প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০১:১৯
চাঁদপুরের সাংবাদিকতায় কাজী শাহাদাত: চার দশকের এক আলোকবর্তিকা!

কোনো বিশেষ সম্মাননা কিংবা ধাতব স্মারক কেবল একখণ্ড শোভাবর্ধক ফ্রেমমাত্র নয়; বরং তা একজন মানুষের আজীবন নীতি-নিষ্ঠা, সৃজনশীল মনন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উদাত্ত গণস্বীকৃতি। সম্প্রতি ‘দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ’-এর রজতজয়ন্তী মহোৎসবে বরেণ্য সাংবাদিক, সংগঠক ও রোটারিয়ান কাজী শাহাদাতকে যে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হলো, তা কার্যত কোনো একক ব্যক্তিসত্তার সীমানা স্পর্শ করে পুরো মেঘনা অববাহিকার গণমাধ্যম ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার ইতিহাসকে এক ভিন্ন উচ্চতায় সমাসীন করেছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতাহীন সেই আশির দশকে মফস্বল প্রান্তরে বসে সাহসিকতার সঙ্গে সংবাদপত্র পরিচালনা ও সম্পাদনা করা যেখানে ছিল চরম নৈরাজ্যিক এক চ্যালেঞ্জ, সেই প্রতিকূল পটভূমিতে দাঁড়িয়ে হাজীগঞ্জের বলাখাল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের এই কৃতী সন্তান চাঁদপুরে আধুনিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার এক সমৃদ্ধ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
|আরো খবর
বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদপ্রবাহের বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংবাদপত্রগুলোই প্রকৃত অর্থে জনজীবনের স্পন্দন ধারণ করে এসেছে। রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংকট, সম্ভাবনা, বঞ্চনা ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি সর্বাগ্রে উঠে এসেছে এসব আঞ্চলিক গণমাধ্যমের পাতায়। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সম্পাদকদের প্রায়শই মোকাবিলা করতে হয়েছে সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্য, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, বিজ্ঞাপন সংকট, প্রশাসনিক চাপ এবং নানামুখী প্রতিকূলতার। সেই কঠিন বাস্তবতায় যাঁরা নীতি ও সাহসের সঙ্গে আপস না করে সংবাদপত্রকে মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছেন, কাজী শাহাদাত তাঁদেরই অন্যতম।
একজন সম্পাদক কেবল সংবাদ নির্বাচন করেন না; তিনি সময়কে বিশ্লেষণ করেন, সমাজের বিবেককে জাগ্রত করেন এবং একটি অঞ্চলের বৌদ্ধিক পরিবেশ নির্মাণে নেতৃত্ব দেন। তাঁর কলমের দিকনির্দেশনা, সম্পাদনার দর্শন এবং নৈতিক অবস্থান একটি সংবাদপত্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। কাজী শাহাদাত সেই বিরল সম্পাদকদের একজন, যিনি সংবাদপত্রকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের প্রচারযন্ত্রে পরিণত না করে জনকল্যাণ, সত্যনিষ্ঠা এবং সামাজিক জবাবদিহিতার শক্তিশালী বাহনে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল না কেবল একটি পেশা; ছিল জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অবিচ্ছিন্ন অঙ্গীকার।
‘দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ’-এর প্রধান রূপকার হিসেবে দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজী শাহাদাত কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই নিজের কাজকে সীমিত রাখেননি, বরং তৈরি করেছেন গণমাধ্যম চর্চার এক সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক ঘরানা। চাঁদপুর জেলার বর্তমান তরুণ ও প্রবীণ কলমযোদ্ধাদের সিংহভাগের পেশাগত বুনিয়াদ ও নৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছে তাঁরই প্রাজ্ঞ সান্নিধ্যে। সংবাদপত্রকে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে তুলে এনে কীভাবে জনকল্যাণ, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারক করা যায়, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজের কর্ম দিয়ে সেই সুদৃঢ় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইতিপূর্বে চাঁদপুর প্রেসক্লাব, শাহরাস্তি প্রেসক্লাব এবং জাতীয় বিতর্ক উৎসব কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ স্মারকসমূহের পর এই সম্মাননাটি মূলত তাঁর প্রারব্ধ পথচলার চতুর্থ প্রাতিষ্ঠানিক আজীবন স্বীকৃতি, যা তাঁর বহুমাত্রিক অর্জনের ঝুলিকে কেবল সমৃদ্ধই করেনি, জেলাজুড়ে তাঁর সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তিকে করেছে আরও মহিমান্বিত।
একজন সম্পাদক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত একটি সংবাদপত্র প্রকাশ নয়; বরং সংবাদকর্মী তৈরি করা। চাঁদপুরের অসংখ্য সাংবাদিক, প্রতিবেদক, বার্তা সম্পাদক, কলাম লেখক ও আলোকচিত্রীর পেশাগত বিকাশে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তাঁর অবদান রয়েছে। সংবাদ কীভাবে যাচাই করতে হয়, কীভাবে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হয়, কীভাবে ভাষাকে সংযত অথচ প্রভাবশালী রাখতে হয় এবং কীভাবে পেশাগত সততার সঙ্গে আপস না করে সত্যকে তুলে ধরতে হয়—এসব বিষয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য শিক্ষক। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা বহু সাংবাদিক আজ দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সম্পাদক হিসেবে এটিই তাঁর দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার।
বর্তমান সময়ে যখন তথ্যের চেয়ে বিভ্রান্তি, বিশ্লেষণের চেয়ে প্রচারণা এবং বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে পক্ষপাতিত্ব অনেক ক্ষেত্রেই বেশি দৃশ্যমান, তখন কাজী শাহাদাতের মতো নীতিনিষ্ঠ সম্পাদকদের কর্মজীবন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য একটি মূল্যবান পাঠশালা। তিনি দেখিয়েছেন—সংবাদপত্রের শক্তি তার প্রচারসংখ্যায় নয়, মানুষের বিশ্বাসে; একজন সাংবাদিকের মর্যাদা তাঁর পরিচয়ে নয়, তাঁর সততা ও দায়িত্ববোধে।
তবে কাজী শাহাদাতের ব্যক্তিত্বের ব্যাপ্তি কেবল একটি সংবাদের বার্তা কক্ষ কিংবা কলামের অক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়নি। তিনি একাধারে মননশীল সাহিত্যিক, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, সামাজিক আন্দোলনের কাণ্ডারী এবং আন্তর্জাতিক রোটারি আন্দোলনের একজন দূরদর্শী সংগঠক। সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুরের দীর্ঘ সাড়ে নয় বছরের সফল মূল অভিভাবকত্ব, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের একাধিকবারের সফল সভাপতিত্ব, সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক)-এর চার মেয়াদের প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব এবং বিতর্ক আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অনবদ্য উপস্থিতি তাঁকে এক বিরল বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বে রূপান্তর করেছে। ব্র্যাক মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, জাতীয় সাহিত্য পরিষদ পদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমি পদক এবং নাসিরউদ্দীন পদকের মতো অজস্র জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বীকৃতি তাঁর সেই নিরবচ্ছিন্ন সমাজভাবনা ও সৃজনশীল উদ্যোগেরই এক একটি উজ্জ্বল দলিল।
মূলত একজন মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তাঁর অর্জিত সম্মাননার সংখ্যায় নয়, বরং তাঁর দ্বারা নির্মিত প্রতিষ্ঠান, সৃষ্ট মূল্যবোধ এবং গড়ে তোলা মানুষের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। কাজী শাহাদাতের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় সম্ভবত এখানেই। তিনি কেবল সংবাদপত্র পরিচালনা করেননি; তিনি মানুষ গড়েছেন, নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছেন এবং একটি জেলার বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলকে সুসংহত করতে নীরবে কাজ করে গেছেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে অসংখ্য তরুণ সংবাদকর্মী সাংবাদিকতার প্রতি ভালোবাসা, পেশাগত শৃঙ্খলা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার সাহস অর্জন করেছেন। একটি সমাজে এ ধরনের মানুষ খুব বেশি জন্ম নেন না; আর জন্ম নিলেও তাঁদের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে সমাজের অনেক সময় লেগে যায়।
সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং নাগরিক সমাজ—এই চারটি ক্ষেত্র পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন সংবাদপত্র সত্য উচ্চারণ করে, সাহিত্য মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, সংস্কৃতি সমাজকে মানবিক করে তোলে এবং নাগরিক আন্দোলন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। কাজী শাহাদাত তাঁর কর্মজীবনে এই চারটি ধারাকেই একই সূত্রে গেঁথে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। ফলে তিনি কেবল একজন সম্পাদক নন; তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তার নির্মাতা।
আজকের প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য তাঁর জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সাংবাদিকতা কখনো ক্ষমতার অনুগামী হতে পারে না; সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানুষের আস্থায়। প্রযুক্তি সংবাদ পরিবেশনের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মাণ করে তাঁর সততা, নৈতিকতা, অধ্যবসায় এবং সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। এই মূল্যবোধই কাজী শাহাদাতের দীর্ঘ কর্মজীবনকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
ব্যক্তিগতভাবেও এই সম্মাননা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। কারণ সাংবাদিকতার যে পথচলায় আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি, তার সূচনালগ্নে কাজী শাহাদাতের অকুণ্ঠ অনুপ্রেরণা, প্রাজ্ঞ দিকনির্দেশনা, স্নেহময় অভিভাবকত্ব এবং নিরন্তর সহযোগিতা ছিল এক অনিবার্য প্রেরণার উৎস। সংবাদকে কীভাবে তথ্যের সীমা অতিক্রম করে সমাজের কল্যাণে নিবেদিত করা যায়, কীভাবে পেশাগত সততাকে সকল প্রলোভনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হয় এবং কীভাবে একজন সাংবাদিককে আজীবন শিক্ষার্থী হয়ে থাকতে হয়—সেই জীবনবোধের মূল্যবান পাঠ তাঁর কাছ থেকেই অর্জনের সৌভাগ্য হয়েছে। সাংবাদিকতা, লেখালেখি, গবেষণা এবং জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডে আজ আমার যে সামান্য অবস্থান, তার পেছনেও তাঁর আন্তরিক উৎসাহ, আস্থা এবং সহযোগিতার ঋণ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই ঋণ কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একজন শিক্ষক ও তাঁর শিক্ষার্থীর মধ্যকার মূল্যবোধের উত্তরাধিকারের ঋণ।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কিছু মানুষ কেবল তাঁদের কর্মের মাধ্যমে নয়, তাঁদের ব্যক্তিত্বের দীপ্তিতেও স্মরণীয় হয়ে থাকেন। তাঁরা কোনো পদ-পদবি বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন না; বরং একটি অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। কাজী শাহাদাত নিশ্চিতভাবেই সেই বিরল ধারার অগ্রগণ্য প্রতিনিধি। তাঁর এই সর্বশেষ আজীবন সম্মাননা তাই কেবল একজন প্রবীণ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য সাংবাদিক, লেখক, সংবাদকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরও এক নীরব গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে এটি চাঁদপুরের গণমাধ্যম, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতি সমাজের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
ইতিহাসের প্রতিটি সময়েই কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের জীবনকর্ম সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনায় পরিণত হয়। তাঁদের অর্জন ব্যক্তিগত থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের অর্জন, একটি জেলার গৌরব এবং একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। কাজী শাহাদাত সেই বিরল ব্যক্তিত্বদেরই একজন। ভবিষ্যতের গবেষক যখন চাঁদপুরের সাংবাদিকতার ইতিহাস রচনা করবেন, তখন তাঁর নাম উচ্চারিত হবে কেবল একজন সম্পাদক হিসেবে নয়; বরং একটি মূল্যবোধ, একটি প্রতিষ্ঠান, এক অনন্য শিক্ষক এবং চার দশকেরও অধিক সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে চলা এক অবিস্মরণীয় আলোকবর্তিকা হিসেবে।
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।







