সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫২

প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই ‘এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল’

হাসান আলী
প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই ‘এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল’

বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দু কোটি মানুষ প্রবীণ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ। আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। সাধারণত আমরা প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা করি তাঁদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদার বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়—প্রবীণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা।

আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ চাকরি বা পেশাগত জীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েন। অথচ তাঁদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ, কর্মক্ষম এবং কাজ করার আগ্রহ রাখেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, আইনজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ কিংবা দক্ষ কারিগর তাঁর কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে ঘরে বসে থাকেন। এই অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার না হওয়া ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার জন্যেই এক ধরনের ক্ষতি।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় দেশে ‘এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সার্ভার গড়ে তোলা যেতে পারে। এটি সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আগ্রহী প্রবীণরা সেখানে নিজেদের তথ্য নিবন্ধন করবেন। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, বিশেষ দক্ষতা, কাজের ধরণ, সময়ের প্রাপ্যতা এবং প্রত্যাশিত পারিশ্রমিক উল্লেখ থাকবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রয়োজন অনুযায়ী সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে দক্ষ মানুষ খুঁজে নিতে পারবে।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হবে দক্ষ জনশক্তির অপচয় রোধ করা। উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত কারণে কয়েক দিনের জন্যে ছুটিতে গেলেন। প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্রুত একজন বিকল্প শিক্ষক প্রয়োজন হলো। ‘এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল’ থেকে আশেপাশে বসবাসকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষককে অল্প সময়ের জন্যে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হবে না এবং প্রবীণ শিক্ষকও তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন।

একইভাবে একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময়ে পরামর্শ সেবা দিতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী আইনি পরামর্শ দিতে পারেন। কর বিশেষজ্ঞ কর-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিতে পারেন। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার বা কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনভিত্তিক সেবা প্রদান করতে পারেন। এমনকি প্রবীণ কেয়ারগিভার বা কাউন্সেলরও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বর্তমান সময়ে আমরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ডাকি, খাবার অর্ডার করি কিংবা বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করি। একইভাবে ‘এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল’ একটি অনলাইন সেবামাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষতার মানুষ খুঁজবে, আর প্ল্যাটফর্মটি কাছাকাছি অবস্থানরত উপযুক্ত প্রবীণ বিশেষজ্ঞের তথ্য দেখাবে। অনেকটা উবারে গাড়ি ডাকার মতোই সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা।

এই উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্বও অনেক। কর্মক্ষম প্রবীণদের একটি বড়ো অংশ অবসর জীবনে একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার অনুভূতিতে ভোগেন। তাঁরা যখন তাঁদের অভিজ্ঞতা সমাজের কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন, তখন আত্মমর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে বাস্তব জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি লাভজনক হতে পারে। দেশের বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ প্রবীণ মানুষ আবার আংশিকভাবে কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলে তাঁদের ব্যক্তিগত আয় বাড়বে, পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণেও এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আজকের বাংলাদেশে যখন দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তখন প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে অবহেলা করা নয়, বরং যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং প্রবীণ সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করলে ‘এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল’ বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

প্রবীণ মানুষ সমাজের বোঝা নন, তাঁরা অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডারকে কাজে লাগাতে পারলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাই উপকৃত হবে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অপচয় নয়, বরং তার সর্বোত্তম ব্যবহারই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়