বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ১৩:০৩

এই সময়ের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

সরকার আবদুল মান্নান
এই সময়ের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা যা ভাবি বা আমাদের যা মনে হয়, তার সবটুকু আমরা বলি না, বলতে পারি না এবং বলা উচিতও নয়। অনেকদিন ধরে এমন একটি ভাবনায় আমি নিমজ্জিত ছিলামÑ বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ মন্তব্য করেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়টি কোচিং সেন্টারে পরিণত হয়েছে। এই মন্তব্য অনেকের মনোকষ্টের কারণ হতে পারে। কারণ মন্তব্যটি প্রবীণের প্রজ্ঞাপ্রসূত হয়নি; অধিকন্তু মন্তব্যটিতে যুবকের চাপল্য, সহজ-সরলতা ও অপরিণামদর্শিতার বহিপ্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু একজন প্রতিমন্ত্রী যখন কথা বলবেন, তখন তাঁর বয়স বিবেচ্য নয়Ñ তাঁর পদ-পদবিটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনায় তিনি হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছেন। কথাটির মধ্যে বাস্তবতা যে একেবারেই নেই, তা নয়। আছে। তবে তিনি অন্যভাবে বলতে পারতেন।

এ প্রসঙ্গে আমার ভাবনা কিছুটা ভিন্ন।

দুই.

একজন মানুষ দুই ধরনের পুষ্টি লালন করে : এক ধরনের পুষ্টি খাদ্যসংক্রান্ত এবং অন্যটি বুদ্ধিবৃত্তিক। কেউ যখন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে কিংবা যাদের খাওয়া-খাদ্যের কোনো অভাব নেই, তাদের দেহে এক ধরনের পুষ্টি বিরাজমান থাকে। সেটা স্বাস্থ্যকর হোক কিংবা অস্বাস্থ্যকর। তবে পুষ্টির সঙ্গে ‘অস্বাস্থ্যকর’ কথাটি যায় না, তবু বললাম এই জন্য যে, প্রচুর খাদ্য গ্রহণের মধ্যে এক ধরনের শারীরিক গঠন তৈরি হয়, যার মধ্য দিয়ে কমপক্ষে অস্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্যও পরিলক্ষিত হয়। কমপক্ষে কেউ তাদের বলবেন না যে, তারা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা, জ্ঞানের চর্চা, শিল্পসাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা ও সুন্দরের চর্চা মানুষের দৈহিক গড়নের মধ্যে এক ধরনের পুষ্টি তৈরি করে। যাকে বলা যায় প্রজ্ঞাদীপ্তি। সংস্কৃতিতে এর আরেকটি নাম হলো ওজস্। ওজস্ মানে প্রাণশক্তি, বল, জীবনীশক্তি, পুষ্টিদীপ্ত দেহ। সংস্কৃত অভিধানে ওজস্-এর অর্থ ইংরেজি করলে দাঁড়ায় ভাইট্যালিটি, ভিগর, স্পেøন্ডার বা লাইট। জ্ঞানার্জন ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা যদি সংযম, নিয়মানুবর্তিতা, পবিত্রতা ও মানসিক স্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন মুখে যে শান্ত ও স্বাস্থ্যকর দীপ্তি আসে, সেটিকে “ওজস্” বলা হয়। জার্মান ভাষায় একে বলে বিল্ডুং। এর অর্থ সরাসরি শিক্ষা নয় বরং সংস্কৃতি চর্চার নিজস্ব মনোভূমি। এর মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধি, রুচি, নৈতিকতা, সহৃদয়তা ও ব্যক্তিত্বের গড়ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা মানুষকে ভেতর থেকে যে পরিশীলিত করে, সেই অবস্থা বোঝানোর জন্য জার্মান ভাষায় এই অভিধাটি ব্যবহার করা হয়। ইংরেজিতে এই দীপ্তিমান মুখের নাম কাউন্টেন্যাস। জ্ঞানচর্চা মানুষের মুখাবয়বে যে শান্ত দীপ্তি এনে দেয়, তাকে ইংরেজিতে বলে কাউন্টেন্যাস।

তিন.

আশির দশকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন আমাদের অধিকাংশই নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা গরিব পরিবার থেকে আসত। আমার দেখা খুব কম সহপাঠী উচ্চবিত্ত বা প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক, এমন পরিবার থেকে এসেছিল। দু-একজন যা-ও অবস্থানসম্পন্ন পরিবারের সন্তান ছিল, তারাও হিসাব করে টাকা খরচ করত।

আমাদের সেই সময় প্রচুর পরিমান খেয়ে কেউই হস্তিসাবক হয়ে ওঠেনি। আর ফাস্টফুড তো তখন ছিলই না। প্রায় সব শিক্ষার্থীই ছিল পরিমিত শরীরের ও পরিমিত স্বাস্থ্যের অধিকারী। আবার তাদের দিকে তাকালে কখনোই মনে হতো না যে, এরা অপুষ্টিতে ভুগছে। বরং মনে হতো পরিমিত খাদ্য গ্রহণের ফলে যে ধারালো, সানিত ও উজ্জ্বল অবয়ব তৈরি হয়, প্রত্যেকের শরীরই ছিল সেরকম। সেই সময় দারিদ্র্য ছিল, কিন্তু দৈন্য ছিল না। আর যেটা পর্যাপ্ত পরিমাণ ছিল, তা হলো মনের স্বাস্থ্য। প্রচুর পরিমাণ শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা; দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ, অসাম্প্রদায়িক জীবনভাবনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে কথা বলা, আন্দোলন করাÑ এ সবই ছিল আমাদের চিন্তার জগতের রসদ। জীবন এবং জগৎ সম্পর্কে এই পরিচ্ছন্ন ভাবনার ফলে আমাদের মধ্যে যে প্রাণপ্রাচুর্য তৈরি হয়েছিল, যে কোনো শিক্ষার্থীর দিকে তাকালে তা অনুভব করা যেত। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি ও জিএসদের বক্তব্য শোনার জন্য কত স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটত, তার ইয়ত্তা নেই। সেই ১৯২৪-২৫-এর মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত থেকে শুরু করে ১৯৮০-৮১ ও ১৯৮২-৮৩-এর মাহমুুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান পর্যন্ত এই ধারা বহমান ছিল। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন- জ্ঞানকা-ের এইসব বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা বক্তৃতা দিতেন আর শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন।

চার.

ধার্মিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধার্মীকতা আমাদের সময়ও ছিল এবং বলা যায় আজকের থেকে কম ছিল না। কিন্তু সেই ধার্মিকতার সঙ্গে সুযোগসন্ধানী রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। লোকদেখানো পোশাকি ধর্মের কথা তখন চিন্তাও করা যায়নি। আমাদের সময় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মাত্র মেয়ে বোরকা পরত। ওই পোশাকের জন্যই সে আইডেন্টিকাল ছিল। কিন্তু কখনোই তাকে ড্রেস সেইমিং-এর মুখোমুখি হতে হয়নি। অধিকন্তু আমাদের সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যে কালচারাল ‘হাব’-এ পরিণত হয়েছিল, তার প্রায় প্রতিটি প্রোগ্রামে আমরা আমাদের ওই সহপাঠীকে পেয়েছি। সে তার আচরিত ধর্মের সঙ্গে জাতিগত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কখনোই মুখোমুখি দাঁড় করায়নি; এই ধরনের কোনো ভাবনাই তার মধ্যে কখনো আসেনি।

পাঁচ.

বছর তিনেক হল আমার একটি গবেষণার কাজে ঘন ঘন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। সর্বশেষ সপ্তাহ দুয়েক আগে বাংলা বিভাগে আমন্ত্রণে আর.সি. মজুমদার অডিটোরিয়ামে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। একটু বিলম্ব হয়েছিল। অনুষ্ঠান তখন শুরু হয়ে গেছে। দরজা দিয়ে মাথা গলাতেই আমি বিব্রত হয়ে পড়ি। অধিকাংশ মেয়ে বোরকা-হিজাব-নেকাব পরা। ভাবছিলাম, “আমি কি ভুল করে কোনো মাদরাসার অনুষ্ঠানে চলে এসেছি!” অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে উন্মুক্ত প্রশ্নপর্বে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তেমন কোনো প্রশ্নই আসেনি এবং যে দু-একটি প্রশ্ন করা হয়েছে, তার মধ্য বুদ্ধিমত্তার কোনো পরিচয় ছিল না। দীনতা মানুষকে যেভাবে অসহায়, বিপর্যস্ত, বিপন্ন ও নিরুপায় করে তোলে; শিক্ষার্থীদের কথা ও উপস্থাপন-ভঙ্গির মধ্যে সেই দৈন্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

স্বভাবগতভাবে আমি মানুষকে দেখতে চেষ্টা করি; তার চোখমুখ, তার আচার-আচরণ, তার পোশাক-পরিচ্ছদ, তার হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার ভঙ্গি আমার একান্তই আগ্রহের বিষয়। বহু বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে স্বভাবগত এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। সেই পর্যবেক্ষণ সুখকর ছিল না। কারণ শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, খাদ্যসংক্রান্ত পুষ্টি নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা না থাকলেও মানসিক পুষ্টিতে তারা রুগ্ণ, ম্রিয়মাণ, পঙ্গু, অথর্ব। অনেক মেয়ের মুখ দেখা যায় না। তারা বোরখা পরে, হিজাব পরে, নেকাব ধারণ করে, চোখে চশমা পরে। কিন্তু সেই অস্পষ্ট ম্রিয়মাণ চোখ দুটির দিকে তাকালে মনে হয়, ওই চোখে কোনো প্রাণ নেই; গভীর কোনো জীবনবোধ নেই; জীবনের প্রতি কোনো মায়া, কৌতূহল, জিজ্ঞাসা এবং প্রবল কোনো আকাক্সক্ষা নেই। জগদীশ গুপ্তের একটি চরিত্র গ্রামে গিয়ে তার এক আত্মীয়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, গ্রামের মানুষগুলো দেখতে প্রায় একই রকম কেন? তার ওই আত্মীয় জবাব দিয়েছিলেন, সকল গোরুর মুখের অবয়ব একই রকম; কারণ ওরা সবাই গোরু। তেমনি এখানকার মানুষগুলো একজন থেকে অন্যজন যেটুকু আলাদা, সেইটুকু তার জৈবিক উত্তরাধিকার। কিন্তু চিন্তার দিক থেকে এরা কেউ আলাদা নয়। কারণ এরা সবাই মূর্খ, বর্বর, নির্বোধ, স্বার্থান্বেষী ও ধরিবাজ। বর্তমান সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই পরীক্ষায় পাশ করার জন্য কিংবা সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য যেটুকু বই পড়া দরকার, তার বেশি কোনো কিছুই পড়ে না। এই একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পিছনে দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে তারা প্রায় একই রকম হয়ে গেছে। তাদের অভিব্যক্তির মধ্যে স্বতন্ত্র কিছু নেই। এর ফলে তাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তির যে ঔজ্জ্বল্য, জীবন ও জগতকে দেখার স্বতন্ত্র যে ভঙ্গি এবং বিজ্ঞান, শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ভেতর দিয়ে যে মনোগড়ন তৈরি হওয়ার কথা, সেটা হয়নি। এদের মধ্যে ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য বলে কিছু নেই।

আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মীগণ যখন দলে দলে রাস্তা অতিক্রম করেন, তখন তাদের মুখের দিকে তাকালে দেখবেন, দেখতে তারা প্রায় একই রকম। বিশেষ করে মুখের গড়ন। কারণ এই নারীগণ কোনোরকমে তিন বেলা খেয়ে না-খেয়ে জীবনযুদ্ধ করে যাচ্ছেন। শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা তো দূরের কথা, তারা অনেকেই নিজের নামটুকু লিখতে পারেন না। এদেরকে আপনি দামি পোশাকপরিচ্ছদ পরিয়ে এবং বিউটি পার্লার থেকে সাজিয়ে নিয়ে আসলেও দেখবেন যে, বুদ্ধিবৃত্তির দারিদ্র্য এরা কিছুতেই লুকিয়ে রাখতে পারছেন না। তাদের কতাবার্তায় ও আচার-আচরণে তাদের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়বেই। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর দিকে তাকালে আমার কাছে এমনটাই মনে হয়। মনে হয় এরা স্বাক্ষর- লিখতে ও পড়তে পারে; এর বাইরে আর কোনো বিকাশ তাদের ঘটেনি। অধিকন্তু ধর্ম নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা তাদের মধ্যে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে, যা থেকে এদের কোনো মুক্তি নেই। ভাবনার এই চরম রক্ষণশীলতার অনুভব তাদের মুখে, তাদের অবয়বে, তাদের কথাবার্তা ও আচার-আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে অভিব্যক্তি মাদরাসার একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আইডেন্টিকাল। আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিলাম? যে কেউ এম. এ. রহিমের ‘দ্য হিস্টরি অফ দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ নামক গ্রন্থটি পড়ে দেখতে পারেন কিংবা বুদ্ধেব বসুর ‘আমার যৌবন’ নামক গ্রন্থটি। দেখবেন, সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর যে কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ ছিল।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়