প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ২৩:২২
স্ট্যাচু অব লিবার্টি এবং আমার ভালোবাসা
তোমার কথা প্রায়ই শুনি—কখনো কারও কথায়, কখনো কোনো ছবিতে, কখনো নিউইয়র্কের আকাশছোঁয়া গল্পে। এমনকি প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও তোমাকে দেখি। অথচ এতদিন তুমি ছিলে আমার কাছে এক অদেখা ভালোবাসা—দূর থেকে দেখা, মনে মনে কাছে পাওয়া, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়নি কখনো।
অনেকবার দূর থেকে তোমাকে দেখেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে—একদিন তোমার কাছে যাব। তোমার পাশে কিছুটা সময় বসব, অপলক চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকব, হয়তো কাঁপা হাতে একবার ছুঁয়ে দেখব তোমাকে। তোমার সঙ্গে কোনো কথা হবে না, তবুও মনে হবে অনেক কথা বলা হয়ে গেল।
কিন্তু স্বপ্ন তো সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো পূর্ণতা পায় না। অনেকদিন ধরে আমার সেই ছোট্ট স্বপ্নটি অধরাই পড়ে ছিল।
গুণীজনেরা বলেন—কোনো কিছু যদি মানুষ সত্যিই হৃদয় দিয়ে চায়, তবে কোনো না কোনো দিন তার কাছে পৌঁছানোর পথ তৈরি হয়। হয়তো সময় নেয়, হয়তো পথ বদলায়, হয়তো কোনো প্রিয় মানুষের হাত ধরে সেই স্বপ্ন এসে দাঁড়ায় দরজায়।
আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো।
আমার মেয়ের নিউইয়র্কে একটি পরীক্ষা ছিল। সে সিদ্ধান্ত নিল, এই সুযোগে সবাইকে নিয়ে নিউইয়র্ক যাবে। হোটেল বুক করল, আমাদের জানাল—আমরা সবাই নিউইয়র্ক যাচ্ছি, আর স্ট্যাচু অব লিবার্টিও দেখব।
খবরটি শুনে আমার ভেতরে যেন বহুদিনের ঘুমন্ত কোনো স্বপ্ন হঠাৎ জেগে উঠল। মনে হলো—উপরওয়ালা বুঝি আমার সেই পুরোনো ইচ্ছেটা ভুলে যাননি। মেয়ের উসিলায় আজ বাবার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে।
হ্যাঁ, বন্ধুরা—আজ সত্যিই আমি আমার ভালোবাসার কাছে পৌঁছেছি।
আজ তাকে নয়ন ভরে দেখেছি।
দূর থেকে যে ভালোবাসাকে এতদিন হৃদয়ে লালন করেছি, আজ সে আমার সামনে। এত কাছে যে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেখা যায়! ভালোবাসা বোধহয় এমনই।
যাকে ভালোবাসি, তাকে দেখার জন্য মন সবসময় ছটফট করে। কাছে পৌঁছানোর পরও মনে হয়—আর একটু দেখি, আর একটু কাছে থাকি।
আজ তোমাকে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হলাম। কী অপূর্ব তোমার অবয়ব! কী শান্ত অথচ দৃঢ় তোমার উপস্থিতি! মনে হলো, তুমি শুধু দাঁড়িয়ে নেই—তুমি অপেক্ষা করছো। কত বছর ধরে রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে এভাবেই দাঁড়িয়ে আছো আমার মতো অগণিত মানুষের অপেক্ষায়—তাই না?
তুমি সেই আগের মতোই আছো। সময় তোমাকে বদলাতে পারেনি। শুধু উত্তপ্ত রোদের দীর্ঘ স্পর্শে তোমার তামাটে গাল দুটি যেন কিছুটা ম্লান হয়েছে। হাতে মশাল তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তোমার হাতও বুঝি রোদের উত্তাপে ক্লান্ত হয়েছে। অথচ ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে তোমার কোনো কার্পণ্য নেই।
তোমার বাড়িটিও কী অপূর্ব জায়গায়!
চারদিকে শুধু জল আর জল—আর সেই নীল জলের বুকের মাঝখানে তুমি। মনে হয়, সমুদ্র তোমাকে ঘিরে রেখেছে ভালোবাসার মতো, আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো সেই ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে।
প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসে তোমাকে দেখতে। কেউ আসে ইতিহাস দেখতে, কেউ স্বাধীনতার প্রতীক দেখতে, কেউ ছবি তুলতে—আর কেউ কেউ হয়তো আমার মতো নিজের কোনো পুরোনো স্বপ্নের কাছে ফিরে আসে।
সেদিন স্কুলজীবনে পড়েছিলাম—সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না, স্রোতও নয়। জীবনের কত সত্যের মতো এই কথাটিও সেদিন বুঝিনি। আজ বুঝলাম।
তোমার সঙ্গে দেখা হলো, কিছুক্ষণ তোমার পাশে থাকলাম, দুপুরের খাবার খেলাম, কত ছবি তুললাম। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে তোমাকে ছুঁয়ে দেখলাম—যেন এতদিনের স্বপ্নটাকে সত্যি কিনা যাচাই করে নিলাম।
কিন্তু সময় যে বড় নির্মম! কিছুক্ষণ আগেও যে সন্ধ্যা ছিল দূরের কোনো সম্ভাবনা, কখন যে সে আমাদের চারপাশে নেমে এলো বুঝতেই পারিনি। এবার তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে।
এই সামান্য সময়ের ভালোবাসা যে এত গভীর হয়ে যেতে পারে, তা কি তোমাকে বোঝাতে পারব? তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ল মান্না দের সেই অমর গানের কথা—
‘আবার হবে তো দেখা,
এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো…’
হয়তো সত্যিই আবার দেখা হবে। হয়তো আবার কোনো একদিন নিউইয়র্কের পথে আসব। আবার দূর থেকে তোমাকে দেখব। আবার তোমার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকব। আর মনে মনে বলব—দেখো, আমি আবার এসেছি।
তবে যাওয়ার আগে মনে হলো, যাকে নিয়ে এত কথা বললাম, তার জন্মকথা না বললে আমার এই ভালোবাসার গল্পটি যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমার ভালোবাসা—স্ট্যাচু অব লিবার্টি I
নিউইয়র্ক হারবারের বুকে লিবার্টি আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্যাচু অব লিবার্টি যেন সমুদ্রপথের এক অনন্ত আলোকবর্তিকা। হাতে উঁচিয়ে ধরা মশালটি শুধু একটি আলো নয়—এটি স্বাধীনতা, আশা, মানবমুক্তি এবং নতুন জীবনের প্রতীক। তার আনুষ্ঠানিক নাম ‘Liberty Enlightening the World’—অর্থাৎ বিশ্বকে আলোকিত করা স্বাধীনতা।
এই মহৎ ভাস্কর্যের ধারণার পেছনে ছিলেন ফরাসি চিন্তাবিদ Édouard de Laboulaye। ১৮৬৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে আমেরিকাকে একটি স্বাধীনতার স্মারক উপহার দেওয়ার ভাবনা প্রকাশ করেন। সেই স্বপ্নকে রূপ দেন ফরাসি ভাস্কর Frédéric-Auguste Bartholdi।
১৮৭১ সালে আমেরিকায় এসে Bartholdi নিউইয়র্ক হারবারের Bedloe’s Island-কে পছন্দ করেন। কারণ সমুদ্রপথে আমেরিকায় প্রবেশকারী জাহাজগুলোর যাত্রীদের চোখে দ্বীপটি সহজেই পড়বে।
কী অপূর্ব ভাবনা!
আমেরিকার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে এক নারী—হাতে মশাল—আর দূর সমুদ্র থেকে আসা মানুষকে যেন নীরবে বলবে—
‘এসো, তোমার সামনে একটি নতুন পৃথিবী।’
ভাস্কর্যটির নির্মাণ শুরু হয় ফ্রান্সে। এর অভ্যন্তরীণ লৌহকাঠামোর প্রকৌশল কাজে যুক্ত ছিলেন Gustave Eiffel, যিনি পরবর্তীতে প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের জন্য বিশ্বখ্যাত হন।
১৮৮৪ সালে প্যারিসে স্ট্যাচুটি সম্পূর্ণ হয়। পরে এটিকে খুলে ৩৫০টিরও বেশি অংশে ভাগ করে ফরাসি জাহাজ Isère-এ করে আমেরিকায় পাঠানো হয়। ১৮৮৫ সালের ১৭ জুন সেটি নিউইয়র্কে পৌঁছে।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—২৮ অক্টোবর ১৮৮৬।
প্রেসিডেন্ট Grover Cleveland-এর উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টির। ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে আমেরিকার জনগণের জন্য এটি হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব, স্বাধীনতা ও মানবিক আশার এক অনন্য উপহার।
তার বাম হাতে থাকা ফলকে লেখা ‘July 4, 1776’—আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার তারিখ। পায়ের কাছে পড়ে থাকা ভাঙা শিকল ও বেড়ি প্রতীক স্বাধীনতার; আর ডান হাতে উঁচিয়ে ধরা মশাল যেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন আলোর প্রত্যয়।
কিন্তু ইতিহাসের এই তথ্যের বাইরেও আমার কাছে তোমার অন্য একটি পরিচয় আছে। সমুদ্রের নীল বুক চিরে যখন কোনো জাহাজ নিউইয়র্কের দিকে এগিয়ে আসে, দূর দিগন্তে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় সেই মশালধারী নারী। তখন মনে হয়—তিনি শুধু নিউইয়র্ককে স্বাগত জানাচ্ছেন না; তিনি স্বপ্ন নিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে আসা প্রতিটি মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
হয়তো এ কারণেই তোমাকে আমার এত ভালো লাগে। তুমি কোনো রাজপ্রাসাদের রানি নও, অথচ পৃথিবীর কোটি মানুষের হৃদয়ে তোমার রাজত্ব।
তুমি কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নও, অথচ কত মানুষের ব্যক্তিগত স্বপ্নের অংশ হয়ে আছো। তুমি কথা বলো না, তবু তোমার মশাল পৃথিবীকে কত কথা বলে।
তুমি হাঁটো না, তবু তোমার দিকে এগিয়ে আসে পৃথিবীর অগণিত মানুষ। আর তুমি ভালোবাসা চাও না, তবু ভালোবাসা বিলিয়ে যাও নিরন্তর।
তাই আমার কাছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি শুধু তামা, লোহা আর পাথরের নির্মিত এক বিশাল ভাস্কর্য নয়।
তুমি আমার কাছে সমুদ্রের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন প্রেমের প্রতীক—
যার হাতে মশাল, চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন, আর হৃদয়ে পৃথিবীর ক্লান্ত মানুষের জন্য একটুখানি আশ্রয়ের আলো।
তোমার পেছনে ইতিহাস, সামনে অনন্ত সমুদ্র;
তোমার হাতে আলো, পায়ের কাছে ভাঙা শিকল;
আর আমার হৃদয়ে তোমাকে ঘিরে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প।
অনেকদিন দূর থেকে তোমাকে ভালোবেসেছি।
আজ কাছে এসে তোমাকে ছুঁয়ে দেখলাম।
হয়তো আবার দূরে চলে যাব, হয়তো জীবন তার নিজের স্রোতে আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবে।
তবুও তুমি থেকে যাবে—
নিউইয়র্ক হারবারের নীল জলের মাঝে,
আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবিতে,
আর আমার হৃদয়ের এক বিশেষ ঠিকানায়।
কারণ কিছু ভালোবাসা কাছে পাওয়ার জন্য নয়—
কিছু ভালোবাসা শুধু একবার ছুঁয়ে দেখলেই সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকে।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি—
তুমি আমার সেই ভালোবাসা,
যাকে বহুদিন দূর থেকে দেখেছি,
একদিন কাছে গিয়ে ছুঁয়েছি,
আর এখন সারাজীবন মনে রাখব।
ড. আব্দুস সাত্তার :
লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক ও কমিউনিটি এক্টিভিস্ট,
ওয়াশিংটন ডিসি।







