প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৫, ১১:৩০
মুখোশের অন্তরালে

সন্ধ্যার আকাশে রমজানের চাঁদ দেখা যায়। বিনপুরের মসজিদ থেকে ঘোষণা আসে ‘কাল থেকে রোজা শুরু, সবাই সেহরি খেয়ে নিয়েন!’ গ্রামের মানুষ রোজার প্রস্তুতি নেয়। কেউ সেহরির আয়োজন নিয়ে ভাবে, কেউ নামাজে মন দেয়। কিন্তু কিছু ঘরে নীরবতা, এক চাপা শোক ভাসে বাতাসে।
গ্রামের একপাশে বিশাল এক প্রাসাদ। ঝলমলে আলোয় আলোকিত চারপাশ। ভেতরে বসে আছে হাজি করিমউদ্দিন। একসময় ছিল ‘কালা করিম’। চাঁদাবাজি, জমি দখল আর লাঠিয়াল বাহিনীর ভয় দেখিয়ে গড়ে তুলেছিল সাম্রাজ্য। এখন ইসলামী পোশাক পরে, লম্বা দাড়ি রেখেছে, লোক দেখানো দান-খয়রাত করে বেড়ায়। রমজান এলেই বড় বড় ওয়াজ মাহফিল করে, গরিবদের জন্য ইফতারের আয়োজন করে। অথচ এই গরিবদের মধ্যেই আছে সেই রহমত চাচা, যার জমি কেড়ে নিয়ে এখানে প্রাসাদ বানিয়েছে সে।
রহমত চাচার ঘরে ইফতারি বলতে শুধু এক মুঠো মুড়ি আর পানি ছাড়া কিছুই জোটে না। পাশে বসে তার বিধবা মেয়ে আর ছোট্ট নাতি। নাতি প্রশ্ন করে,
‘দাদু, একটু খেজুর ছিল না?’ রহমত চাচা চুপ করে থাকে। একসময় এই জমিতে ধানের ক্ষেত ছিল, এখন সেখানে করিমউদ্দিনের বাগানবাড়ি। মনে পড়ে,
কীভাবে তার লোকেরা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে জমি লিখিয়ে নিয়েছিল। ভয়ে কিছুই বলতে পারেনি সে।
মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। করিমউদ্দিন সুগন্ধি আতর মেখে ইফতারি করতে বসে। সামনে সাজানো বাহারি খাবারের পসরা– খেজুর, শরবত, বিরিয়ানি, কাবাব আরও কত কী! এক কর্মচারী বিনীত কণ্ঠে বলে, ‘হুজুর, রহমত চাচা খুব কষ্টে আছে, একটু সাহায্য করবেন?’ করিমউদ্দিন বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়, ‘যার কপালে যা আছে, সে তাই পাবে! আমি কারও ভাগ্য বদলাতে পারব না।’
রমজানের চাঁদ তখনও আকাশে জ্বলজ্বল করছে। করিমউদ্দিন আত্মতৃপ্তিতে ইফতারি করে আর রহমত চাচা আকাশের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি কি শুধু তাদেরই দোয়া শোন, যারা ক্ষমতাবান?’
রমজান সংযমের শিক্ষা দেয়, সেই শিক্ষায় জীবন আলোকিত হয়। কিছু মানুষ শুধু মুখোশ হয়ে থাকে আর মুখোশের অন্তরালে তারা ভয়ংকর।