প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১১
সংসদে যখন পিনপতন নীরবতা
দাদা মিজানুর রহমান চৌধুরীকে যেভাবে মনে রাখি

১৯৯১ সাল। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত, সব দলের সংসদ সদস্যরা একজোট হয়ে চিৎকার করছেন। লক্ষ্য একজন মানুষ, যিনি দাঁড়িয়ে আছেন শান্ত মুখে, বক্তৃতা দিতে। “স্বৈরাচার। স্বৈরাচার।” তিনি অপেক্ষা করলেন। তারপর স্বাভাবিক গলায় বললেন : “মাননীয় স্পিকার, আজকের এই দিনে শ্রদ্ধা জানাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের আরেক নায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি।” হৈচৈ কমতে শুরু করলো। তিনি চালিয়ে গেলেন। “শ্রদ্ধা জানাই সংসদ-নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি।”
|আরো খবর
পিনপতন নীরবতা। তারপর তিনি বললেন তাঁর আসল কথা — এরশাদকে সংসদে আসতে দেওয়া উচিত, কারণ গণতন্ত্র মানে কেবল নিজের পক্ষের কণ্ঠস্বর নয়। এই মানুষটি আমার দাদা মিজানুর রহমান চৌধুরী। যাঁকে মানুষ ভালোবেসে ডাকতেন মিজান চৌধুরী নামে।
ইতিহাসের সংগঠক
এই মানুষটি রাজনীতিতে এসেছিলেন ষাটের দশকে। ১৯৬৫ সালে চাঁদপুরের ৬টি আসন থেকে তিনি বিপুল ভোটে পাকিস্তানের এমএনএ (Member of National Assembly) নির্বাচিত হন। তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ। সেই দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মিজান চৌধুরী। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। ৭ জুনের হরতালের প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি। সেই হরতাল আজ ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী জায়গা নিয়েছে। সেই সময় গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমেদ। একই বছর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে মুক্তি পান তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মালেক উকিলসহ অন্যদের নিয়ে আগরতলায় পৌঁছান ৩১ মার্চ। সেখান থেকে ভারতজুড়ে ঘুরেছেন — আগরতলা, শিলং, কলকাতায়, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামের সঙ্গে দেখা করে প্রশিক্ষণার্থী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ানোর আবেদন করেছেন। স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দিল্লিতে বিশ্ব খ্রিস্টান সম্মেলনে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। এই সময় পাকিস্তানি বাহিনী চাঁদপুরে তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। যিনি দেশের জন্যে লড়ছেন, তাঁর নিজের ঘর তখন ছাই। স্বাধীনতার পর তিনি হলেন বাংলাদেশের প্রথম তথ্যমন্ত্রী।
১৫ আগস্টের পর যে সাহস ইতিহাস ভুলে গেছে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশ এক ভয়ার্ত অন্ধকারে ডুবে যায়। আওয়ামী লীগ তখন নেতৃত্বশূন্য, দিশাহারা। দলের অনেক নেতা আত্মগোপনে, অনেকে নীরব।
এই সংকটকালে মিজান চৌধুরী থামেননি। তাঁর নিজের বাড়িকে তিনি পরিণত করলেন আওয়ামী লীগের আশ্রয়ের কেন্দ্র হিসেবে। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তাঁর বাড়ির ছাদেই সভা বসলো, সেখানে মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হলো আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি। বঙ্গবন্ধুর দলকে বাঁচানোর সেই উদ্যোগে তাঁর ভূমিকা ছিলো কেন্দ্রীয়।
এখানেই শেষ নয়। ১৯৭৬ সালের ২৫ আগস্ট দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্যদের সভায় মিজান চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হলো দলটিকে পুনরায় নিবন্ধিত করার। তাঁর নেতৃত্বে সেই বছরের ৪ নভেম্বর দলটি নতুনভাবে নিবন্ধিত হলো। নাম দিলেন 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ'। আজ আমরা যে নামে দলটিকে চিনি, সেই নামটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব মিজান চৌধুরীর।
বাকশালের বিরুদ্ধে একাকী
কিন্তু এর আগেই তিনি আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে মন্ত্রিসভার সদস্যরা একে একে হাত তুলছেন। চারপাশে দলের সিনিয়র নেতারা। সভাপতিত্বে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। সেই কক্ষে মিজানুর রহমান চৌধুরী হাত তোলেননি। এই না বলার মূল্য দিতে হয়েছিলো পদচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা দিয়ে। কিন্তু তিনি কখনো পিছু হাঁটেননি।
পরবর্তীতে যখন আব্দুল মালেক উকিল আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন এবং দলের ভেতরে বাকশালপন্থীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠলো, তখন ১৯৭৮ সালের আগস্টে মিজান চৌধুরী আলাদা কমিটি ঘোষণা করলেন। তিনি স্পষ্ট জানালেন—যারা একদলীয় ব্যবস্থার সমর্থক, তাদের সঙ্গে এক মঞ্চে থাকা সম্ভব নয়। বাকশালের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান একটি মুহূর্তের আবেগ ছিলো না, এটি ছিলো তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি।
এরশাদের সরকারে— এবং যে কারণে বাদ পড়লেন
এরশাদের সামরিক শাসনামলে মিজান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী হলেন। এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। অনেকে প্রশ্ন করেন, যিনি বাকশালের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি কীভাবে সামরিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁকে বরখাস্ত করার কারণটির মধ্যে। এরশাদের সামরিক শাসনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ছিলো আওয়ামী লীগকে যেন নিষ্ক্রিয় করা না হয়।
১৯৮৭ সালে এরশাদ সংসদ ভেঙ্গে দিলেন এবং মিজান চৌধুরীকে সরিয়ে দিলেন। কারণ? গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রপতিকে রিপোর্ট দিয়েছে— প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে সংসদীয় ক্যু হতে পারে। তিনি বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখছেন। অর্থাৎ ক্ষমতার চেয়ারে বসে থেকেও তিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে কাজ করছিলেন। ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণের সেই কৌশল শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ডেকে এনেছিলো। উনার এবং আনওয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেবের উদ্দেশ্য ছিলো ভেতর থেকে এরশাদকে সামাল দেওয়া এবং দেশকে গণতন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে আনা। এটিই প্রমাণ করে, ক্ষমতা তাঁকে কিনতে পারেনি।
আমার দাদা চাদপুরের মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গিয়েছেন। চাঁদপুরের মানুষের জন্য ইলেকট্রিসিটি, গ্যাস, টেলিফোন এবং ১৯৯৬ সালের পর শেখ হাসিনাকে দিয়ে নতুন বাজার থেকে পুরাণ বাজারের ব্রিজ বানানো তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে নিয়ে বানানো হয়েছে । চাঁদপুর জেলার লোকদের জীবন নির্বাহের জন্যে প্রধান ভূমিকা পালন করে গেছেন । তিনি তৎকালীন সময়ে শুধু চাঁদপুর নয়, সমস্ত কুমিল্লার ৬টা আসনেরই তিনি এমপি ছিলেন এবং প্রতিটি মানুষকে তিনি নিজের মতো আপন করেই কার কী প্রয়োজন সব কিছুই খেয়াল করতেন এবং আমাদের বাড়িতে শুধু চাঁদপুর নয় সমস্ত বাংলাদেশের অসুস্থ মানুষ যারাই আসতেন তাদের ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ কিনে দিয়ে তাদের যাতায়াত ভাগা পর্যন্ত দিয়ে দিতেন। এমনকি আমাদের ঢাকার বাড়িতে যক্ষ্মা রোগীকেও রেখে চিকিৎসা করানো হতো, যাদের ঢাকায় থাকার জায়গা ছিলো না। তাদেরকে আমাদের বাসায় জায়গা দেওয়া হতো থাকার জন্যে। আমার দাদার বাসা থেকে কেউ কখনও খালি মুখে ফিরে যায়নি । আমার প্রিয় চাঁদপুরবাসীর সকল বাসিন্দার কাছে আমার দাদার জন্যে দোয়া প্রার্থনা করছি ।
ঝড়ের মধ্যে নেতৃত্ব
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এরশাদ কারাগারে। জাতীয় পার্টি তখন অস্তিত্বের সংকটে। সেই মুহূর্তে মিজান চৌধুরী দলের হাল ধরলেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি দল চালাতেন। এরশাদ পতনের দু দিনের মাথায় আমাদের ঢাকার বাসা হয়ে উঠেছিলো জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় অফিস হিসেবে। সাংবাদিক নাঈম নিজাম লিখেছেন তাঁর স্মৃতিতে : তাঁর বাড়িতে তখন ছাত্র-জনতার হামলা হচ্ছে। তবু নেতাকর্মীরা ভিড় করতেন। তিনি বেডরুমে খাটে বসতেন, চারপাশে কর্মী এবং সাংবাদিকরা।এই দৃশ্যটি আমি নিজে দেখিনি। কিন্তু পরিবারের কাছে এবং কিছু নেতাকর্মীর মুখে শুনেছি। এবং যখন শুনেছি, বুঝেছি, উনার থেকে শিক্ষা নিয়েছি যে, রাজনীতি মানে শুধু বক্তৃতা নয়, ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার নামও রাজনীতি।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পায়। নিজে উপনির্বাচনে রংপুর-৫ আসনে জিতে সংসদে ফিরলেন।
কৌশল ও নীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখার কোনো শিল্প বই পড়ে শেখা যায় না, শেখা যায় এরকম মানুষদের জীবন পড়ে।
যে সংসদে তাঁকে 'স্বৈরাচার' বলে চিৎকার করা হচ্ছিল, সেখানে তিনি মুজিব ও জিয়া, দুজনকেই শ্রদ্ধা জানালেন। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা, দুজনকেই সম্মান দিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই কাজটির সাহস তখনও বিরল ছিলো, আজও বিরল।
একজন নাতির কথা
আমি ফায়াজ মিজান চৌধুরী। আইনের ছাত্র। ভবিষ্যতে ব্যারিস্টার ও দাদার মতন মন মানসিকতা নিয়ে চাঁদপুরের মানুষের সেবা করার স্বপ্ন আছে। আমার নামের মধ্যে তাঁর নামের একটি অংশ বহন করি। তিনি আমার বেড়ে ওঠার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। আমার জীবনের প্রথম সাত বছর ছিলো তাঁর জীবনের শেষ সাত বছর। সেই সময়গুলোতে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর সঙ্গে বিপুল সময় কাটানোই আমাকে তাঁর আদর্শ ধারণ করতে সাহায্য করেছে। আমি ছিলাম একজন
দাদা-পাগল। স্কুলে যাওয়ার আগে সবসময় দাদার সাথে দেখা করে যেতাম। দেখতাম উনি ফজর নামাজের পরেই কোরান শরিফ পড়ছেন এবং তেলাওয়াত শুনছেন। আদর করে আমাকে দোয়া দিতেন। একদিনও দাদার সাথে দেখা করা ছাড়া সেই সময় স্কুলে যাই নি। এবং আমি স্কুল থেকে আসার আগেই আমার যা যা প্রয়োজন সবকিছু রেডি করে রাখতেন। আমি খুব ভাগ্যবান, আমার ছোটবেলা উনার সাথে কাটাতে পেরেছি। পরিবারের গল্পে, পুরনো কাগজের হলুদ পাতায়, এবং যাঁরা তাঁকে চিনতেন তাঁদের স্মৃতিতে আমি তাঁকে খুঁজি। কিন্তু যতোটুকু পেয়েছি, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা।
আজকের রাজনীতি প্রায়ই উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু নীতিতে নীরব। তিনি ছিলেন তার উল্টো — কণ্ঠে শান্ত, নীতিতে অটল। বঙ্গবন্ধুর সামনে না বলেছেন ঘৃণায় নয়, নীতিতে। এরশাদের ভেতরে থেকেও বিরোধিতা করেছেন এবং সংসদে শত্রুর ভিড়ে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সত্য বলেছেন।
এই লেখাটি কোনো মূর্তি নির্মাণের চেষ্টা নয়। তাঁর জীবনে বিতর্ক ছিলো, প্রশ্ন ছিলো —সেগুলো থেকে মুখ ফেরানো স্মরণ নয়, সেটা মিথ্যাচার। কিন্তু বিতর্কের ভেতরেও যে সততার সুতো ছিলো—সেটুকু তুলে ধরাই এই লেখার উদ্দেশ্য। কারণ, এই দেশে এমন রাজনীতিবিদের গল্প বলা দরকার, যিনি প্রমাণ করেছেন, না বলার সাহসও একটি রাজনৈতিক দর্শন হতে পারে।
লেখক : ফায়াজ মিজান চৌধুরী, আইনের শিক্ষার্থী এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীর নাতি।





