মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২০

মাঠসংকটে চাঁদপুর শহরের পুরোনো স্কুল-মাদ্রাসাগুলো, বিকশিত হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াপ্রতিভা

তাইয়্যেব
মাঠসংকটে চাঁদপুর শহরের পুরোনো স্কুল-মাদ্রাসাগুলো, বিকশিত হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াপ্রতিভা

চাঁদপুর শহরের অর্ধশত থেকে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জেলার ক্রীড়াঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাঠে খেলাধুলার হাতেখড়ি নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শহরের পুরোনো এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই এখন নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। ফলে ক্রীড়াসামগ্রী ও শরীরচর্চা শিক্ষক থাকলেও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের ভাষ্যেও উঠে এসেছে অতীতের সেই গৌরবের কথা। ১৯৮০-র দশকে চাঁদপুরের ফুটবলের সঙ্গে আবুল, মুকুলসহ অনেক খেলোয়াড়ের নাম উচ্চারিত হতো। পরবর্তীতে মনোয়ার চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মানিক, জাহাঙ্গীর গাজী, গোলাম মোস্তফা বাবু, জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী ও ইউসুফ বকাউলসহ অনেকেই ঢাকার মাঠ ও জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন।

পৌর শহীদ জাবেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাঠ সংকট

চাঁদপুর পৌরসভা থেকে পরিচালিত চাঁদপুর পৌর শহীদ জাবেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে ২৮০ জন ও মাধ্যমিক স্তরে ৩১১ জন মিলিয়ে কয়েক শত শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছে। তবে এতো শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ নেই। বিদ্যালয়ের ভেতরের চত্বরে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ ফুটের মতো জায়গা রয়েছে, যেখানে নিয়মিত সমাবেশ করতেও হিমশিম খেতে হয়; শিক্ষার্থীদের সমাবেশ দু ভাগে করতে হয়।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, অথচ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪২ শতক জায়গা দখল হয়ে আছে। উদয়ন ক্লাব পর্যন্ত আমাদের স্কুলের জায়গা। এই জায়গা দখল হয়ে থাকার কারণে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলার জন্য বিদ্যালয় থেকে দূরে গিয়ে আউটার স্টেডিয়াম ব্যবহার করতে হয়।

অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা শিক্ষক রয়েছেন। ইনডোরে দাবা, ক্যারামসহ বিভিন্ন খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবলের মতো আউটডোর খেলাধুলার প্রয়োজনীয় সামগ্রীও রয়েছে। কিন্তু খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে এসব খেলার চর্চা করতে পারছে না।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী গোল্ডকাপ’, ‘নতুন কুঁড়ি’, সাঁতার প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ইভেন্টে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাফল্য রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত অনুশীলনের জন্য নিজস্ব মাঠ না থাকায় তাদের আউটার স্টেডিয়ামে যেতে হয়। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যেন বিদ্যালয়ের মাঠটি পুনরুদ্ধার করে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

১৯৩০ সালের আহম্মদিয়া মাদ্রাসাতে নেই মাঠ

চাঁদপুর শহরের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম চাঁদপুর আহম্মদিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানেও নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। দুটি ভবনের মাঝখানের অংশে দৈনন্দিন সমাবেশ করে এবং খেলাধুলা করে শিক্ষার্থীরা। মাদ্রাসার একজন শিক্ষক আনুমানিক হিসেব দিয়ে বলেন, দুই ভবনের মাঝখানের অংশটুকু দৈর্ঘ্যে সর্বোচ্চ ২৫ ফুট এবং প্রস্থে ১০ ফুট হবে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মাসুম বিল্লাহ মজুমদার বলেন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা বড় ধরনের কোনো খেলাধুলার আয়োজন করতে হলে তাদের ডাকাতিয়া নদীর ওপারের চর এলাকায় যেতে হয়। ক্রীড়া শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও মাঠের অভাবে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এমনকি দৈনন্দিন সমাবেশও স্বল্প পরিসরে করতে হয়।

১৯২০ সালের ডিএন হাই স্কুলে সংকুচিত মাঠ

১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডি. এন. উচ্চ বিদ্যালয় চাঁদপুর শহরের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন জানান, বিদ্যালয়ের নিবন্ধিত ৩০৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ২৫৬ জন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের বর্তমান মাঠের আয়তন প্রায় ৬ শতাংশের মতো। ৬ শতাংশ জমি যদি বর্গাকার ধরা হয়, তাহলে তা প্রায় ৫১ ফুটের মতো হয়। এই পরিসরে বড় ধরনের আউটডোর খেলাধুলার আয়োজন করা কঠিন। তিনি বলেন, একটা সময় ডিএন স্কুল খেলাধুলার জন্য বিখ্যাত ছিলো।

বিদ্যালয়ে ক্রীড়াসামগ্রী রয়েছে এবং ক্রীড়া শিক্ষকও আছেন। সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ আরও অনেকের কাছ থেকে বিভিন্ন খেলাধুলার সামগ্রী পাওয়া গেছে। তবে মাঠের সংকট থাকায় বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে গিয়ে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আউটার স্টেডিয়ামের মাঠের ওপর নির্ভর করতে হয়।

প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা গেলে আরও বড় পরিসরে মাঠ তৈরি করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করা হয়েছে। নদীর এপারে জুট মিল এলাকায় বিদ্যালয়ের জন্য একটি মাঠ বরাদ্দের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সর্বশেষ ২৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে মাঠসংকট সমাধানে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের পুরোনো ও পরিত্যক্ত দুটি ভবন ভেঙে দক্ষিণ দিকে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে প্রায় ৭০ ফুট দ্ধ ৬৮ ফুট আয়তনের একটি খেলার মাঠ তৈরি করা সম্ভব হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনগুলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেও অপসারণ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় : ক্রীড়ার সাফল্য ধরে রাখতে সংকুচিত মাঠই প্রতিবন্ধক

১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর শহরের গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিদ্যালয় থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী খেলাধুলায় অংশ নিয়ে জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে সুনাম অর্জন করেছে। চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠদান আর খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না; চাঁদপুরের ক্রীড়া ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও এ মাঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনের ক্রীড়া উৎসবের অন্যতম ভেন্যু হিসেবে এ মাঠ পরিচিত ছিলো। একসময় গণি মডেল স্কুলের মাঠকে খেলোয়াড় তৈরির ‘চারণভূমি’ বলা হতো।

চাঁদপুরের অনেক প্রবীণ ও স্বনামধন্য খেলোয়াড়—যাঁরা পরবর্তীতে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন—তাঁদের শৈশব ও কৈশোরে খেলাধুলার হাতেখড়ি হয়েছিলো এই মাঠে। বিদ্যালয়ের মাঠ থেকেই অনেক উদীয়মান খেলোয়াড় প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে পরবর্তীতে বড় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদ বলেন, প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ইনডোর গেমস ও বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিদ্যালয়ের বেশ ক’জন সাবেক খেলোয়াড় ঢাকার পাইওনিয়ার লিগ, তৃতীয় বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। এসব লিগ দেশের পেশাদার ফুটবলের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বিদ্যালয়ের নিজস্ব বড় খেলার মাঠ না থাকলেও জেলা স্টেডিয়ামের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে উন্নত অ্যাথলেটিকস চর্চার সুযোগ পায়। ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট, লং জাম্প ও হাই জাম্পের মতো ইভেন্টে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় স্কুল অ্যাথলেটিকসে পদকও অর্জন করেছে।

গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটবল দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে, ২০২৪ সালের মে মাসে কুমিল্লা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় ফাইনাল ম্যাচে শক্তিশালী কুমিল্লা হাই স্কুলকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বিদ্যালয়টি। এর আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে জাতীয় পর্যায়ের রানার্সআপ হয় গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। ২০২৩ সালে দেশের সেরা স্কুলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটে ফাইনালে ওঠে। ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে দিনাজপুর একাডেমির কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হয়।

ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাফল্য দেখিয়ে আসছে। প্রাইম ব্যাংক স্কুল ক্রিকেটে বিদ্যালয়ের তরুণ ক্রিকেটাররা নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স করছেন। ২০২৬ সালের আসরেও বিদ্যালয়ের বাঁহাতি স্পিনার মিশারী একটি ম্যাচে মাত্র ২১ রান খরচ করে একাই ৬ উইকেট শিকার করে আলোচনায় আসেন। প্রতি বছর চাঁদপুর জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন অথবা রানার্সআপ হয়ে বিদ্যালয়টি জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায়। এসব পর্যায়ে সিলেট, পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধেও তারা খেলেছে এবং সাফল্য অর্জন করেছে।

জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল টুর্নামেন্টেও গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটবল দল নিয়মিত চাঁদপুর সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের অন্যতম সেরা দল হিসেবে উঠে আসে। বিদ্যালয়ের অনেক ফুটবলার বর্তমানে স্থানীয় প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ লিগেও খেলছেন।

অ্যাথলেটিকসেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশ রয়েছে। ১০০ মিটার স্প্রিন্ট, হাই জাম্প ও রিলে রেসের মতো ইভেন্টে বিদ্যালয়ের অ্যাথলেটরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অর্জন করে আসছে। বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক ও দক্ষ কোচদের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া খেলোয়াড়রা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) বিভিন্ন বয়সভিত্তিক (যেমন : অনূর্ধ্ব-১৪ ও অনূর্ধ্ব-১৬) জেলা ও আঞ্চলিক ক্যাম্পে সুযোগ পাচ্ছে। ফলে চাঁদপুর থেকে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে বিদ্যালয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।

গণি স্কুলের গৌরবের সেই মাঠ এখন সংকটে। বিদ্যালয়ে বর্তমানে মাত্র ৬ শতাংশের মতো মাঠ রয়েছে, অথচ শিক্ষার্থী রয়েছে মোট ৮৫০ জন। আউটডোর ও ইনডোর গেমসের জন্য খেলাধুলার সামগ্রী থাকলেও মাঠসংকটের কারণে অনুশীলন করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।

গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদ বলেন, ক্রীড়াঙ্গনে বিদ্যালয়টির গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মাঠসংকটে ভুগছে। বিদ্যালয়ে সম্প্রতি একটি নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ের জায়গার ব্যবহার আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে জায়গাটি পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করে মাঠের পরিসর বাড়ানো গেলে গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরোনো ক্রীড়া ঐতিহ্য আবারও ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ, যে মাঠ একসময় চাঁদপুরের খেলোয়াড় তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিলো, সময়ের পরিক্রমায় সেই মাঠের পরিসরই এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অথচ এই বিদ্যালয়ের শত বছরের ক্রীড়া ঐতিহ্য, নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির ধারাটি এখনো অব্যাহত রয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও চলছে মাঠ সংকট

শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা নয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও মাঠসংকট রয়েছে। চাঁদপুর শহরের তালতলাস্থ বিষ্ণুদী আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাঁচ রাস্তার মোড়ে অবস্থিত ১২৩ নম্বর গুয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ শহরের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই মাঠসংকটে মারাত্মকভাবে ভুগছে।

চাঁদপুরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—ক্রীড়াপ্রতিভার অভাব এখানে কখনো ছিল না। বরং সীমিত সুযোগের মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বহু খেলোয়াড় উঠে এসেছে। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গা কমেছে, বেড়েছে ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া শিক্ষক ও ক্রীড়াসামগ্রী থাকলেও নেই নিয়মিত অনুশীলনের জায়গা। শিক্ষার্থীদের অন্য মাঠে নিয়ে গিয়ে খেলাধুলা করাতে হয়, এতে সময় ও ব্যবস্থাপনার বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

ডিএন স্কুলের এক শিক্ষার্থী বলে, “আমরা এই স্কুলের ছাত্র। আমরা যদি অন্য কোথাও গিয়ে খেলাধুলা করি, তবে জিনিসটা দেখতে কেমন দেখায়? আমাদের দাবি, আমাদের স্কুলের জন্য একটা মাঠ বরাদ্দ দেওয়া হোক অথবা পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে এখানেই একটা মাঠ তৈরি করা হোক।”

ফরাক্কাবাদ কলেজের একজন শিক্ষকের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধুলার পরিবেশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব পুরোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চাঁদপুরের ক্রীড়াপ্রতিভা তৈরিতে ভূমিকা রেখে এসেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বা দখল হয়ে থাকা জায়গা পুনরুদ্ধার, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ এবং পরিকল্পিতভাবে মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াচর্চার সুযোগ বাড়তে পারে।

নাজিরপাড়া ক্রীড়া চক্রের সভাপতি কাজী মাইনুল হক জীবন বলেন, “আগে আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ পর্যায়ে নিয়মিত ফুটবল খেলা হতো। ফুটবল ক্যাম্প ও বিভিন্ন লিগ আয়োজনের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতো। এভাবেই ধীরে ধীরে নতুন খেলোয়াড় উঠে আসতো। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত টুর্নামেন্ট ও ক্যাম্প না থাকায় খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটা থমকে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পের মাধ্যমেই উদীয়মান ফুটবলার তৈরি হয়। আমরা যারা একসময় খেলেছি, তারা এখন প্রবীণ হয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে সেভাবে নতুন খেলোয়াড় তৈরি হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় আফসোস। তবে বর্তমানে চাঁদপুর স্টেডিয়ামে দুজন ব্যক্তি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আনোয়ার হোসেন মানিক ভাই নিয়মিত ছেলেদের ফুটবল অনুশীলন করাচ্ছেন, অন্যদিকে জাহাঙ্গীর গাজী মেয়েদের নিয়ে অনুশীলন করাচ্ছেন। আশা করি, তাঁদের এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভবিষ্যতে চাঁদপুর থেকে ভালো মানের খেলোয়াড় বের হয়ে আসবে।”

কাজী মাইনুল হক জীবন যোগ করেন, “নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরিতে এই দুজনের ব্যক্তিগত চেষ্টা থাকলেও ক্রীড়া সংস্থা বা ক্লাবগুলোর পক্ষ থেকে সেভাবে কেউ এগিয়ে আসছে না। এ কারণেই নতুন খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে না এবং দিন দিন খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও খেলার পরিবেশ আগের তুলনায় সংকুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকলে মাদকসহ বিভিন্ন বিপথগামী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকবে। পড়াশোনা ও খেলাধুলার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর ও সম্ভাবনাময় হতে পারে।”

একসময় যে মাঠগুলো থেকে চাঁদপুরের খেলোয়াড়রা জেলা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পেয়েছেন, সেই মাঠের সংকটই এখন ভবিষ্যৎ খেলোয়াড় তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাপশন

শহীদ জাবেদ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবন ও বর্তমান মাঠ।

ডিএন হাই স্কুলের সঙ্কীর্ণ মাঠ।

গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়ার অর্জন ধরে রাখতে মাঠ সংকটই এখন বড় প্রতিবন্ধক।

আহমদীয়া মাদ্রাসার মাঠ খুঁজে পেতে ক্যামেরাও হিমশিম খায়!

ক্যামেরায় আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনই বেশি ধরা পড়ে, মাঠ তেমন নয়।

গুয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ ভবনটির উত্তর পাশে সঙ্কীর্ণ মাঠ থাকলেও মামলা জটিলতায় ব্যবহার করা যায় না।

গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান মাঠটি বাড়ানো যায়, যদি উত্তর পাশের পুরানো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়