প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১৮:১২
এক টুকরো পোস্টকার্ড ও এক সমুদ্র নীরবতা: স্মৃতির মহাফেজখানায় 'বাবা!'

"বাসায় গিয়ে তোমাকে না পেয়ে খুব মন খারাপ হলো। তাই আমি আমার রেস্ট হাউসে এসে তোমাকে লিখতে বসলাম..."
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমের জানালার বাইরে তখন হয়তো গোধূলির আলো নেমে আসছিলো। চার দেয়ালের নিস্তব্ধতার মাঝে বসে যখন এক তরুণ একটি সাধারণ পোস্টকার্ডের ওপর চোখ বোলাচ্ছিলেন, তখন তার দু চোখ বেয়ে নামছিলো অনুশোচনা আর এক অদ্ভুত পরম প্রাপ্তির অশ্রুধারা। যে মানুষকে সারাজীবন কেবল 'কঠোর', 'অনুভূতিহীন' আর 'দূরত্ব বজায় রাখা' এক ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব হিসেবেই চিনে এসেছেন, সেই মানুষের বুকের গভীরতম গহীনে নিজের জন্যে কতোটা হাহাকার আর আর্তি লুকিয়ে ছিলো—তা বুঝতে কেটে গেলো জীবনের সোনালী বসন্ত।
|আরো খবর
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো একটি যান্ত্রিক তারিখ মাত্র, কিন্তু স্মৃতির মহাফেজখানায় এ যেন এক কালজয়ী অবগাহন; যা সময়ের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৬৮ সালের এক চেনা রেল স্টেশন আর সরকারি কোয়ার্টারের সবুজ আঙ্গিনায়।
স্মৃতির টাইমমেশিন ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন :
১৯৬৮ ───► রাজাপুর স্টেশন ও সংকুচাইল প্রাথমিক বিদ্যালয় (বাবাকে চেনার প্রহর)
১৯৮৪ ───► রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি অমূল্য পোস্টকার্ড (ভুল ভাঙ্গার প্রহর)
‘আব্বু’ থেকে ‘বাবা’ হয়ে ওঠার প্রথম প্রহর : ১৯৬৮ সালের সেই স্টেশন
সময়টা ১৯৬৮ সাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লার রাজাপুর স্টেশনের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সংকুচাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রথম শ্রেণীর এক অবোধ শিশুকে শিক্ষক হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার বাবার নাম কী?" শিশুটি তার সরল ও চপল মনে তাৎক্ষণিক উত্তর দিলো, "আমার তো বাবা নেই!" শিক্ষক কিছুটা বিস্মিত ও চিন্তিত হয়ে জানতে চাইলেন, "তবে তোমার বাড়িতে কে কে আছে?" শিশুটির দ্বিধাহীন জবাব—"আমার আব্বু আছে, আম্মু আছে, আর আছে আমার মামা ও ফুফি।"
শিক্ষক সেদিন শিশুর এই নিষ্পাপ অজ্ঞতা দেখে পরম মমতায় হেসেই চিনেছিলেন জীবনের শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি। তিনি বুঝিয়ে বলেছিলেন, "তোমার আব্বুই তো তোমার বাবা।" সেই প্রথম 'আব্বু' নামক প্রতিদিনের চেনা স্বরে সম্বোধনটির সমান্তরালে 'বাবা' শব্দটার চিরন্তন ভার, গাম্ভীর্য ও অস্তিত্ব চিনেছিলো এক শিশু।
শৈশবের সেই চঞ্চলতায় একদিন কোনো এক অজানা কারণে বাবার তাড়া খাওয়া। রাগে ফুঁসতে থাকা বাবার হাত থেকে বাঁচতে রেল লাইনের ওপর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ানো, আর এক পর্যায়ে দূরত্বের ব্যবধানে না পেরে রেলের ধারালো পাথর ছুঁড়ে বাবার দিকেই নিক্ষেপ করা—আজ জীবনের এই অপরাহ্নে এসে ভাবলে ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ফোটে, চোখের কোণটা ভিজে ওঠে। কিন্তু ওটাই ছিলো এক শাশ্বত ও আদিম বাপ-ছেলের খুনসুটির এক টুকরো রণক্ষেত্র, যেখানে পিতা হয়েও সন্তানের পাথরের আঘাতের সামনে স্বেচ্ছায় পরাজয় মেনে নিয়ে, রণভঙ্গ দিয়ে স্টেশনে ফিরে গিয়েছিলেন এক পরমসহিষ্ণু বাবা।
ভাঙ্গা কাঠের স্কেলের কান্না ও মধ্যবিত্তের অরণ্যদেব
চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় পড়া না পারার অপরাধে বাবার হাতের কাঠের স্কেল দিয়ে মার খাওয়ার স্মৃতি আজও মনের মণিকোঠায় অমলিন। মেহের স্টেশনের রেলের বাসায় ঘটে যাওয়া সেই মারের চোটে আঘাতের তীব্রতায় স্কেলটি সেদিন ভেঙ্গে দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি শৈশবের আশ্চর্য এক মনস্তত্ত্ব! মার খাওয়ার জন্যে কোনো শারীরিক কষ্ট বা বেদনা সেদিন সেই শিশুর মনে দাগ কাটেনি; সমস্ত কান্না ও কষ্ট ছিলো সেই সাধের কাঠের স্কেলটি ভেঙ্গে যাওয়ার জন্যে। তৎকালীন আমলে অমন একটি মসৃণ, নিখুঁত কাঠের স্কেল নিজের জিম্মায় থাকা ছিলো যে কোনো ছাত্রের কাছে এক পরম স্বপ্নের মতো, এক রাজকীয় অহংকার।
তবে সেই যে শৈশবের স্বপ্নের সাথে সাথে স্কেলটি ভাঙ্গলো, তারপর জীবনে আর কোনোদিন বাবার হাতের মার খেতে হয়নি তাকে। যেন সেই একটি ভাঙ্গা স্কেলই বাবার ভেতরের চিরন্তন शासनকর্তাকে আজীবনের জন্যে শান্ত করে দিয়েছিলো।
অবশ্য বাবার রাগ ছিলো ঠিক যেন কালবৈশাখীর মতো—আকস্মিক, প্রলয়ঙ্করী ও সংহারক। যদি কোনো কারণে মেজাজ চড়ে যেতো, তবে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতের কাছে যা পেতো—লাঠি হোক কিংবা লোহা—তা দিয়েই শাসন করতে উদ্ধত হতেন। আর ঠিক এই জায়গাতেই আসতো মধ্যবিত্ত বাঙালি সংসারের চিরন্তন, চিরায়ত ও চতুর রসায়ন। বাবা ক্ষিপ্ত হলেই মা ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। তিনি বুদ্ধি করে চট করে জ্যেষ্ঠ পুত্রকে নির্দেশ দিতেন শাসনভার নিজের হাতে নেওয়ার জন্যে। বড়োভাই বাবার রাগ থেকে ছোট ভাইকে বাঁচাতে কৃত্রিম শাসন শুরু করলেই বাবার ভেতরের সেই কালবৈশাখী ঝড় অলৌকিকভাবে শান্ত হয়ে যেতো। মুহূর্তেই রুক্ষ পিতা রূপান্তরিত হতেন এক শান্ত মানুষে。
দেশ, রাজনীতি এবং এক সবুজ উদ্যানের রূপকার
বয়সের সীমানা পেরিয়ে যখন কলেজের বারান্দায় পা রাখা, তখন বাবার রুক্ষ খোলসটি ভেঙ্গে যেনো এক পরম জ্ঞানী ও বন্ধুর আবির্ভাব ঘটলো। রেলওয়ের চাকরিজীবী সেই মানুষটি অবসরের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করতেন এক নিখাদ প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে। চাঁদপুরের বার্ড এন্ড কোং বাংলোর পাশে প্রচুর খালি জায়গা ছিলো, সেখানে তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন এক স্বপ্নের ফলদ, ওষুধি ও ভেষজ উদ্যান। আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, ডালিম, স্বরূপা, জাম্বুরা, আতাফল আর পেয়ারা—কী ছিলো না সেই অরণ্যে!
কলেজে পড়ার দিনগুলোতে এই বাগানের সবুজ ছায়ায় বসেই বাবার সাথে চলতো দেশ ও রাজনীতি নিয়ে গভীর আলাপন। "জাতি হিসেবে কেন আমরা ২০০ বছর পিছিয়ে আছি?", "মুসলমানদের ইংরেজিতে পারদর্শী না হওয়ার ঐতিহাসিক কারণ কী ছিল?"—এমন সব মননশীল প্রশ্ন আর মানবিকতা ও আদর্শের গল্পে কেটে যেতো বিকেল।
অথচ সেই আদর্শবাদী মানুষটি বাগানের এই অতি-যত্ন আর নতুন চারা লাগানোর হুজুগ নিয়ে মায়ের সাথে মৃদু ও মধুর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েও জড়াতেন। শাকসবজি লাগানোর জায়গা করতে গিয়ে ফুলের গাছ কাটা নিয়ে মায়ের অভিমানী ঝগড়া হতো। মা রেগে একদিন বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিলে বড়ো ছেলে যখন বাবার নীরবতা ভাঙ্গতে দুষ্টুমি করে সায় দিলো—"মা তুমি নানার বাড়ি চলে যাও, দেখি বাবা কয়দিন থাকতে পারে"—তখন সবাই জানতো, এ বন্ধন বজ্র আঁটুনি। মা-ও যেতে পারবেন না, আর বাবাও মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত টিকতে পারবেন না। সংসারের মঙ্গলের জন্যে হওয়া সেই তর্ক-বিতর্কে বাবা বরাবরই চুপ থেকে এক অদ্ভুত পৌরুষদীপ্ত ভালোবাসার জানান দিতেন।
অভিমানের দেয়াল ভাঙ্গা সেই ঐতিহাসিক পোস্টকার্ড
১৯৮৪ সাল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন সেই তরুণ। ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। চাঁদপুর থেকে রাজশাহী ফেরার জন্যে বাবা পরম যত্নে রেলভ্রমণের যাতায়াতের একটি প্রথম শ্রেণীর পাসও জোগাড় করে রেখেছেন। বিকেল ৪টায় ট্রেন, অথচ ৩টার সময় বিটিভিতে চলছে ভারতীয় ক্ল্যাসিক সিনেমা 'পথে হলো দেরী'। সিনেমার রূপালী পর্দায় মগ্ন, সময়ের খেয়ালহীন ছেলেকে দেখে বাবা সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে কিছুটা কড়া ভাষায় তিরস্কার করলেন।
ব্যস, তারুণ্যের অহম আর অভিমানে বুকটা ভারী হয়ে উঠলো তরুণের। এক বুক জেদ আর রাগ নিয়ে না খেয়েই রওনা হলেন রাজশাহীর উদ্দেশ্যে। ট্রেনের চাকার আওয়াজের সাথে সাথে মনের গহীনে একটা বদ্ধমূল ও ভুল ধারণা জন্মে গিয়েছিলো—"বাবা বোধহয় আমাকে একেবারেই ভালোবাসেন না, আমি বোধহয় তাঁর কেউ নই।"
实用িত এই ভুল ভাঙ্গার জন্যে যে নিয়তি এক অলিখিত এবং পরম আবেগঘন চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলো, তা কে জানতো! বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের চূড়ান্ত (ফাইনাল) পরীক্ষার কারণে পরবর্তী ঈদের ছুটিতে সেই তরুণের আর বাড়ি ফেরা হলো না। বাড়ি ফিরতে না পারার অপারগতার কথা চিঠিতে মাকে আগেই জানানো হয়েছিলো। মা-ও যথাসময়ে বাবাকে বলেছিলেন। কিন্তু অবচেতন মনে বাবা হয়তো সেটা ভুলে গিয়েছিলেন, কিংবা একজন বাবা হিসেবে কোনোভাবেই মেনে নিতে বা ভাবতেই পারেননি—পবিত্র ঈদের দিনেও তাঁর প্রিয় সন্তানটি বাসায় থাকবে না।
ঈদের দিন সকালে পরম আবেগে যখন বাবা বাসায় এলেন, তখন চারপাশের উৎসবের আলোর মাঝে হঠাৎ আবিষ্কার করলেন—তাঁর বড়ো ছেলের ঘরটি শূন্য, সন্তান বাসায় নেই। মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র অভিমান, সীমাহীন শূন্যতা আর একাকীত্ব ভর করলো সেই শক্ত মনের মানুষটির ওপর। বুকটা হয়তো অপত্য স্নেহে খাঁ খাঁ করে উঠেছিলো। সেই অভিমানে ঘরে আর এক ফোঁটা অন্নও গ্রহণ করলেন না তিনি। কাউকে কিচ্ছুটি না বলে, কোনো কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যার অপেক্ষা না রেখে, সোজা ফিরে গেলেন নিজের কর্মস্থলের দূরবর্তী রেস্ট হাউসে। আর সেখান থেকেই অবরুদ্ধ আবেগের সমস্ত বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে কলম ধরলেন একটি সাধারণ পোস্টকার্ডে।
বাড়িতে আরও চার-চারটি সন্তান, স্ত্রী ও আপনজন থাকা সত্ত্বেও, কেবল একটি সন্তানের অনুপস্থিতি কীভাবে একজন বাবার পুরো অস্তিত্বকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে নিঃসঙ্গ রেস্ট হাউসের কোণে ঠেলে দিতে পারে, তা সেদিন রাজশাহীর হলের রুমে বসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে উপলব্ধি করেছিলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ। বুঝতে পেরেছিলেন, বাবার ওই তিরস্কার কোনো দূরত্ব ছিলো না; ওটা ছিলো সন্তানকে নিজের চোখের সামনে আগলে রাখার এক ব্যাকুল পিতৃ-অধিকার।
উপাখ্যান : বাবারা এমনই হয়
সেই চিঠিটাই ছিলো বাবার জীবনের প্রথম এবং শেষ চিঠি। এরপর নিয়তি আর কোনোদিন বাবার কলম থেকে কোনো শব্দ উপহার দেয়নি সন্তানের নামে। কিন্তু ওই একটি সাধারণ পোস্টকার্ডই ছিলো বাবার হৃদয়ের অলিখিত এক মহাকাব্য, তাঁর ভালোবাসার সবচেয়ে বড়ো দলিল।
পৃথিবীর সব বাবারা মুখে ভালোবাসার কথা বলতে পারেন না। তারা বুক ফাটলেও মুখ ফোটেন না। তারা শাসন করেন, কখনও কখনও রাগে ফেটে পড়েন, হয়তো বা তিরস্কারের চাদরে নিজেদের মমতাকে আড়াল করে রাখেন। কিন্তু সন্তানের প্রতি তাদের অন্তহীন টান যে কতোটা গভীর, তা তারা কেবল নিজেদের নিঃসঙ্গতার মুহূর্তেই প্রকাশ করেন।
আজ বাবা দিবসে রাজাপুর স্টেশনের সেই পাথর নিক্ষেপ, মেহের স্টেশনের রেলের বাসায় সেই ভাঙ্গা কাঠের স্কেলের স্মৃতি, চাঁদপুরের বার্ড এন্ড কোং বাংলোর সেই সুমিষ্ট আতাফলের সুবাস আর রাজশাহীর হলের রুমে বসে পড়া সেই পোস্টকার্ডের কালজয়ী লাইনগুলো মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর সব বাবার ভালোবাসার ভাষা এক। তারা মুখে কিছু না বলেও এক সমুদ্র ভালোবাসা বুকে নিয়ে, সন্তানের মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে বেঁচে থাকেন।
শুভ বাবা দিবস, পৃথিবীর সকল নীরব, শাশ্বত ও নিঃশব্দে ভালোবাসা বিলিয়ে যাওয়া বাতিঘরদের!
প্রতিবেদক:অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
সিনিয়র সাব-এডিটর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ও কলামিস্ট
ডিসিকে /এমজেডএইচ







