মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০২:৫৮

জল, জাল, জীবন ও জুলুমের উপাখ্যান!

‘জলরূপালী’: ইলিশের ঝলকের আড়ালে জেলে জীবনের রক্তাক্ত বাস্তবতার মহাকাব্য

----------মেঘনার বুকজুড়ে ক্ষুধা, কিস্তি আর কান্না

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
‘জলরূপালী’: ইলিশের ঝলকের আড়ালে জেলে জীবনের রক্তাক্ত বাস্তবতার মহাকাব্য

নদী, জল আর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল সমীকরণের নাম চাঁদপুর। মেঘনা নদীর রূপালী ইলিশ যেমন এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের মূল চালিকাশক্তি, তেমনি এখানকার জেলে সম্প্রদায়ের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রামও এক চিরন্তন ও নির্মম বাস্তবতার স্মারক। চাঁদপুরের এই লোকজ ঐতিহ্য, জেলেদের বেঁচে থাকার অন্তহীন লড়াই, নিষিদ্ধ সময়ে দাদনের জালমহাজনী শোষণের রূপক চিত্রাবলি এবং তার সমান্তরালে বাউল সম্রাট লালন শাহের অসাম্প্রদায়িক মানবধর্শনকে এক সুতোয় গেঁথে মঞ্চে পরিবেশিত হলো সচেতনতামূলক নাটক 'জলরূপালী'। বিশিষ্ট নাট্যকার ও নির্দেশক জসীম মেহেদীর রচনা ও নির্দেশনায় নির্মিত এই নাটকটি কেবল সাধারণ বিনোদন নয়, বরং সমাজসচেতনতা, লোভের ট্রাজিক পরিণতি এবং মানবিক চেতনার এক অনবদ্য দলিল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নাটকের মূল কাহিনীর সাথে যুক্ত হওয়া নতুন উপাখ্যান, চরিত্রগুলোর আদর্শিক অবস্থান এবং অন্ধকার আইনের বেড়াজাল নাটকটিকে এক কাব্যিক ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করেছে।

IMG 20260525 WA0031

১. লোকজ উৎসব ও উৎসবমুখর আবহে কাহিনীর সূচনা

নাটকের প্রারম্ভেই দর্শক অবগাহন করেন চাঁদপুরের খাঁটি আঞ্চলিক সংস্কৃতির মোহময় ও ছন্দোময় আবহে। মঞ্চের মাঝখানে হলুদ পোশাক এবং মাথায় লাল পাগড়ি পরে প্রধান গায়েন যখন বন্দনা গীতি পরিবেশন করেন, তখন পুরো মিলনায়তন মেঘনা পাড়ের চেনা সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে ওঠে। গায়েনের দু পাশে সাদা পোশাক এবং গলায় লাল-হলুদ গামছা জড়ানো কোরাসের শিল্পীদের চমৎকার শারীরিক কসরত ও অভিনব মুদ্রা মুগ্ধ করার মতো। নদীর ঢেউয়ের প্রতীকী আবহ তৈরিতে কোরাসের শিল্পীরা একসঙ্গে দু হাত ওপরে তুলে যখন তরঙ্গমালার জীবন্ত রূপ ফুটিয়ে তোলেন, তখন থিয়েটারের চার দেয়ালর মাঝেই যেন প্রমত্তা মেঘনা সগৌরবে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এই উৎসবমুখর আবহের ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে নাটকটির মূল থিম সং:
"জাল ফেলিয়া মাছ ধরি
মাছ ধরিিয়া জাল ফেলি...
ইলিশ মাছের থাপ্পড় খেয়ে
মেঘনা নদী উত্তাল!"
শিল্পীদের সমস্বরে লোকজ তালের "হো রে... হো রে..." ধ্বনি এবং নিখুঁত কোরিওগ্রাফি নাটকের শুরুতেই এক ভিন্ন মাত্রার গতিশীলতা ও নান্দনিকতার আবহ তৈরি করে।

২. জাটকা মাছ ধরার গোপন ব্যাখ্যা ও মহাজনের মরণখেল

নাটকের কাহিনীর যত সামনের দিকে এগোয়, ততই উন্মোচিত হতে থাকে লোভের এক অন্ধকার অধ্যায়। লোকচক্ষুর আড়ালে নদীপাড়ের সমাজে এক নিষিদ্ধ বাণিজ্য জাঁকিয়ে বসেছে—তা হলো 'জাটকা' বা ছোট ইলিশের পোনা ধরা। নাটকে এই জাটকা মাছ ধরার পেছনে মহাজনী মহলের এক কুৎসিত ও গোপন অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মহাজন সাধারণ সরল জেলেদের বোঝায় যে, এই জাটকা ধরা মূলত নদী পরিষ্কার করার অংশ এবং এই ছোট মাছ বাজারে বিক্রি করলে দ্রুত অর্থ আসে, যা বড় ইলিশের জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে লাভজনক। মহাজনের এই 'গোপন তত্ত্ব' মূলত তার নিজস্ব আখের গোছানোর এক ফাঁদ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধের সময়ে যখন সাধারণ জেলেরা নদীতে নামতে ভয় পায়, তখন লোভের বশবর্তী হয়ে মহাজন এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বেশি মুনাফা লাভের আশায় মহাজন এবার শুধু সাধারণ জেলেদের নয়, নিজের একমাত্র আদরের তরুণ ছেলে এবং এলাকার একদল বিভ্রান্ত যুবককে প্ররোচিত করে গভীর রাতে নদীতে মাছ ধরতে পাঠায়। দাদনের টাকা ও লোভের মোহে অন্ধ হয়ে যুবকেরা যখন মেঘনার বুকে জাল ফেলে, তখনই নেমে আসে আইনের অমোঘ শাসন। অন্ধকার রাতে টহলরত নৌ-পুলিশের সাইরেন বেজে ওঠে। কিন্তু মহাজনের ছেলে ও যুবকেরা আইনকে তোয়াক্কা না করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এবং পুলিশের ওপর চড়াও হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে মহাজনের নিজের ছেলের বুক ঝাঁঝরা হয়ে নদীতে গড়িয়ে পড়ে। এই ট্রাজিক দৃশ্যটি নাটকের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। যে মহাজন অর্থের लोভে আইন ভাঙার খেলায় মেতেছিল, তার নিজের অহংকার ও রক্তের উত্তরাধিকার মেঘনার জলেই বিলীন হয়ে যায়। লোভের এই নির্মম ও রক্তক্ষয়ী পরিণতি দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয়।

৩. ক্ষমতার দাপট ও ক্ষুদ্র কৃষকদের নদীতে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র

মহাজন নিজে তার সন্তানকে হারিয়েও শোষণের স্বভাব থেকে বিচ্যুত হয় না। সে তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং আইনি ঝামেলা থেকে নিজের পিঠ বাঁচাতে এক নতুন চক্রান্তের জাল বোনে। এবার সে টার্গেট করে এলাকার প্রান্তিক ও ভূমিহীন ছোট ছোট কৃষকদের। যে কৃষকেরা কোনোদিন নদী ও জালের সাথে যুক্ত ছিলো না, মহাজনের লোকজন তাদের ওপর ঋণের বোঝা ও চড়া সুদের দাদন চাপিয়ে দেয়। কৃষকদের ফসল নষ্ট হওয়ার সুযোগ নিয়ে মহাজন তাদের বাধ্য করে বেআইনিভাবে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে মাছ ধরতে যেতে। মহাজনের লাঠিয়াল ও লোকজন পর্দার আড়াল থেকে এই নিরীহ কৃষকদের নদীর বুকে ঠেলে দেয়, যাতে কোনো বিপদ হলে কৃষকেরা ধরা পড়ে এবং মহাজনের আসল অপরাধ ঢাকা পড়ে যায়। নাটকের এই অংশটি সমাজে চলমান ক্ষমতার দাপট, পুঁজিপতিদের নিষ্ঠুরতা এবং প্রান্তিক মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দ্বিমুখী শোষণের এক জীবন্ত চিত্র।

৪. নরেন জেলের পারিবারিক টানাপোড়েন ও মহাজনী শোষণের চালচিত্র

IMG 1779738323345

নাটকের সমান্তরাল ধারায় প্রবাহিত হয় প্রধান চরিত্র নরেন মাঝি ও তার পরিবারের চিরন্তন দুঃখের আখ্যান।
পারিবারিক সংকট: নরেন মাঝি ও তার স্ত্রী মনিয়া তাদের জীর্ণ কুটিরে অভাবের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা (অবরোধ) চলার কারণে নদীতে যাওয়া বন্ধ, ঘরে চাল নেই, উনুন জ্বলে না। এই চরম দারিদ্র্যের মাঝেও তাদের চারপাশ জুড়ে রয়েছে মহাজনের দাদনের তাগাদা এবং কিস্তির স্যারের নিষ্ঠুর মানসিক চাপ

IMG 20260523 194042 892

শোষণের নিষ্ঠুর রূপ : সবুজ পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি ও মাথায় টুপি পরা কুটিল মহাজন যখন দাদনের টাকার জন্য নরেন can মাঝির দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে কর্কশ স্বরে তাগাদা দেয়, তখন অসহায় নরেন মাঝির হাতজোড় করে আকুতি—"কর্তা, নদীতে মাছ ধরার সরকারি অবরোধ চলছে। এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই আমি নদীতে নামবো, আপনার সব পাওনা পাই পাই করে চুকিয়ে দেব।"—এই সংলাপটি কেবল একজন নরেনের নয়, বরং বাংলার হাজারো শোষিত জেলের কণ্ঠস্বর। পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী মনিয়া যখন অত্যন্ত চিন্তিত ও মলিন মুখে স্বামীর এই অপমান ও অসহায়ত্ব লক্ষ্য করে, তখন মঞ্চের সেই নিস্তব্ধতা দর্শকদের হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে।

Screenshot 20260525 061106

৫. কাজলীর আদর্শ : সততা ও দেশপ্রেমের অনন্য প্রতীক

এই অন্ধকার ও শোষিত পরিবেশের মাঝেও আলো হয়ে জেসেন নরেন মাঝির মেয়ে কাজলী। কাজলী কেবল একজন সাধারণ গ্রামীণ তরুণী নয়, সে এই নাটকের নৈতিকতার মেরুদণ্ড। কাহিনীর শুরুতে কাজলী তার বাবার কাছে ইলিশ মাছ খাওয়ার অবুঝ বায়না ধরলেও, যখন সে জানতে পারে যে নদীতে মাছ ধরা এখন আইনত নিষিদ্ধ এবং জাটকা ধরা দেশের দণ্ডনীয় অপরাধ, তখন তার ভেতরের আদর্শ জাগ্রত হয়। কাজলী তার বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, "ক্ষুধা সয়ে মরে যাবো বাবা, তবুও নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে গিয়ে চুরির মাছ ধরো না। মহাজনের দাদনের টাকা শোধ করার জন্যে দেশের আইন ভাঙা যাবে না।" কাজলীর এই অনমনীয় আদর্শ ও দেশপ্রেমের ভাবনা নরেন মাঝিকে শক্তি জোগায়। সে তার বাবাকে মহাজনের লোভী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য করে। নিজের ঘরে অন্ন না থাকলেও কাজলী অন্যায়ের সাথে আপস করে না। তার এই দৃঢ় চরিত্রটি প্রমাণ করে যে, সততা ও মূল্যবোধ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় নয়, এটি অন্তরের আলো।

৬. কাজলীর অনমনীয় চিত্ত ও নিতাইয়ের দম্ভ : প্রেমের নামে লালসার প্রত্যাখ্যান

'জলরূপালী' নাটকের এই অংশে কাহিনীর মোড় এক ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার দিকে ধাবিত হয়, যেখানে ফুটে ওঠে ক্ষমতার দাপটের বিপরীতে একজন নারীর আত্মসম্মান ও চারিত্রিক দৃঢ়তা। মহাজনের বখাটে ছেলে নিতাই নরেন মাঝির রূপবতী কন্যা কাজলীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেয়। নিজের পারিবারিক বিত্ত ও ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে সে তার বাবা অর্থাৎ মহাজনের মাধ্যমে নরেন মাঝির ঘরে কাজলীকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু নাটকের সবচেয়ে নাটকীয় ও উত্তেজনাকর দৃশ্যটি তৈরি হয় তখন, যখন নিতাই লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে সরাসরি কাজলীর জীর্ণ বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। গ্রামীণ আবহে সাজানো সেই মঞ্চে নিতাই উগ্রভাবে কাজলীর দিকে এগিয়ে যায় এবং জোরপূর্বক তার হাত ধরার ধৃষ্টতা দেখায়। একজন সামন্ততান্ত্রিক লোভী পিতার অহংকারী পুত্রের এই আচরণে কাজলী দমে যায়নি; বরং সে তীব্র ক্ষোভে ও অপমানে ফেটে পড়ে। নিতাইয়ের এই অশালীন ও ঔর্থত্যপূর্ণ আচরণকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে কাজলী তাকে কঠোর ভাষায় অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। নিতাইয়ের এই প্রস্থান কেবল একজন যুবকের অপমান ছিলো না, তা ছিলো শোষক শ্রেণীর দম্ভের মুখে এক সাধারণ জেলে কন্যার সজোর চপেটাঘাত।

৭. বাবার সাথে কাজলীর আদর্শিক মেলবন্ধন ও বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

নিতাই চলে যাওয়ার পর কাজলী তার বাবা নরেন মাঝির মুখোমুখি হয়। সে কেবল নিজের ব্যক্তিগত অপমানের কথাই বাবাকে জানায়নি, বরং মহাজন পরিবারের আসল কুৎসিত রূপটি বাবার সামনে উন্মোচন করে দেয়। কাজলী অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে তার বাবাকে বুঝিয়ে বলে যে, মহাজনের যে অর্থসম্পদ আর দাপট, তার সবটাই মেঘনার বুকে অবৈধভাবে জাটকা মেরে এবং নিরীহ জেলেদের রক্ত চুষে তৈরি করা। এমন এক অর্থলোভী, নিষ্ঠুর ও আইন অমান্যকারী পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করার অর্থ হলো নিজেদের সততা ও আত্মাকে বিক্রি করে দেওয়া। কন্যার মুখের এই সত্য ও তার অনমনীয় আদর্শিক অবস্থান নরেন মাঝির ভেতরের সুপ্ত আত্মসম্মানবোধকে জাগিয়ে তোলে। শত অভাব, দারিদ্র্য আর মহাজনের দাদনের নির্মম চাপ থাকা সত্ত্বেও নরেন মাঝি মেয়ের এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বুক ফুলিয়ে মহাজনের পাঠানো সেই লোভনীয় বিয়ের প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। এই দৃশ্যটি দেখায় যে, পেটে ক্ষুধা থাকলেও এই জেলে পরিবারটি তাদের নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধকে ধুলোয় মিশে যেতে দেয়নি।

৮. বলাইয়ের প্রতি ভালোবাসা : সৎ ও আদর্শায়িত চরিত্রের জয়গান

নাটকে কাজলীর এই দৃঢ়তার পেছনে আরেকটি নীরব শক্তি ও প্রেরণা হিসেবে কাজ করে তার ভেতরের পবিত্র ভালোবাসা। সে মহাজনের বখাটে ছেলে নিতাইয়ের ধন-সম্পদকে পায়ে ঠেলে মূলত ভালোবাসে বলাইকে। বলাই কোনো বিত্তশালী পরিবারের সন্তান নয়, কিন্তু সে একজন সৎ, পরিশ্রমী এবং আদেশবান যুবক। নদী, প্রকৃতি আর দেশের আইনকে সম্মান জানিয়ে বেঁচে থাকার যে মন্ত্র বলাইয়ের জীবনে রয়েছে, কাজলী তার সেই আদর্শিক চরিত্রেরই গুণমুগ্ধ। জাটকা মাছ ধরার সামাজিক কুফল এবং মহাজনের শোষণের বিরুদ্ধে বলাইয়ের যে নীরব অবস্থান, তা কাজলীর নিজস্ব জীবনদর্শনের সাথে মিলে যায়। বলাইয়ের প্রতি কাজলীর এই ভালোবাসা কোনো সস্তা আবেগ নয়; এটি মূলত দুটি সৎ ও আদর্শবাদী মনের মেলবন্ধন। এই প্রেমের মাধ্যমেই নাটকে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, অর্থের জৌলুসের চেয়ে একজন মানুষের সৎ চরিত্র ও আদর্শই দিনশেষে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান ও অনুকরণীয়।

৯. সংকটের সমান্তরালে লালনের 'মানবধর্ম' ও আধ্যাত্মিক চেতনা

'জলরূপালী' নাটকটি কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংকটের গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি এক গভীর জীবনদর্শনের দিকে মোড় নেয়। কাহিনীর চরম সংকটের মুহূর্তে মঞ্চে প্রবেশ ঘটে বাউল সম্রাট লালন শাহের (বা তাঁর সুযোগ্য শিষ্যের) দর্শনের।
লালনের মূল বাণী ও দর্শন সামাজিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
"আমারে কি রাখবেন দয়াল তোমার চরণে... জাতের দল তো আমায় লয় না রে..." সমাজ যখন মানুষকে ধনী-দরিদ্র, মহাজন-জেলে এবং বিভিন্ন জাতে বিভক্ত করে শোষণ করে, তখন লালনের এই বাণী মানুষের মৌলিক আশ্রয়ের কথা স্মরণ করায়।
"সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে... লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে..." মানুষের তৈরি কৃত্রিম জাত-পাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং পুঁজিপতিদের শোষণের বিরুদ্ধে এটি এক তীব্র আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রতিবাদ
মঞ্চের মাঝখানে গেরুয়া বসন, মাথায় লাল পট্টি, হাতে একতারা ও ডুগডুগি নিয়ে কেন্দ্রীয় বাউল চরিত্রটি যখন এই গানগুলো পরিবেশন করেন, তখন পুরো নাটকের ক্যানভাস আধ্যাত্মিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। লালনের এই 'মানবধর্ম' জেলে ও কৃষকদের শোষিত জীবনের মুক্তির এক পরম পথ নির্দেশ করে। নাটকটি দেখায় যে, লোভের কারণে সমাজে যে হাহাকার ও মৃত্যু নেমে আসে, তার একমাত্র নিরাময় হলো মানুষের মানবিক বোধের জাগরণ। জাত বা ধর্মের চেয়ে, কিংবা বিত্তের চেয়ে মানুষের মানবিক পরিচয়ই সবচেয়ে বড় সত্য।

১০. কারিগরি দিক, নির্দেশনা ও অভিনয়ের নিখুঁত রসায়ন

একটি সফল ও দীর্ঘ মঞ্চায়নের পেছনে থাকে একঝাঁক প্রতিভাবান মানুষের সম্মিলিত ও সুশৃঙ্খল প্রয়াস। 'জলরূপালী'র ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নির্দেশক জসীম মেহেদী প্রতিটি দৃশ্যকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাজিয়েছেন।
কুশলী তালিকা ও চরিত্র পরিচিতি
রচনা ও নির্দেশনা : জসীম মেহেদী
মূল চরিত্রসমূহ : শহীদ পাটোয়ারী (নরেন মাঝি), আয়েশা সিদ্দীকী আভা (কাজলী), সীমা ইসলাম (মনিয়া), জসীম মেহেদী (মহাজন), আলমগীর হোসেন পাটোয়ারী (ছিডু), শরীফুল ইসলাম (নিতাই), কামরুল ইসলাম (কিস্তির স্যার), দুলাল সরকার (বলাই)
সংগীত ও গায়েন : ফাতেমাতুজ জোহরা, হৃদয় কর্মকার (জারি), মৃনাল সরকার, বীরেন সাহা, খোকন দাস, কাজী কাবীসা, ফেরদৌসী আক্তার লিমা, অন্তরা বিনতে মাহা।
মঞ্চ ও আলো পরিকল্পনা : মানিক দাস, আলমগীর পাটোয়ারী, গোবিন্দ মন্ডল (অতিথি), মামুন হোসেন।
কোরিওগ্রাফি ও রূপসজ্জা : ফাতেমাতুজ জোহরা (কোরিওগ্রাফি), সাবিত্রী রাণী ঘোষ, সুবর্ণা আক্তার, রুনা আক্তার আশা।
প্রযোজনা প্রশাসন : মো. হানিফ (উপদেষ্টা), কামরুল ইসলাম (অधिकর্তা), মোবারক হোসেন সিকদার (মঞ্চ ব্যবস্থাপক)। নেপথ্যে চন্দন সরকার, জয়রাম রায়, অ্যাড. ইয়াহিন ইকরাম এবং এইচ এম জাকিরসহ বিশাল প্রযোজনা সহযোগীদের দল নাটকটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

জসীম মেহেদীর 'জলরূপালী' কেবল একটি সাধারণ প্রচারণামূলক বা সচেতনতামূলক নাটক নয়; এটি চাঁদপুর তথা সমগ্র বাংলাদেশের নদী-মাটি, মানুষের জীবনের অধিকার এবং লোভের বিরুদ্ধে এক কাব্যিক হাহাকার। একদিকে জাটকা মাছ ধরার গোপন লোভ ও তার কারণে মহাজনের নিজের সন্তান হারানোর ট্র্যাজেডি, অন্যদিকে কৃষকদের ওপর পুঁজিপতিদের অত্যাচার—সমাজ ব্যবস্থার এই কুৎসিত রূপকে নাটকটি সাহসের সাথে ব্যবচ্ছেদ করেছে। কিন্তু এই অন্ধকারের মাঝেও কাজলীর সততার আদর্শ এবং বলাইয়ের প্রতি তার পবিত্র প্রেম দর্শকদের মনে আশার আলো জ্বালায়। লালনের অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শন ও সংগীতের মেলবন্ধন সমাজকে এক বড়ো বার্তা দেয়—শোষণের অন্ধকার ও লোভের চিতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মানবিক সাম্য ও সততারই জয় হয়। এমন জীবনমুখী, শেকড়সন্ধানী এবং ট্রাজিক নাট্যপ্রয়াস আমাদের নাট্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এবং সমাজ পরিবর্তনে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক:
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি, সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়