচার্য। তিনি এমন মন্তব্যও করেছেন যে, বর্ণনাত্মক রীতিতে রচিত ‘শিখণ্ডী কথা’ নাটকটি একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। বর্ণনাত্মক রীতির প্রতি নাট্যাচার্যের এই দুর্বলতা ও একরৈখিকতা বাংলা নাটকের নিজস্বতা সৃষ্টি করতে বরাবরই রেখেছে উদ্দীপনামূলক ভূমিকা।

আদিবাসীদের কৃত্যমূলক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সাথে বাঙালির আত্ম পরিচয়ের বিকাশমান ধারার বর্ণনাত্মক অভিপ্রায়ের যুথবদ্ধতায় নাট্যাচার্য যে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ নাট্য প্রকরণের নব নির্মাণ প্রক্রিয়ার সূচনা করেন, তার অনুসরণেই আমাদের দেশে এখন চলছে নৃ-গোষ্ঠী নাট্য অভিজ্ঞান সৃষ্টির আনুপূর্বিক চর্চা। যার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে আমাদের ন-ৃগোষ্ঠিভিত্তিত আদিবাসী নাট্য পরিভাষা।

বাস্তুসর্পের ন্যায় সেই ঐতিহ্যিক নাট্য ধারাসমূহের পরিচর্যা, নিপুণ শিল্পীর ঐকান্তিকতা নিয়ে নাট্যাচার্য প্রতিনিয়তই যে সচেষ্ট ছিলেন, তা তাঁর পরবর্তী কালের গবেষণা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও নাট্যসৃষ্টির মধ্যে আমরা গভীর অভিনিবেশ সহকারে প্রত্যক্ষ করি। ঐতিহাসিক পটভূমির পারম্পর্য রক্ষা করে নাট্যাচার্য কেবল ক্ষান্ত হননি, তিনি নৃ-তাত্ত্বিক নাট্যসত্যের বৈচিত্র্যও পর্যবেক্ষণ করেছেন নির্লিপ্তভাবে। বৈচিত্র্যময় জাতিতাত্ত্বিক নাট্য বৈশিষ্ট্যসমূহও নাট্যাচার্য দায়বদ্বতা নিয়ে পুনরাবিষ্কার করেছেন ।

নাট্যাচার্যের দেয় পার্বত্য আদিবাসীদের রূপকথা ও মিথভিত্তিক গ্রন্থের ব্যবহার করে কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ কলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বগালেক নৃ-গোষ্ঠী জনসাধারণের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছিলো, তার সাথে পার্থক্য রূপকথা পাতালপুরীর রাজপুত্রের মর্তাগমন বিষয়ক রূপকথার তুলনামূলক ব্যাখ্যাকে উপজীব্য করে খন্দকার মূর্তজা আলী ততোদিনে রচনা করেছেন ‘ভগা কাইন’ শিরোনামের একটি আখ্যান।

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ‘দ্বৈতাদ্বৈবাদী’ শিল্পতত্ত্ব ও বর্ণনাত্মক রীতিতে পরবর্তীতে নাট্যজন জামাল হোসাইন মঞ্জু ‘ভগা কাইন’ আখ্যানটির মঞ্চরূপ দেন। ‘ভগা কাইন’ নামেই দেয় নাট্যরূপ অবলম্বনে ‘নাট্যাধার’ নাটকটি প্রযোজনার উদ্যোগ নিয়েছে। যা নাট্যাচার্যের শিল্পদর্শনের বিকাশে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে সময়ের বিবেচনা পাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

পরিশেষে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পের প্রবর্তক, ঐতিহ্যিক বাংলা নাট্যধারা সুরক্ষার বাস্তুসর্প হিসেবে স্বীকৃত নাট্যজন, বর্ণনাত্মক রীতিতে বাংলা নাটকের রচনা-উপস্থাপনা-অভিনয় প্রথার প্রচলনকারী, রবীন্দ্রোত্তর বঙ্গজ ভাবধারার একমাত্র নাট্যবত্তা, নাট্যশিক্ষক, নাট্য নির্দেশক, নাট্যকার, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের শিল্প দর্শনের বহুমাত্রিক বিকাশের আকাক্সক্ষায় ইতি টানছি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়