প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫
শিশুর সাবলীল রিডিং কৌশল

শিক্ষকতা মানে শুধু সিলেবাস শেষ করা বা মুখস্থ করানো নয়। একজন প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনের জারে সবার আগে মূল্যবোধ ও মানবতার বড় পাথরগুলো স্থাপন করেন, যা তাকে সারাজীবন একজন ভালো মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখে।
আজকাল প্রায় প্রতিটি মহল থেকেই একটি জোরালো অভিযোগ শোনা যাচ্ছেÑআমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাবলীল ভঙ্গিতে বাংলা রিডিং পড়তে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা হয়তো অক্ষর চিনতে পারছে, কিন্তু পড়ার সময় তোতলে যাচ্ছে, আটকে যাচ্ছে কিংবা কোনো প্রকার সুর ও ভাবভঙ্গি ছাড়াই একদম কাঠের মতো ফ্ল্যাট গলায় পড়ে যাচ্ছে। এর ফলে পড়াটা যেমন শ্রুতিমধুর হচ্ছে না, তেমনি শিক্ষার্থীরা বাক্যের আসল অর্থ ও ভাবরস হারিয়ে ফেলছে।
এই সমস্যার একটি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক, সহজ এবং চমৎকার ঊারফবহপব-ইধংবফ সমাধান হলো “ঊপযড় জবধফরহম” বা “প্রতিধ্বনি পাঠ”। প্রতিদিনের পাঠদানের শুরুতে মাত্র ৫-৭ মিনিট এই পদ্ধতিটি অনুশীলন করালে খুব অল্প সময়েই শিক্ষার্থীদের রিডিংয়ের জড়তা কেটে যায় এবং তারা সঠিক প্রমিত উচ্চারণে স্বতস্ফূর্তভাবে রিডিং পড়তে শেখে।
নিচে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য পদ্ধতির বিস্তারিত এবং শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগের একটি নির্দেশিকা দেওয়া হলো।
প্রতিধ্বনি পাঠ কী?
পাহাড়ে বা খালি ঘরে কথা বললে যেমন নিজের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ফিরে আসে, ঠিক তেমনইÑশিক্ষক আগে একটি বাক্য সঠিক উচ্চারণ, সুর, বিরতি ও ভাব সহকারে পড়বেন এবং শিক্ষার্থীরা সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকের পড়াটিকে প্রতিধ্বনির মতো অনুকরণ করে একসাথে পড়বে।
এটি মূলত রিডিংয়ের সাবলীলতা এবং সঠিক ভাবভঙ্গি/আবৃত্তি বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
কেন এটি শিশুদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী?
পড়ার ভীতি দূর করে: অনেক শিশু ক্লাসে একা একা রিডিং পড়তে লজ্জা বা ভয় পায়। শিক্ষক আগে পড়ে দিলে এবং সবাই একসাথে অনুকরণ করলে তাদের জড়তা কেটে যায়।
সঠিক প্রমিত উচ্চারণ শেখে: আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব কাটিয়ে শিক্ষককে শুনে শুনে সঠিক বাংলা উচ্চারণ আয়ত্ত করতে পারে।
বিরামচিহ্নের (কমা, দাড়ি) সঠিক ব্যবহার বোঝে: কোথায় থামতে হবে, কোথায় কণ্ঠস্বর একটু উঁচু বা নিচু করতে হবেÑতা শিশু শুনে শুনেই শিখে ফেলে।
অর্থ উপলব্ধি সহজ হয়: সুন্দর ও স্বাভাবিক গতিতে পড়তে পারলে বাক্যটির অর্থ বোঝা সহজ হয়ে যায়।
ক্লাসরুমে প্রতিধ্বনি প্রয়োগের ধাপসমূহ :
একটি ৫-৭ মিনিটের সেশনে শিক্ষক যেভাবে ক্লাসে এটি প্রয়োগ করবেন:
ধাপ ১: প্রস্তুতকরণ
পাঠ্যবইয়ের একটি উপযুক্ত ৩-৪ বাক্যের ছোট অনুচ্ছেদ নির্বাচন করুন (যাতে যুক্তবর্ণ বা বিরামচিহ্নের সুন্দর ব্যবহার আছে)।
শিক্ষার্থীদের বইয়ের নির্দিষ্ট পাতায় আঙুল বা স্কেল রাখতে বলুন।
ধাপ ২: শিক্ষকের আদর্শ পাঠ
শিক্ষক বলবেন: “প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আমি প্রথম বাক্যটি পড়ব। আমি পড়ার সময় তোমরা সবাই বইয়ে আঙুল মেলাবে এবং মন দিয়ে শুনবে আমি কোথায় থামছি আর কীভাবে পড়ছি।”
শিক্ষক স্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর স্বরে প্রথম বাক্যটি পড়বেন।
ধাপ ৩: প্রতিধ্বনি
শিক্ষক সংকেত দেবেন (যেমন: হাত উঁচিয়ে বা বলবেন “এবার তোমরা”)।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের গলার সুর, গতি ও বিরতি হুবহু অনুকরণ করে বাক্যটি একসাথে স্পষ্ট করে পড়বে।
ধাপ ৪: পুনরাবৃত্তি ও ফিডব্যাক :
কোনো শব্দে শিক্ষার্থীরা ভুল করলে বা ফ্ল্যাট গলায় পড়লে শিক্ষক হাসিমুখে সংশোধন করে দিয়ে বাক্যটি আবার ‘ঊপযড়’ করতে বলবেন। এভাবে অনুচ্ছেদের প্রতিটি বাক্য এক এক করে শেষ করবেন।
একটি বাস্তব উদাহরণ (উদাহরণসহ স্ক্রিপ্ট) ধরুন, বাংলা বইয়ের কবিতার একটি লাইন:
আমাদের ছোট নদী চলে বঁাকে বঁাকে,
বৈশাখ মাসে তার হঁাটু জল থাকে।”
শিক্ষকের পাঠ: শিক্ষক স্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর ছন্দে প্রথম অংশটুকু বলবেনÑ”আমাদের ছোট নদী চলে বঁাকে বঁাকে...” এবং কমার স্থানে সামান্য বিরতি নেবেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতিধ্বনি: এটি শুনে শিক্ষার্থীরা বইয়ের লাইনে আঙুল মিলিয়ে হুবহু একই সুর, গতি ও বিরতি বজায় রেখে স্বর মিলিয়ে প্রতিধ্বনির মতো বলবেÑ”আমাদের ছোট নদী চলে বঁাকে বঁাকে...”।
পরবর্তী অংশ: এরপর শিক্ষক পরের অংশটি সুন্দর ভঙ্গিতে দাড়ি চিহ্ন পর্যন্ত পড়বেনÑ”বৈশাখ মাসে তার হঁাটু জল থাকে।”
সম্পূর্ণকরণ: শিক্ষার্থীরাও ঠিক একইভাবে সঠিক উচ্চারণ ও বিরামচিহ্নের নিয়ম মেনে বাক্যটি শেষ করবে।
এভাবে ধাপে ধাপে অনুকরণ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোনো তোতলামি বা ভয় ছাড়াই ছন্দে ছন্দে রিডিং পড়তে সক্ষম হয়।
কিছু আকর্ষণীয় কৌশল
১। ছোট বাক্য দিয়ে শুরু করুন: শুরুতে অনেক লম্বা বাক্য না নিয়ে ৩ থেকে ৫ শব্দের ছোট বাক্য দিয়ে চর্চা শুরু করুন।
২ কণ্ঠস্বরের ওঠানামা
প্রশ্নবোধক বাক্য (?) হলে গলায় জিজ্ঞাসার সুর আনুন, আর বিস্ময়সূচক বাক্য (!) হলে আনন্দের বা অবাক হওয়ার সুর আনুন। শিশুরা এটি দ্রুত ক্যাচ করে।
৩। আঙুল মেলানো নিশ্চিত করুন: পড়া মুখস্থ বলার অভ্যাস ছাড়াতে শিশু যেন অবশ্যই পড়া এবং আঙুল চালনা একসাথে করে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
৪। দুর্বল শিক্ষার্থীদের নজর দিন: যারা পিছিয়ে আছে, তাদের জোর করে একা পড়তে না দিয়ে এই ঊপযড় জবধফরহম-এর দলে যুক্ত রাখুন। এতে অন্য বন্ধুদের সাথে পড়তে পড়তে তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।
তাই প্রতিদিন বাংলা ক্লাসে কিছু সময় যদি এই প্রতিধ্বনি পাঠ চর্চা করানো হয়, তবে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেখা যাবে শিক্ষার্থীরা তোতলে বা আটকে আটকে না পড়ে স্বতস্ফূর্ত ও সাবলীলভাবে বাংলা রিডিং পড়তে পারছে।
রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), হাজীগঞ্জ, চঁাদপুর।







