প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৪:৩২
বেগম খালেদা জিয়া আর নেই

তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন, 'আপসহীন নেত্রী'র বিরল অভিধায় সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় বেগম খালেদা জিয়া আর বেঁচে নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মুহূর্তের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
|আরো খবর
বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের বিষয়টি এক পোস্টে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ফজরের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের নিকট তাঁর বিদেহী আত্মার জন্যে দোয়া চাচ্ছি।
মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং খালেদা জিয়ার প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শার্মিলী রহমান সিঁথি।
স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও তাঁর স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলাম এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকেরা সেখানে ছিলেন।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর অবস্থা ছিলো অত্যন্ত জটিল এবং তিনি সংকটময় মুহূর্ত পার করছিলেন বলে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন (বিএনপির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে তাঁর জন্মস্থান জলপাইগুড়িতে)। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। তাঁদের আদি বাড়ি ছিলো ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। তবে তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া এলাকায়।
শৈশবে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর দলের সংকটময় মুহূর্তে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
আশির দশকে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। আপসহীন সংগ্রামের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
এই দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার দৃঢ় ঘোষণা দেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক ও গৃহবন্দী করা হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর সময়েই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন, যার মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্যে বিনামূল্যে শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত করেন।
১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও বেগম খালেদা জিয়া বৃহত্তম বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে যে ক'টি আসনে দাঁড়িয়েছেন, তার সবকটিতেই জয়লাভ করেছেন।
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রের প্রতি অবদানের জন্যে তাঁকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।
২০১৮ সালে একটি বিতর্কিত মামলার রায়ে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিলো এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে একে একে সব মামলায় খালাস পান বিএনপি চেয়ারপারসন। সূত্র : ঢাকা পোস্ট।







