রবিবার, ০২ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:০৩

৩০ জানুয়ারি জাতীয় কৃষক দিবস

কৃষককে মাঠে দরকার, বার্ধক্যে নয়?

হাসান আলী
কৃষককে মাঠে দরকার, বার্ধক্যে নয়?

আমরা ভাত খাই, তৃপ্তি পাই, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গর্ব করি। কিন্তু যে মানুষটির ঘামে এই ভাত, সেই কৃষককে আমরা কতটা মনে রাখি? আরও কঠিন প্রশ্ন হলো—কৃষক যতদিন মাঠে কাজ করতে পারেন, ততদিনই কি তার মূল্য? বয়স বাড়লেই কি তার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়?

দেশে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ‘জাতীয় কৃষক দিবস’ পালিত হয়েছিল—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা। আশা করি প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দিবসটি পালিত হবে। কিন্তু এই দিবস যদি শুধু ছবি তোলা, ব্যানার ঝোলানো আর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা হবে আরেকটি লোকদেখানো আয়োজন। কারণ বাস্তবতা হলো, আমাদের কৃষিব্যবস্থা কৃষককে ব্যবহার করে, কিন্তু কৃষকের বার্ধক্যের দায় নেয় না।

আজ যে কৃষক সারাদিন রোদে পুড়ে মাঠে থাকেন, তিনি একদিন প্রবীণ হবেনই। তখন তার শরীর আর মাঠ সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তখন রাষ্ট্র তাকে কোথায় রাখবে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর একটাই : উপেক্ষার তালিকায়।

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে কৃষকের জীবনকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ জীবন হিসেবে দেখা হয় না। তাকে শুধু উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়। যতদিন তিনি ফসল দেন, ততদিন তার গুরুত্ব। আর যখন তিনি আর দিতে পারেন না, তখন তিনি হয়ে যান বোঝা—পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে। প্রবীণ কৃষকদের জীবনের দিকে তাকালেই এই নির্মম সত্য চোখে পড়ে। নেই স্থায়ী আয়, নেই কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা, নেই মানসিক সহায়তা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকায় তারা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও অনিশ্চিত। অথচ এই মানুষগুলোর শ্রম ছাড়া খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্পই লেখা যেত না।

আমরা প্রায়ই বলি—কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই ভর্তুকির কতটা প্রবীণ কৃষকের জীবনে পৌঁছায়? উন্নয়ন বাজেটে ট্রাক্টর, সার, বীজের হিসাব থাকে; কৃষকের বার্ধক্যের হিসাব থাকে না। এটা কি পরিকল্পিত অবহেলা নয়?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আমরা নিজেদের স্মৃতি থেকেও কৃষককে মুছে ফেলছি। গ্রাম ফাঁকা হচ্ছে, সন্তানরা শহরে চলে যাচ্ছে, আর প্রবীণ কৃষক পড়ে থাকছেন একা। একসময় যিনি পরিবারের সিদ্ধান্ত দিতেন, আজ তিনি সিদ্ধান্তের বাইরে। এই অবস্থা শুধু দারিদ্র্য নয়, এটি চরম মর্যাদাহানি। এই প্রেক্ষাপটে ৩০ জানুয়ারি শুধু ‘কৃষক দিবস’ নয়, ‘প্রবীণ কৃষকের হিসাব নেওয়ার দিন’ হওয়া উচিত। রাষ্ট্রকে সেদিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে—আপনারা কি কৃষকের বার্ধক্যের জন্যে প্রস্তুত? এই দেশে কি কৃষকের অবসর নেই? তার জীবনের শেষ অধ্যায় কি কেবল করুণার ওপর নির্ভরশীল থাকবে?

প্রবীণ কৃষকদের জন্যে সম্মানজনক ভাতা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক স্বীকৃতি কোনো দয়া নয়—এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। কৃষকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় কৃষি জ্ঞান সংরক্ষণ করা—এসবই হতে পারে টেকসই কৃষির বাস্তব পথ। কিন্তু আমরা সেই পথ বেছে নিইনি।

৩০ জানুয়ারি যদি কেবল কৃষকের প্রশংসা করি, কিন্তু প্রবীণ কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করি, তাহলে তা হবে চরম ভণ্ডামি। কৃষক দিবস তখন হবে রাষ্ট্রের বিবেককে ধোঁকা দেওয়ার একটি দিন।

আমাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে—কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নন, তিনি নাগরিক। তার শ্রমের শুরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বার্ধক্যও গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে কাজ করার ক্ষমতা হারালেই তার নাগরিক মর্যাদা হারাতে পারে না।

৩০ জানুয়ারি হোক সেই দিন, যেদিন রাষ্ট্র ও সমাজ একসঙ্গে স্বীকার করবে—আমরা কৃষককে শুধু ব্যবহার করতে চাই না, আমরা তার জীবনের দায় নিতে চাই।

লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক ও সংগঠক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়