সোমবার, ০৯ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১০:১২

নিগৃহীত নারী, অনিরাপদ বার্ধক্য

হাসান আলী
নিগৃহীত নারী, অনিরাপদ বার্ধক্য

একজন মানুষের বার্ধক্য তার সমগ্র জীবনের প্রতিফলন। যে মানুষ তার কর্মজীবনে সম্মান, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা পান, তার বার্ধক্য সাধারণত মর্যাদাপূর্ণ ও শান্ত হয়। আর যে মানুষ সারাজীবন অবহেলা, নির্যাতন ও অসম্মানের মধ্যে জীবন কাটান, তার বার্ধক্য হয়ে উঠে অনিশ্চয়তা ও বেদনায় পূর্ণ। আমাদের সমাজে বহু নারী আছেন, যারা জীবনের বড়ো একটি সময় নিগ্রহ ও বৈষম্যের শিকার হন। এই নিগৃহীত নারীরাই একদিন প্রবীণ হন, আর তখন তাদের বার্ধক্য হয়ে উঠে সবচেয়ে অনিরাপদ।

নারীর জীবনে নিগ্রহের শুরু অনেক সময় শৈশব থেকেই। পরিবারে ছেলে সন্তানের তুলনায় কম গুরুত্ব পাওয়া, শিক্ষা ও মতামতের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন, অল্প বয়সে বিয়ে—এসব অভিজ্ঞতা তার আত্মমর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এরপর দাম্পত্য জীবনে অনেক নারী শারীরিক, মানসিক কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন। তারা সংসার টিকিয়ে রাখার জন্যে, সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, কিংবা সামাজিক লজ্জার ভয়ে সবকিছু নীরবে সহ্য করেন।

এই দীর্ঘ সহ্য করার জীবনের একটি গভীর প্রভাব পড়ে নারীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর। তারা নিজেদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে শেখেন না, নিজের অধিকারের দাবি করতে সংকোচ বোধ করেন। ফলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তারা আরও দুর্বল ও নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যখন তারা প্রবীণ হন, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানসিক শক্তি বা সামাজিক অবস্থান অনেক সময় থাকে না।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, যে নারী সারাজীবন পরিবারকে সেবা দিয়েছেন, সন্তানদের বড়ো করেছেন, স্বামীর পাশে থেকেছেন, সেই নারীই অনেক সময় বার্ধক্যে এসে অবহেলার শিকার হন। তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তার প্রয়োজনকে বুঝা হয় না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাকে বোঝা হিসেবে দেখা হয়। এই অবহেলা একজন প্রবীণ নারীর জন্যে শুধু কষ্টদায়কই নয়, এটি তার অস্তিত্বের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

নিগৃহীত নারীর বার্ধক্য অনিরাপদ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। অনেক নারী সারা জীবন সংসারের কাজ করলেও, তাদের নামে কোনো সম্পদ থাকে না, কোনো সঞ্চয় থাকে না। ফলে স্বামী বা সন্তানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যদি সেই পরিবার থেকে তারা যথাযথ সহায়তা না পান, তাহলে তাদের জীবন হয়ে উঠে অত্যন্ত অনিশ্চিত।

এছাড়া, মানসিক নিগ্রহের প্রভাবও বার্ধক্যে গভীরভাবে অনুভূত হয়। যারা সারাজীবন অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন, তারা বার্ধক্যে এসে এক ধরনের একাকীত্ব ও হতাশায় ভোগেন। তারা মনে করেন, তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। এই অনুভূতি তাদের জীবনের শেষ সময়কে আরও কষ্টকর করে তোলে।

এই বাস্তবতা শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা। কারণ আজকের নিগৃহীত নারীই আগামী দিনের প্রবীণ। যদি আমরা আজ নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সমাজে একটি বড়ো অনিরাপদ প্রবীণ জনগোষ্ঠী তৈরি হবে।

তাই নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য বন্ধ করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন। নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারে তাদের মতামতকে মূল্য দিতে হবে, তাদের অধিকারকে সম্মান করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, নিগৃহীত নারী মানেই অনিরাপদ বার্ধক্য। আর নিরাপদ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হলে নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাকে নিরাপত্তা, সম্মান ও ভালোবাসা দিতে হবে। কারণ একজন নারীর মর্যাদা রক্ষা করা মানে একটি মানবিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়