প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ২৩:৪৫
পলাশ' বলে আর ডাকবেন না বাবলু ভাই—স্নেহ, ভালোবাসা আর স্মৃতিতে অম্লান মাহবুব আনোয়ার বাবলু

|আরো খবর
সকালে ঘুম থেকে উঠেই পরপর দুটি মৃত্যুসংবাদ পাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খবরটি দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট ভাই রিপন খান ফোন করে জানায়— ‘দাদা, বাবলু ভাই আর নেই।’ কথাটি শুনে আমি যেন থমকে যাই। কিছুক্ষণ পর বন্ধু আ. করিম হাওলাদারও একই সংবাদ নিশ্চিত করেন।
পরিচয়ের শুরু, সম্পর্কের গভীরতা
১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাহবুব আনোয়ার বাবলু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর স্নেহ-ভালোবাসার সম্পর্কে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর আন্তরিকতা, খোঁজখবর নেওয়া এবং স্নেহভরা ‘পলাশ’ ডাকটি কখনোই কমেনি।
চাঁদপুর শহরের যেখানেই দেখা হতো, চায়ের কাপ, সিগারেট আর সাহিত্য-সংস্কৃতির গল্পে জমে উঠত প্রাণবন্ত আড্ডা। তিনি ছিলেন একজন কবি, রম্যলেখক, সাহিত্যিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
রম্যরসের অনন্য কারিগর
বাবলু ভাই ছিলেন অসাধারণ রসবোধসম্পন্ন মানুষ। তাঁর মুখে গল্প শুনে না হেসে থাকা কঠিন ছিল। রিকশাচালককে নিয়ে বলা তাঁর সেই বিখ্যাত রসিকতা কিংবা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য উদ্ধৃত করে সবাইকে হাসিয়ে তোলার মুহূর্তগুলো আজও স্মৃতিতে অমলিন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির নিবেদিত প্রাণ
দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার সময় তাঁর রম্য লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের দেওয়ানগঞ্জ বুক স্টলে বই, পত্রিকা, সাহিত্য আর সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর প্রাণবন্ত আড্ডা ছিল অনেকের প্রিয় সময়।
নাট্যকার লিটন ভূঁইয়া ও জসিম মেহেদীসহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। নির্মল রসবোধে তিনি আশপাশের মানুষকে আনন্দে ভরিয়ে রাখতেন।
রাজনীতিতে থেকেও ছিলেন নিরহংকার
রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও কখনো ক্ষমতার অহংকার তাঁকে স্পর্শ করেনি। তিনি চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি এবং চাঁদপুর ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল একজন মানবিক, সংস্কৃতিমনা ও উদার ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
শেষ বিদায়ের আবেগঘন মুহূর্ত
২৬ জুলাই ২০২৬, বিকেল সাড়ে ৫টায় চাঁদপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে চাঁদপুর-৩ আসনের এমপি ফরিদ আহমেদ মানিক আবেগঘন বক্তব্য দেন। বাবলু ভাইয়ের ছেলের বক্তব্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। তিনি শুধু একটি অনুরোধ করেন— ‘আপনারা আমার বাবাকে মনে রাখবেন, তাঁর জন্য দোয়া করবেন।’
যে ডাক আর শোনা যাবে না
শেষ বিদায় জানিয়ে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, আর কোনোদিন বাবলু ভাই ‘পলাশ’ বলে ডাকবেন না। চাঁদপুর শহরের কোনো আড্ডা, কোনো চায়ের টেবিল কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতির কোনো আয়োজনে আর তাঁর হাসিমাখা মুখ দেখা যাবে না।
মাহবুব আনোয়ার বাবলু তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা, রসবোধ, সাহিত্যচর্চা ও মানবিকতার মাধ্যমে চাঁদপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও চিরশান্তি কামনা করছি মহান আল্লাহর কাছে।








