শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১১:০২

ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৯

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

শুনানির দিন আমরা সকলে ছিলাম উপস্থিত। বাদী পক্ষের উকিল আজ মহাখুশি কারণ গতদিন আমরা কেহই দলিলাদি পেশ করতে পারিনি আর এবারও পারব না তাহলে কোর্টের রায় তাদের পক্ষে যাবে। বিল্ডার্সের সাথে রাজীবও কোর্টে হাজির হয়েছে। জজ সাহেব অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে কোর্টে এসে উপস্থিত হয়েছেন। আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ডাকা হয়।

‘আপনারা কোনো নথিপত্র কী উপস্থাপন করতে পেরেছেন। নাকি আরও সময় নিতে চাইছেন?’

‘মাননীয় আদালত আমরা কোনো কিছুই উপস্থাপন আর করছি না।’

‘তাহলে নিকুঞ্জ নিকেতন দখল করার বিষয়টা আপনাদের বিপক্ষে কাজ করবে।’

‘আমরা অবৈধ দখলদার নই এটার বিষয়ে এই কাগজগুলো সহায়ক হবে আর নরেন্দ্রদার স্বপ্ন পূরণের জন্য আমাদের কোনো আশ্রয়স্থল লাগবে না। আমরা আজ জেনে গেছিÑবার্ধক্য কোনো অভিশাপ নয়। মনের শক্তি থাকলে আশি বছরেও রাজ্য জয় করা যায়। আমাদের কিছুটা সময় দেওয়া হোক তাহলে আমরা সকলে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে যাব।’

‘ঠিক আছে আপনাদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই আমি এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ করছি।’

‘মাননীয় আদালত আমি কিছু বলতে চাই।’

‘আপনার পক্ষে রায় যাচ্ছে সেখানে বলার আর কী আছে?’

‘আছে, আজ যদি বলতে না পারি তাহলে কভুও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।’

‘ঠিক আছে আসুন।’

‘আমি আদালতের বেশি একটা সময় নিচ্ছি না। নিকুঞ্জ নিকেতন ও নরেন্দ্র নারায়ণ দাস এই দুটি বিষয় আমার খুব আপন তাই এগুলোকে নিজের মতো করে গড়তে চেয়েছিলাম। অনেকের চোখে আমি একজন সফল ব্যক্তিত্ব হলেও আমি ব্যর্থ। মেধাবি হয়েও দেশের হতে পারিনি, বাবার একজন যোগ্য ছেলে হতে পারিনি আর নিকুঞ্জ নিকেতনকে কেড়ে নিয়ে আমি একজন মানুষও বোধ হয় হতে পারব না। নিকুঞ্জ নিকেতনে এই মানুষগুলো আমার বাবার স্বপ্ন তাই এই স্বপ্ন ভাঙ্গতে দিব না। আমি টিপু সাহেবের সাথে আমার চুক্তি ভঙ্গ করছি।’

‘তাহলে আপনাদের অভিযোগ আর থাকছে না?’

রাজীব কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অজস্রধারায় কেঁদে যাচ্ছে। আদালত প্রাঙ্গন পুরোটা নিশ্চুপ আর কেহই বুঝতে পারছে না বিষয়টা কী হচ্ছে। জজ সাহেবের হাতুড়ির আওয়াজও নেই, নেই অর্ডার-অর্ডার বলা। পাশে গিয়ে অনিমেষ-সারোয়ার ও পিটার আংকেল দাঁড়ায় তাদের হাত ধরে রাজীব কাঁদতে থাকে। অনিমেষ আংকেল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আমাদের অনেকেরই চোখে জল ছিল। চিঠিটায় কী লেখা ছিল তা জানা নেই তবে যা ছিল তা এই অধমকে মানবে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

২৯.

নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবার পুনরায় আগের মতো হয়ে উঠছে। বিগত সকল কিছুর পর অনুতাপ ভুলিয়ে রাজীব আবারও স্বাভাবিক হতে পেরেছে এবং হোটেল ছেড়ে এবার পাড়া দিল নিকুঞ্জ নিকেতনে। দু-একদিন সেখানে থাকার পর এবার তার যাওয়ার পালা। কাকাবাবুর লালন করা স্বপ্নটা এখনও অদৃশ্য থেকে গেল এবং আমার কাছে রয়ে গেল তার পূর্ব পুরুষের দেওয়া আমানত যা উত্তরাধিকারের অপেক্ষায় রয়েছে। যাওয়ার আগে ভাবছি তার আমানতটা তাকে ফিরিয়ে দেই। ভালোবাসা আর অপেক্ষার মাঝে জয়ী কে হবে জানা নেই তবে ইতি টানতে চাই। এদিকে রাজীব যাওয়ার আগে আমায় নিয়ে এসেছে স্কুল মাঠের বটতলায়।

‘কাকাবাবুর স্বপ্নটা তুমি ভাঙ্গতে দাওনি এর জন্য তোমায় ধন্যবাদ।’

‘সফলতার মোহে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার অস্তিত্ব। আমাকে চিঠি আর ডায়েরীটা দিয়ে অনেক ভালো করেছিস নতুবা সারাজীবন নিজেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থাকতাম।’

‘তুমি অনেক ভাগ্যবান। ভুলগুলোকে অবশেষে শুধরে নিতে পেরেছ।’

‘সবই তোর জন্য হয়েছে।

‘আমি নিয়তি বিশ্বাস করি তাই বলতে পারি তোমার নিয়তি সেভাবেই গড়া ছিল।’

‘জানি না কোনটা কী তবে এটা বুঝি বাপিকে কখনো বুঝতে পারিনি। যাই হোক এগুলো নিয়ে আর আলোচনা করতে চাইছি না এখন। অনেকদিন হয়েছে এবার আমায় ফিরে যেতে হবে।’

‘কখন যাবে?’

‘আগামীকাল রাতে।’

‘আবার ফিরবে কবে?’

‘জানা নেই। ফিরে এসে কী হবে? আমার সবকিছুই তো দেওয়ালে টাঙ্গানো ছবিটায় বন্দি। কার মায়ায় এখন ছুটে আসব।’

‘ঠিকই বলেছ। দাও, তোমার হাতটা দাও।

‘কেন?’

‘আ:হা: দাও না। এই নাও এটা আমানত ছিল আমার কাছে।’

‘এটা তো মায়ের বালাজোড়া, তুই কোথা থেকে পেলি!’

‘কাকাবাবু একদিন দিয়ে বলেছিল পড়ে আসতে সাথে একটা বেনারসি শাড়ীও ছিল।’

‘সত্যি বলছিস!’

‘কাকাবাবু সেদিন জানতে চেয়েছিলেন আমার পছন্দ হয়েছে কী না, আমি উত্তরটা দিতে পারিনি। বালাজোড়া আর বেনারসিটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল।’

কথাটা বলার সাথে সাথে আমার হাতে বালাজোড়া দিয়ে সে চলে যেতে থাকে। বিষয়টা কী ঘটেছে কিছুটা অনুমান করতে পেরেছিলাম। বাপি আমার মনের অবস্থা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল। যা এতকাল বিশাখাকে বলতে পারিনি সেটা শেষ বাক্যে তা অনায়াসে প্রকাশ করে গেল। একটা বাঁধন ছিন্ন হলেও অপর বাঁধনে ঠিকই বাঁধা পড়েছি। বাসায় আসার পর আমি আর নিজেকে স্থির করতে পারছিলাম না। বিশাখার মুখ থেকে পুরোটা না শোনা পর্যন্ত আমার অস্থিরতা থামছে না। একটা গাম্ভীর্য নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি এরই মধ্যে মনমোহন কাকা এসে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিয়ে গেল। চায়ের চুমুকের সাথে নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে অন্যমনষ্ক হয়ে যাই আর তখনি হঠাৎ পেছন থেকে সারোয়ার ও অনিমেষ আংকেল এসে উপস্থিত।

‘একা একা কী ভাবছ?’

‘ওহ: আংকেল আপনারা এসেছেন। সরি আমি খেয়াল করতে পারিনি।’

‘না না ঠিক আছে, অনেকক্ষন ধরে লক্ষ্য করছি তুমি এভাবে একা দাঁড়িয়ে। তোমার বাবা বলতেন ভাবনাগুলোকে চেপে রাখতে নেই তাকে মুক্ত করতে হয় নতুবা মনের ভেতর চাপ বাড়াতে থাকে। তুমি চাইলে আমাদের কাছে শেয়ার করতে পার।’

‘না আংকেল তেমন কিছু না। ভাবছি গেইটের পরপরই বাগানের পাশের অংশে চারটে মাথার একটা ষ্ট্যাচু দিলে কেমন হয়?

‘চারটে মাথা!’

‘চারটে মাথা বলতে অর্ধাকৃতি চারটে মূর্তি একসাথে।’

‘বেশ তো গড়ে দাও। এই চারটে মূর্তির বৈশিষ্ঠ্য কী?’

‘নিকুঞ্জ নিকেতনের নতুন রূপকার। নরেন্দ্র নারায়ণ-অনিমেষ-সারোয়ার-পিটার।’

‘তারমানে তুমি আমাদের নিয়ে ষ্ট্যাচু গড়তে চাইছ!’

‘জি সারোয়ার আঙ্কেল।’

‘আমরা কভুও এমনটা ভাবতেও পারিনি।’

‘ভাবতে পারেননি তাহলে এবার দেখে নেবেন।’

‘বেশ বেশ, তা শুনলাম তুমি আগামীকাল চলে যেতে চাইছো।

‘জি আংকেল।’

‘কয়েকটা দিন আমাদের মাঝে থেকে গেলে ভালো হতো না?’

‘ইচ্ছে হচ্ছে না। বাপির মৃত্যুর পর থেকে কেন যেন আর এখানে মন বসাতে পারছি না। আপন কিছুই আর খুঁজে পাই না এমন কী এই বাড়ীটাও।’

‘একটা বিষয় নিয়ে তোমার সাথে আলোচনা করব ভাবছি তাছাড়া বিষয়গুলো তোমারও জানা প্রয়োজন কী বলো?’

‘অবশ্যি।’

‘নরেন্দ্র দা একদিন বিশাখাকে তার পুত্রবধূ রূপে দেখতে চেয়েছেন আর সেজন্য তাকে একটা বেনারসী আর তোমার মায়ের বালাজোড়া দিয়ে গেছে।’

‘আজ্ঞে, আমি কালই জেনেছি বিষয়টা।’

‘দাদা নেই তাই দায়িত্ব আমাদের এবং সিদ্ধান্তটা তোমার।’

[চলবে..., পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়