প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১১:৪০
আলঝাইমার্স রোগীর সেবাকর্মীর ভূমিকা

আলঝাইমার্স রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে পেশাদার সেবাকর্মী যেমন নার্স, হেলথ কেয়ার অ্যাসিসটেন্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, জেরিয়েট্রিক ওয়ার্ড বয়, কাউন্সিলরদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা রোগীর দৈনন্দিন জীবন, মানসিক অবস্থা, নিরাপত্তা ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করে।
নিচে পেশাদার সেবাকর্মীর ভূমিকা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পাঠকের জন্যে তুলে ধরা হলোÑ
১. রোগীর চাহিদা মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ : রোগীর স্মৃতি, আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ। রোগের অগ্রগতি বুঝে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেবা পরিকল্পনা করা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেবা পরিকল্পনার পরিবর্তন ঘটানো যাবে না।
২. ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা : নিয়মিত ওষুধ সঠিক সময়ে খাওয়ানো ও ডোজ অনুসরণ করা।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট করা।চিকিৎসা ফলো আপে সহায়তা করা।
৩. দৈনন্দিন কাজকর্মে সহায়তা : গোসল করানো, দাঁত মাজা, জামা কাপড় পাল্টানো, খাওয়া দাওয়া, টয়লেট ব্যবহার ইত্যাদিতে সহায়তা করা। রোগীর আত্মমর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে সেবা প্রদান করা।
প্রয়োজন অনুযায়ী হুইল চেয়ার, ওয়াকারের সাহায্যে চলাফেরা করতে সহায়তা করা।
৪. মানসিক ও সামাজিক সহায়তা : রোগীর একাকীত্ব দূর করতে আলাপচারিতা, গান, গল্প বলা, পুরোতন স্মৃতি রিভিউ করার সুযোগ থাকবে।
নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি। বিভ্রান্তি বা রাগ হলে শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।
৫. নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিধি নিশ্চিত করা : ঘরের ভেতর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেমন ফ্লোর অমসৃণ রাখা, ধারালো ছুরি কাঁচি দূরে রাখা।
স্বাস্থ্য বিধি ও সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা রক্ষা। খাবারে পুষ্টি ও পানি গ্রহণ নিশ্চিত করা।
৬. পরিবারের সাথে সমন্বয় ও প্রশিক্ষণ : পরিবারকে রোগ ও পরিচর্যা পদ্ধতি বুঝিয়ে বলা। জরুরি অবস্থায় পরিবারকে অবহিত করা। রোগীর আচরণ বা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্পর্কে ফিডব্যাক প্রদান। পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৭. রিপোর্টিং ও রেকর্ড রাখা : প্রতিদিনের সেবা কার্যক্রম নথিভুক্ত করা, যেমন কী খেয়েছে, কতোটুকু খেয়েছে, কতোটুকু সময় ঘুমিয়েছে, কখন ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, আচরণ কেমন ছিলো, রক্ত চাপ, ডায়াবেটিস চেক, পালস, আচরণ ইত্যাদি।
রোগীর অবস্থার উন্নতি বা অবনতি হলে কতৃপক্ষকে জানানো। চিকিৎসক দল ও থেরাপিস্টের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা।
৮. নিজস্ব দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ হাল নাগাদ : জেরিয়েট্রিক ও ডিমেনশিয়া বিষয়ে প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ। মনোবিজ্ঞান, কাউন্সেলিং, থেরাপিউটিক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানো। সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখা।
৯. যৌনতা, প্রেম ও ভালোবাসা : রোগীর পরিবারের সদস্যদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন কিংবা
প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা যাবে না।
১০. আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
পেশাদার সেবাকর্মীরা শুধু শারীরিক সেবাই দেন না বরং তারা একজন সহানুভূতিশীল বন্ধু, পর্যবেক্ষক ও সহায়ক হিসেবে আলঝাইমার্স রোগীর জীবনে আশ্রয় স্বরূপ। তাদের দক্ষতা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতা রোগীর জীবন মানোন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
পেশাদার সেবাকর্মীদের লাইসেন্স থাকলে যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে তা নিচে বর্ণনা করা হলোÑ
ক. রোগীর নিরাপত্তা ও মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত হবে। ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার ঝুঁকি কমে।
খ. প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার স্বীকৃতি পেলে পেশাদার সেবাকর্মীর আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
গ. আইনি সুরক্ষা ও বিশ্বাসযোগ্যতা : রোগী বা পরিবার কোনো অভিযোগ তুললে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কর্মীর কাজ আইনি ভিত্তিতে মূল্যায়নযোগ্য হয়।রোগীর পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের আস্থা বাড়ে।কর্মীর সুনাম ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঘ. চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন হবে। সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিং হোম, এনজিও, হোম কেয়ার সার্ভিস, বিদেশে কেয়ার গিভিং কাজের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। ভালো বেতন ও পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
ঙ. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থান বাড়বে।
চ. পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি : সেবাকর্মী হিসেবে তার কাজ সামাজিকভাবে মর্যাদা পায়। পরিবার ও সমাজ তাকে দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং দায়িত্ববান হিসেবে দেখে। নারীকর্মীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও ক্ষমতায়ন ঘটে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পেশাদার সেবাকর্মীদের জন্যে আইন দ্বারা লাইসেন্সসিং কর্তৃপক্ষ গঠন করা সময়ের দাবি। এতে সেবার মান বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
লাইসেন্স মানে শুধু একটি কাগজ নয়, এটি দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও সেবার গুণগত মানের প্রতীক।
লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সংগঠক।