বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৫

​শিল্প-অর্থনীতির অমানিশা ও জাতীয় সংকটের পূর্বাভাস

উজ্জ্বল হোসাইন
​শিল্প-অর্থনীতির অমানিশা ও জাতীয় সংকটের পূর্বাভাস

শকুনের চোখ ও এক অমঙ্গলজনক নীরবতা।

​সাম্প্রতিক এক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সভায় মার্কিন প্রতিনিধি দল যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল, তখন বিষয়টি অনেকের কাছেই একটি সাধারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ রাখলে সেই অনুসন্ধানের গভীরতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। একটি দেশের তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস), কৃষি, পোল্ট্রি-ডেইরি, প্রাণিসম্পদ এবং সবশেষে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বা ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরের মতো সংবেদনশীল খাতের হালহকিকত যখন বাইরের শক্তির বিশেষ নজরদারিতে আসে তখন বুঝতে হবে খেলার পটভূমি সাধারণ নয়।

​একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি যখন ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে ঠিক তখনই বহিঃশত্রু কিংবা কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল সেখানে নজর দেয়। বাংলাদেশ আজ তেমনই এক সংকটের মুখোমুখি। জ্বালানি সংকট, শিল্পে অগ্নিদুর্ঘটনার পেছনের অজানা রহস্য, যুবসমাজের দিশাহীনতা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থবিরতা—সব মিলিয়ে দেশের সার্বভৌম অর্থনীতি আজ এক ভয়াবহ অমানিশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছে (মাত্র ৩.৩৮ শতাংশ), তা ১৯৭৩ সালের পর সর্বনিম্ন। এই পরিসংখ্যান কেবল কয়েকটি সংখ্যার খেলা নয় বরং এটি স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক মন্দা ও সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের এক করুণ প্রতিধ্বনি।

​১. ফার্মাসিউটিক্যাল ও শিল্প খাতে ধারাবাহিক 'আঘাত' : দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা?

​বাংলাদেশের শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় গৌরবের জায়গা ছিল দেশের ওষুধ শিল্প। বিশ্ববাজারের ১০০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে বাংলাদেশ নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। স্কয়ার, ইনসেপ্টা, বেক্সিমকো, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কিংবা ইবনে সিনা—এই নামগুলো কেবল কোম্পানির ব্র্যান্ড নয়, এগুলো আমাদের জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক।

​কিন্তু গত কিছুদিন ধরে এই খাতে যা ঘটছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও রহস্যময়:

​দেশের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা আজ রাজনৈতিক, আইনি ও রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। ব্যাংক ঋণ, এলসি খোলার জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে কোম্পানিটি তাদের উৎপাদনের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলছে। একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান যখন এভাবে সংকটে পড়ে তখন তার প্রভাব পুরো বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর পড়ে।

১. ​ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ও ইবনে সিনায় অগ্নিকাণ্ড : খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের কারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনা এবং পরবর্তীতে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের কারখানায় আগুনের ঘটনা—এগুলোকে কেবল 'দুর্ঘটনা' বলে চালিয়ে দেওয়া কঠিন। এটি কি কেবলই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ফল, নাকি দেশের ওষুধ শিল্পকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা অভ্যন্তরীণ 'স্টেট থ্রেট'?

​ওষুধের মতো একটি অতি-সংবেদনশীল খাতে যদি অগ্নিকাণ্ড ও উৎপাদন বন্ধের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে, তবে দেশীয় বাজারে ওষুধের তীব্র সংকট তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষকে চড়া দামে বিদেশি ওষুধ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক ওষুধ মাফিয়াদের জন্য বড় জয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

​২. পোশাক খাতের কফিনে শেষ পেরেক : দেড় বিলিয়ন ডলারের আক্ষেপ

​বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড ছিল তৈরি পোশাক শিল্প। বিগত চার দশক ধরে লাখ লাখ নারী শ্রমিকের ঘামে আর উদ্যোক্তাদের সাহসে এই খাত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই খাতটি সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

​চুক্তি বাতিল ও আস্থার সংকট : পরিসংখ্যান বলছে, বিগত এক বছরে প্রায় দেড় বিলিয়ন (১৫০ কোটি) ডলারের বেশি মূল্যের আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বা অর্ডার বাতিল হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সময়মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভিয়েতনামা, ভারত কিংবা কম্বোডিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে।

​উৎপাদন খরচ ও জ্বালানি সংকট : একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দা, অন্যদিকে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের আকাশচুম্বী দাম এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব। অনেক কারখানা এখন লোকসান গুনতে গুনতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্টস খাত যদি পুরোপুরি বসে যায়, তবে দেশের কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এক মুহূর্তেই ধসে পড়বে।

​৩. ডেইরি, পোল্ট্রি ও কৃষি : প্রান্তিক অর্থনীতির রক্তক্ষরণ

​যে কৃষকের ওপর ভর করে বাংলাদেশ আজ ১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান করে, সেই কৃষক ও খামারিরা আজ নিঃস্ব।

​পোল্ট্রি ও ডেইরি খামারিদের পথবসা : ফিড (পশুখাদ্য), ওষুধ ও বাচ্চার চড়া দামের কারণে দেশের হাজার হাজার ডেইরি ও পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট খামারিরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য প্রান্তিক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে পথে বসছেন।

​সার, সেচ ও জ্বালানির হাহাকার : কৃষিকাজের মূল উপাদান—সার, সময়মতো সেচের জন্য বিদ্যুৎ এবং ট্রাক্টর বা পাম্প চালানোর জন্য ডিজেল। বর্তমানে এই তিনটি খাতেই ভয়াবহ সংকট। সারের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে, গ্যাস সংকটে সার কারখানাগুলো কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন করতে পারছে না। সঠিক সময়ে সেচ ও সার দিতে না পারলে আগামী দিনগুলোতে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে, যা সরাসরি দেশকে খাদ্য আমদানিনির্ভর ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি করে তুলবে।

​৪. মেধা ও মানবসম্পদ ধ্বংসের চক্রান্ত : টিটকারির সংস্কৃতি ও টিওক-পাড়া

​একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ বা মানবসম্পদ । কিন্তু আজ আমাদের দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ যুবসমাজ এক অদ্ভুত দিশাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

​কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ভাতের হোটেলের অর্থনীতি : শিক্ষার অভাব, উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং টিকটক/ফেসবুকের সস্তা জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে আজ তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত। পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে অধিকাংশ তরুণ আজ তথাকথিত 'কনটেন্ট ক্রিয়েটর', 'ফুট কনটেন্ট' কিংবা গজিয়ে ওঠা 'ভাতের হোটেল' কেন্দ্রিক সস্তা ভিডিও বানাতে ব্যস্ত। শ্রমশক্তি উৎপাদনমুখী কাজ ছেড়ে প্রচারমুখী ও সস্তা বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

​কর্মবিমুখতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনাগ্রহ : শিক্ষার্থীরা আজ আর ক্লাসরুমে যেতে চায় না। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা উঠে গেছে। ডিগ্রি অর্জন করেও চাকরি না পাওয়ার ভয় এবং শর্টকাটে টাকা উপার্জনের মোহ তরুণ সমাজকে অলস, কর্মবিমুখ ও পরজীবী করে তুলছে। কোনো জাতি যখন জ্ঞানচর্চা ও কঠোর পরিশ্রম থেকে বিচ্যুত হয়ে সস্তা বিনোদনে মেতে ওঠে, তখন সেই জাতির পতন ঠেকানো কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয় না।

​৫. আইএমএফ-এর পূর্বাভাস ও ১৯৭৩-এর করুণ প্রতিধ্বনি

​অর্থনৈতিক সূচকগুলো কখনোই মিথ্যা বলে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সম্প্রতি বাংলাদেশের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৩৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

​ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : এই ৩.৩৮% প্রবৃদ্ধি কেবল একটি গাণিতিক হিসাব নয় এটি ১৯৭৩ সালের পর—অর্থাৎ সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পর—সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড।

​দুর্ভিক্ষের প্রতিধ্বনি : ১৯৭৪ সালের মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের কথা আমাদের ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা আছে। আইএমএফ-এর এই পূর্বাভাস স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে মূল্যস্ফীতি, খাদ্য সংকট, এবং ক্রয়ক্ষমতা হারানোর ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সমাজ এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

​৬. জাতীয় মুক্তির উপায় : অবিলম্বে করণীয়

​এই সংকট থেকে উত্তরণ কোনো একক রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় একতা, সঠিক অর্থনৈতিক নীতি এবং জিরো-টলারেন্স নীতি।

​১. শিল্প খাতে নিরাপত্তা জোরদারয়: ওষুধ ও পোশাক খাতের মতো সংবেদনশীল শিল্পে অগ্নিদুর্ঘটনা ও নাশকতার তদন্তে একটি স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করতে হবে। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

২. কৃষি ও খামারিদের ভর্তুকি : ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতকে বাঁচাতে পশুখাদ্যের ওপর শুল্ক ছাড় দিতে হবে এবং প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি সারের ভর্তুকি ও সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. শিক্ষা ও যুবসমাজ পুনর্গঠন : টিকটক বা সস্তা কনটেন্ট সংস্কৃতির মানসিকতা থেকে যুবসমাজকে বের করে আনতে কারিগরি (Technical), তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ও বাস্তবিক শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

৪. জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল : আইএমএফ বা বাইরের সংস্থার শর্ত মেনে চলার পাশাপাশি আমাদের দেশীয় উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করতে হবে।

​একটি দেশ কেবল সীমানা দিয়ে টিকে থাকে না টিক থাকে তার সচল অর্থনীতি, শক্ত সামর্থ্য মানবসম্পদ এবং জাতীয় সংহতির ওপর। আজ যখন আমাদের ওষুধ শিল্প আগুনে পুড়ছে, পোশাক খাত অর্ডার হারাচ্ছে, কৃষক সারের জন্য হাহাকার করছে, এবং যুবসমাজ টিওক বা সস্তা বিনোদনে সময় নষ্ট করছে—তখন নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। ​'শকুনের দৃষ্টি' আজ কেবল আমাদের ভৌগোলিক সীমানায় নয়, আমাদের প্রতিটি স্বাবলম্বী শিল্প খাতের ওপর পড়েছে। আইএমএফ-এর প্রবৃদ্ধির সতর্কবার্তা আমাদের জন্য শেষ সতর্কঘণ্টা। আমরা যদি এখনই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে না হাঁটি, তবে ১৯৭৩-৭৪ সালের সেই অন্ধকার ইতিহাস আবারও আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে। সময় শেষ হয়ে আসছে; সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই নিতে হবে—আমরা কি আত্মনির্ভরশীল হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব, নাকি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাব?

লেখক : উজ্জ্বল হোসাইন, সাংবাদিক ও লেখক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়