সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬

সাইকোলজিকাল থ্রিলার

ছায়া শিকারি

মিজানুর রহমান রানা
ছায়া শিকারি

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

চার.

রাত গভীর হলে বৃষ্টি আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়নায় সে নিজের চোখের নিচের ক্লান্তির ছায়া দেখে, কিন্তু তার গভীরে জমে থাকা প্রশ্নগুলো আজ যেনো বেশি স্পষ্ট “আমি কি সত্যিই চুপ? নাকি আমাকে চুপ করানো হয়েছে?” তার ডায়েরির এক পৃষ্ঠায় ছোট ছোট বাক্যে লেখা থাকে, “প্রথমবার আমি চিৎকার করেছিলাম যখন মা হারিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার... যখন বুঝলাম কেউ শুনছে না।”

এমন একটি দিনেও সে স্পষ্টভাবে কথা বলেনি। এমনকি ইরফানের কাছেও না। কিন্তু আজ, স্পর্শযোগ্য কবিতা যখন শহরের দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন তার মনের ভেতরে সেই বহুদিনের চাপা শব্দ জেগে উঠেছে।

সে ফিরে যায় এক পুরানো স্মৃতিতে, ছোটবেলার দিনে স্কুলে আবৃত্তির প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল সে। কিন্তু পরদিন একটি আইন চালু হয়, “অপ্রয়োজনে শব্দের চর্চা নিষিদ্ধ।”

তার বাবা বলেছিলেন, ‘তোমার কণ্ঠ সুন্দর কিন্তু এই শহর এখন কণ্ঠ সহ্য করে না।’ সেই দিন থেকেই সে লেখা শুরু করে, কিন্তু উচ্চারণ? তা আর কখনো না।

এখন, ধ্বনি-গুহার চিহ্ন আঁকা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ভাবে, আমি যদি এখন কথা বলি, তবে কি আমি অপরাধী হবো? নাকি আমি আবার মানুষ হয়ে উঠবো?

তার ভেতরের ভয় তাকে থামাতে চায়, সে বলে, “তুমি যদি শব্দ করো, ইরফান ধরা পড়বে, বিদ্রোহ থেমে যাবে।” কিন্তু আরেকটি কণ্ঠ, যেটি তার নিজেরই, ছায়ার মতো বলে ওঠে, “কোনো শব্দ না করাই তো ভয়কে জেতানো।”

একটি বন্ধ জাদুঘরের ভেতর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরানো স্পিকারের সামনে। সেই স্পিকারের সুইচ চালু করলে হয়তো শহরের কোনো পুরানো মিউজিকাল ম্যাপে সাড়া দিয়ে উঠবে। সে চোখ বন্ধ করে, নিঃশ্বাস নেয়, আর প্রথমবারের মতো ফিসফিসিয়ে নয়, উচ্চারণ করে একটি কবিতা, নিজের নামে।

“আমি কখনই থেমে যাবো না, আমি চলবো স্বাধীন, আমি বলবো মানুষের কথা, যে কথায় শব্দরা জীবিত হবে, আর শাসকদল পালিয়ে যাবে।”

যেই মুহূর্তে বৃষ্টি সেই কবিতাটি উচ্চারণ করলো, সেই পুরানো স্পিকার থেকে কোনো আওয়াজ বের হলো না। তবু চারপাশ কাঁপে। অদৃশ্য কিছু যেনো হাওয়ায় লেগে থাকে, একটি ছায়া, এক ঘুমন্ত প্রতিধ্বনি।

এ সময় সে অতি নিকটে তাসফিয়াকে দেখতে পায়। তার মুখে অমলিন হাসি। তাকে দেখে ভড়কে যায় বৃষ্টি। প্রশ্ন করে, ‘তুমি এখানে?’

‘তুমিও যা চাও, আমিও তা-ই চাই’। রহস্যময়ী তাসফিয়ার উত্তর।

‘আমি জানি না তুমি কী চাও। তবে অনুমান করি তুমি বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছো। বিপ্লব অতি নিকটে। আমরা সবাই কথা বলবো, প্রাণখুলে হাসবো, গাইবো, গান-কবিতা লিখবো। মানুষ তার মনের অব্যক্ত কথামালা অন্যকে শোনাতে পারবে।’

বৃষ্টি গড় গড় করে কথাগুলো বলেই গেলো।

তাসফিয়া তার রহস্যময় হাসি ধরে রেখেছে ঠোঁটের কোণে। তার ঠোঁটগুলো আরক্তিম, যেনো জ্বলন্ত লাভার বিকিরণ। সে বললো, ‘আমাদের এই দেশ এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারেনি। এই দেশ এখনও কোনো বিজ্ঞানীকে গড়ে তুলতে পারেনি। শুধু সরকারি বরাদ্দ, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রশাসনিক লুটের মাল খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে থাকাই আমাদের দেশের মেধাবীদের কাজ। আমাদেরকে যে অন্যান্য দেশের সাথে তথ্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে হবে সেটা তাদের মাথায়ই নেই। এদের মাথাগুলো গোবরে ঢাকা পড়ে গেছে, এদের চিন্তায় ঘুণ পোকা বাসা বেঁধেছে, কারণ ওরা কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করে আরাম আয়েশেই পড়ে আছে। মেধা খাটিয়ে ভালো কিছু করার আর কি দরকার?’

বৃষ্টি অবাক হয়। তাসফিয়া তার ক্লাসমেট হলেও তার কাছে মনে হয় এই মেয়েটি যেনো ভিনগ্রহ থেকে নাজিল হয়েছে। সত্যিই সে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং সচেতন।

তারপর ঘটে প্রথম অদ্ভুত ঘটনা, শহরের বিভিন্ন অংশে, বন্ধ এক টেলিফোন বুথের কাচ জুড়ে জমে ওঠে একরকম ‘বাষ্পলিখা’। কেউ লিখেনি, তবু দেখা যায় : “বৃষ্টি ও তাসফিয়া কথা বলেছে। শব্দ জেগে উঠেছে। শাসককূলের জন্যে বিপদের আভাস।”

ধ্বনি-পুলিশ বিভ্রান্ত। সিসিটিভি রেকর্ডে কোনো আওয়াজ ধরা পড়ে না, কিন্তু মানুষের চোখ, মুখ, শরীর--তাতে আতঙ্ক নয়, কৌতূহল।

আর তখনই শহরের কিছু প্রাচীন যন্ত্র, একটি টাইপরাইটার, একটি খোলা জার্মান রেডিও, একটি পিয়ানো--এদের কিছুর বোতাম নিজের থেকেই দুলে ওঠে। তারপর তারা নিজেরাই গাইতে থাকে বৃষ্টির গান, বিপ্লবের কবিতা--“আমি বলবো স্বাধীন, আমি চলবো, কথা বলবো-- আমাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।”

নাহার বলে, “এ এক নতুন প্রকার প্রতিধ্বনি, এটি শ্রবণযোগ্য নয়, এটি সক্রিয়। যার উৎস একটি সত্য কণ্ঠ।”

সেই রাতে, ইরফান জেগে উঠে দেখে, বৃষ্টির লেখা কবিতা লুকানো নেই, বরং তার জানালার নিচে রাখা। আর তাসফিয়ার সেই তেজি কণ্ঠস্বর একটা টেপরেকর্ডারে বেজে চলছে।

পৃথিবীর প্রথম বৈধ ‘অপরাধ’ হয়ে এক কণ্ঠ, এক কাঁপন, এক রাত্রি-- শহরের হৃদপিণ্ডে খোদাই করে দিলো এক নতুন প্রশ্ন : “যদি একজন কথা বলতে পারে, তাহলে আমরা সবাই কেন চুপ? চুপ থাকাই বিপদের লক্ষণ, মানুষ চুপ থাকতে পারে না, মানুষকে কথা বলতে হয়। কথা ছাড়া মানুষ হিংস্র প্রাণী হয়ে উঠে।’

সকালের প্রথম আলোয় শহর যেন নিজেরই প্রতিবিম্ব দেখে আয়নায়। পত্রিকাগুলোর শিরোনাম জুড়ে রহস্য ‘শব্দ ছাড়া প্রতিক্রিয়া? শহরে অদ্ভুত সাড়া।’ কিন্তু কেউই স্বীকার করছে না, কেউ কিছু শোনেনি, তবু কিছুকে অনুভব করেছে।

ধ্বনি-পুলিশ এখন দ্বিধায়। তাদের অ্যালগরিদম ধরা পড়ছে না এসব শব্দহীন কম্পনে। তারা কড়া নজর রাখছে পুরানো যন্ত্র, স্তব্ধ পিয়ানো, বন্ধ বুকশেলফ। আর এক নির্দেশ আসে কেন্দ্রে “শব্দ প্রমাণযোগ্য না হলে, প্রতিক্রিয়াও অপরাধ নয়।”

এটাই ছিলো ইরফান ও নাহারদের প্রথম জয়। আর তাসফিয়া ও বৃষ্টির উচ্চারণ, যা কেউ শুনেনি, সেটাই এখন শহরের শ্রবণবিহীন প্রতিরোধের ভাষা।

সেই দিন সন্ধ্যায়, নাহার একটা নতুন চিহ্ন আঁকে গুহার দেয়ালে। তাতে লেখা হয় : ∴ প্রতিটি চুপচাপ মানুষ একেকটি বিস্ফোরণের আগে-পরে সময় মাত্র ∴ বৃষ্টি চুপ থাকে, কিন্তু তার চোখে আর দ্বিধা নেই। সে এখন স্পষ্ট জানে, তাকে চুপ করানো হয়েছিল, কিন্তু সে চুপ ছিলো না।

ওই রাতে ধ্বনি-পুলিশের এক জুনিয়র সদস্য আশরাফ চুপিচুপি ধ্বনি-গুহার এক সঙ্কেত ধরে হাজির হয়। তার চোখে কোনো উর্দি নেই, শুধু একটা প্রশ্ন : “শব্দ নিষিদ্ধ ছিলো, কিন্তু অনুভব ছিলো কি?”

আশরাফ দাঁড়িয়ে থাকে ধ্বনি-গুহার প্রবেশপথে, দেয়ালের চিহ্ন ছুঁয়ে। তার আঙুলে ধরা থাকে ধ্বনি-পুলিশের পুরু গ্লাভস, তবুও সে গ্লাভস খুলে ফেলেছে। সে অনুভব করতে চায়। শুধু শোনার চেষ্টা নয়, শব্দের উষ্ণতা, তার মর্ম।

নাহার এগিয়ে আসে। চুপচাপ। তার চোখে কোনো ভীতি নেই, শুধু জানার এক গভীর অপেক্ষা। সে বলে না কিছু, কেবল আশরাফের হাতে একটি কাপড় মুড়িয়ে দেয়। কাপড়ের ভাঁজ খুলে আশরাফ দেখে, একটি কণ্ঠের রেখচিত্র। এটা সেই রেকর্ড, যেটি শহরের কেউ কখনো শোনেনি, কিন্তু বৃষ্টির সেই প্রথম কবিতা উচ্চারণের সময় স্পন্দনচিত্রে উঠেছিলো।

‘তুমি এক শ্রোতা, আশরাফ। এটাই তুমি হতে পারো, প্রহরী নয়’, নাহার বলে।

সেই রাতে আশরাফ ধ্বনি-পুলিশের কেন্দ্রীয় সার্ভার রুমে প্রবেশ করে। কোনো শব্দ নেই, শুধু তার নিঃশ্বাস। সে গোপনে শব্দ-মুক্ত রেকর্ডিং ফাইলগুলো থেকে একটিকে কপি করে ধ্বনি-গুহায় পাঠিয়ে দেয়। তার মধ্যে একটা ফাইল ছিলো--আরাধের সেই শেষ কথা, ‘যেটা কেউ শুনতে পায়নি, কারণ সেটা অপর্যাপ্ত শব্দমাত্রা বলে বাতিল হয়েছিলো।

আরাধ বলেছিল, “শব্দ নিষিদ্ধ হলে ভাষা মরে না, কেবল অন্য রূপ নেয়, ছায়া হয়ে, কাঁপন হয়ে, মানুষের চোখের ভেতরে। প্রায় দেড়শ’ বছর আগেও ভাষাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো পাকিস্তানিরা, কিন্তু তারা পারেনি শহীদ-সালাম-রফিক-জব্বার-বরকতের আত্মদানের জন্যে। তারা তাঁদের ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলো। পাথরের গায়ে খোদাই করে গিয়েছিলো সেই ভাষা, যা আজও মরেনি, বেঁচে আছে।”

পরদিন সকালে শহরের অনেক দেয়ালে লেখা দেখা যায়, সাদা রঙে, স্পষ্ট নয়, কিন্তু উজ্জ্বল আলোয় বুঝতে পারা যায় “ভাষা মরে না। ভাষা বেঁচে থাকে আর সম্ভাবনার উঁকি দেয় বিপ্লবের।”

বৃষ্টির মনে পড়ে, এই বাক্যটি সে ছোটবেলায় চিরকুটে লিখে রেখে দিয়েছিলো তার বাবার টেবিলে। শহর কি তবে আবার কবিতার মতো নিজের ছায়ায় ফিরে আসছে?

ইমতিয়াজ হঠাৎ আবিষ্কার করে ইরফান তার ড্রয়ার থেকে কী যেনো বের করে। এরপর সে ক্রমে ক্রমে অনন্যার রুমের দিকে অগ্রসর হয়। পেছনে পেছনে ইমতিয়াজও ফলো করতে থাকে।

অনন্যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস নিয়ে একটা বই পড়ছিলো, গভীর ভাবনায় মগ্ন। এ সময় হঠাৎ করেই সে সামনে দেখতে পায় ইরফানকে। কিছুক্ষণ পরেই কামরায় প্রবেশ করে ইমতিয়াজ। দুজনকে দেখেই সে অবাক হয়, নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে দু জনের পানে। আর তাসফিয়া আণুবীক্ষণিক যন্ত্রে পরীক্ষা করে এমন একটি ভাইরাস, যা জাতিকে ধ্বংস করতে একদিন মাত্র সময় লাগবে। তবে, সে জানে এই ভাইরাসের এন্টিডোটও আবিষ্কার করা তার সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি সে করবেই, তবে সমস্ত জাতির মধ্যে যারা বিভেদের দেয়াল তুলে রেখেছে, যারা মানুষের শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করেছে তাদেরকে শেষ করার পর সে এ ভাইরাসের এন্টিডোট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে। আর সেই ভাইরাসটির নাম ‘বিপ্লব’। সমুদ্রের উছলে উঠা জলের মতো বাঁধনহীন বিপ্লব এগিয়ে আসছে দেশের নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে, যারা মানবজাতিকে শব্দহীনতার আড়ালে ধ্বংস করে দিতে চায়। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়