প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০৩:২০
খিচুড়ি রান্না থেকে মশা মারা: বিগত আমলের ‘ট্যুরিজম সংস্কৃতি’র অবসান
“মশা মারতে ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাশে বসুন”
---------— প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাবুক ও নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বার্তা।

মশা মারার গূঢ় বিদ্যা ও ‘উদ্ভাবনী কৌশল’ রপ্ত করতে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মার্কিন মুলুকের ফ্লোরিডায় যেতে হবে—এমন এক চরম অবমাননাকর ও প্রমোদভ্রমণের ফাইল যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী টেবিলে পৌঁছায়, তখন তা কেবল আমলাতান্ত্রিক দেউলিয়াত্বকেই নগ্ন করে না, বরং দেশের ১৭ কোটি মানুষের আত্মমর্যাদার গালে এক সজোরে চপেটাঘাত করে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নবনির্বাচিত মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং চারজন কাউন্সিলরের এই বিলাসী ‘ফ্রি ট্যুরের’ সারসংক্ষেপটি অনুমোদন না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ঐতিহাসিক ও চাবুকসদৃশ মন্তব্য করেছেন, তা আমাদের নীতিহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মজ্জায় কাঁপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। প্রধানমন্ত্রী ফাইলের নোটে লিখেছেন, “মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই। দেশেই সন্ধ্যার পর যে কোনো ডোবার পাশে দুই-তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।”
|আরো খবর
প্রধানমনের এই একটি বাক্যেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে আমাদের শ্বেতাঙ্গ-প্রীতির সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা। প্রশ্ন জাগে, ফ্লোরিডার সুপরিকল্পিত কৃত্রিম হ্রদের সুমিষ্ট জলের মশা আর চাটগাঁর প্লাস্টিক-পলিথিনে শ্বাসরুদ্ধকর, পচা ও উৎকট গন্ধযুক্ত নালা-নর্দমার মশার চরিত্র কি এক? ফ্লোরিডার এভারগ্লেডসের ল্যাবরেটরিতে বসে কি আমেরিকার ফর্মুলায় Deutschlands বা চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট, চকবাজার কিংবা আগ্রাবাদের জোয়ারের পানিতে ভাসা নোংরা গলিপথের মশার মনস্তত্ত্ব ও বংশবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব? এই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানহীনতা কোনো বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়; এটি আসলে ‘বিদেশ ভ্রমণ’ নামক এক মরণব্যাধির রাষ্ট্রীয় রূপান্তর মাত্র।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, গত দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই ধরণের ‘জ্ঞান অন্বেষণ’ নামক প্রমোদভ্রমণের যে নির্লজ্জ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, নতুন বাংলাদেশেও তার ভূত এখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে আমরা দেখেছি—পুকুর খনন শিখতে ইউরোপ সফর, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের খিচুড়ি রান্না দেখতে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে বিদেশ ভ্রমণ, কিংবা লিফট কেনা আর নর্দমা পরিষ্কারের কৌশল জানতে দলে দলে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের মহোৎসব। সেই সময় জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুটে নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করে যে আমলাতান্ত্রিক ট্যুরিজম সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা এই সফরে দেখা যায়।
এই সফরের নেপথ্য কাহিনী আরও মারাত্মক। বলা হচ্ছে, সফরের অর্থায়ন করত ‘ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসি’ নামের একটি মার্কিন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। এখানেই লুকিয়ে আছে Conflict of Interest। কোনো কোম্পানি যখন জনপ্রতিনিধিদের বিনামূল্যে বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করে, তখন এর উদ্দেশ্য শুধু প্রশিক্ষণ নয়; বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ নিশ্চিত করা।
আমাদের দেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইডিসিআর-এর বিজ্ঞানীরা মশা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের গবেষণার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়, কারণ বাস্তবতার চেয়ে বিদেশি “প্রদর্শনী সফর” অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
প্রতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়, অথচ কার্যকর সমাধানের বদলে ফগিং আর লোকদেখানো কার্যক্রম চলতে থাকে। ফলে জনগণের আস্থা কমতে থাকে এবং সমস্যা আরও গভীর হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এখানে প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। এটি বোঝায়—সমস্যার সমাধান বিদেশে নয়, স্থানীয় বাস্তবতায় খুঁজতে হবে। জনগণের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ করলেই প্রকৃত সমাধান পাওয়া সম্ভব।
বাস্তবতা হলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি বা দাপ্তরিক সভায় বসে মশার যন্ত্রণা বোঝা যায় না। প্রকৃত অভিজ্ঞতা আসে মাঠপর্যায়ে গিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে।
ফ্লোরিডার মতো বিদেশি সফরের বদলে স্থানীয় ড্রেন, নালা ও বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেই কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব। উন্নয়নের নামে বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগে জোর দেওয়াই সময়ের দাবি।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।








