বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১০:৩০

বিশ্ব এগোচ্ছে চিপে, আমরা কি প্রস্তুত

মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান
বিশ্ব এগোচ্ছে চিপে, আমরা কি প্রস্তুত

এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। খুব নিঃশব্দে একটা বড় পরিবর্তন ঘটছে; শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে একটি শব্দ; সেমিকন্ডাক্টর। এটা শুধু আরেকটা শিল্প খাত নয়। এটা আসলে ভবিষ্যতের ভিত্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, ডেটা সেন্টার, এমনকি নিত্যদিনে আমরা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছি বা ভবিষ্যতে করব, তার প্রায় সবকিছুর মূলে রয়েছে এ ছোট্ট চিপ। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্ব দ্রুত এ সম্ভাবনাময় খাতে এগিয়ে যাচ্ছে।

চাপের মধ্যে অর্থনীতি, তবে দিকহীন নয় : অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপের মধ্যে। তবে সব খাতের গল্প এক নয়। যেমন, সেমিকন্ডাক্টর খাতের সমস্যা হলো ‘দক্ষ মানুষের অভাব’। কাজ আছে, সুযোগ আছে, কিন্তু সেই কাজ করার মতো প্রস্তুত মানুষ খুব কম। বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর কারণে এ খাতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশে যে কয়েকটি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা এখন সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন কাজে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ সুনাম অর্জন করছে। কিন্তু প্রযুক্তি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, আর এ অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আরটিএল ডিজাইন, ডিজিটাল ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন (পিএনআর), লেআউট (ডিজিটাল ও অ্যানালগ) এবং ডিজাইন ফর টেস্টেবিলিটিতে (ডিএফটি) দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট। ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও টেস্টিং পর্যায়ে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে এ বিভাগেও চাহিদা বাড়বে বহুগুণ। ভবিষ্যতে এ সেক্টরে উন্নতির জন্য এখনই পরিকল্পনা করা আবশ্যক।

নতুন পথ ‘দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষা’ : বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো সম্পূর্ণভাবে সরাসরি ডিজাইন করতে প্রস্তুত এমন দক্ষ সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে সক্ষম নয়। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিএলএসআই বিষয়ে সাধারণত ১-২টি কোর্স অন্তর্ভুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীরা শুধু প্রাথমিক ধারণা অর্জন করে, যা বিশেষায়িত দক্ষতায় রূপ নেয় না। পাঠ্যক্রমের প্রায় ৭০ শতাংশ তাত্ত্বিক এবং মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহারিক। এ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কর্মজীবনে প্রবেশের পর অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি ইন্ডাস্ট্রি-গ্রেড কাজের জন্য প্রস্তুত থাকে না। তাই দরকার হয় ৬ থেকে ১২ মাসের প্রশিক্ষণ, যা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। অনেকের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে কর্মক্ষেত্র প্রবেশ করাও কঠিন হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় (ইউআইইউ), মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি (এমআইএসটি), অ্যামেরিক্যান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ভিএলএসআই (ভিএলএসআই) ট্রেনিং চালু করেছে। আগে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ফ্রি বা ওপেন-সোর্স ট্যুলের ওপর নির্ভরশীল ছিল, বর্তমানে ১৫টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডাস্ট্রি-স্ট্যান্ডার্ড ট্যুল কিনে ব্যবহার করছে; যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। সরকারের স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের (সিসিপ) মতো উদ্যোগ দক্ষতা উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে; ইন্ডাস্ট্রি-স্ট্যান্ডার্ড কারিকুলাম, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রচেষ্টা করছে। এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তবে তা সময়সাপেক্ষ এবং এ পরিবর্তনের আশানুরূপ ফলাফল পেতে দরকার হবে ৩-৪ বছর।

সরকারের ভূমিকা : কৌশলগত বিনিয়োগের সময় সেমিকন্ডাক্টর খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সরকারের অঙ্গসংস্থা সিসিপ বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে ভিএলএসআই ট্রেনিংকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে উৎসাহিত করছে। তবে সেমিকন্ডাক্টর বা ভিএলএসআই-নির্দিষ্ট বড় পরিসরের গ্র্যান্ট বা ফান্ডিং কাঠামোর অভাব রয়েছে, যা এ খাতের অগ্রগতিকে ধীর করছে। সেমিকন্ডাক্টর একটি হাই-টেক খাত হওয়ায় এখানে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে উচ্চ-আয়ের কর্মসংস্থান এবং উচ্চ রেমিট্যান্স অর্জনের সুযোগ রয়েছে। তাই এ খাতের দক্ষতা উন্নয়নকে সরকারের একটি অগ্রাধিকার খাত হিসাবে বিবেচনা করা এবং ভিএলএসআইভিত্তিক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের জন্য পৃথক তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে দেখা যায়, সম্ভাবনাময় খাত বা কোম্পানিগুলোকে গ্র্যান্ট দেওয়া হয়, যা তারা গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যবহার করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত শিল্প ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেই অনেক সময় সরকারের সফলতার সূচক হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যেমন : ভারত। দেশটিতে ইতোমধ্যেই এ খাতে দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ও প্রণোদনা দিচ্ছে, যাতে বৈশ্বিক হাইটেক কোম্পানিগুলো সেখানে উৎপাদন ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করে। বাংলাদেশকে একই স্কেল অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই, তবে দিকনির্দেশনা বুঝে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সময়মতো বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের অবস্থান নির্ধারণ করবে। এছাড়া আমাদের বেশকিছু উদ্যোগ বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এর মধ্যে অন্যতম পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্ব আর ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’। এ কথাগুলো শুনতে অনেকটা নীতিগত বা কাগুজে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের হাতিয়ার। এটা এমন এক প্রজেক্ট যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বই পড়ে না, বরং হাতে-কলমে কাজ করে, আসল টুল ব্যবহার করে, বাস্তব প্রজেক্টে যুক্ত হয়ে, সমস্যার সমাধান করা শিখতে পারবে। এ ধরনের সেন্টার অব এক্সিলেন্স যদি আমরা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে ধীরে ধীরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ চিপ’ আর শুধু স্বপ্ন নয়, হবে বাস্তব। এ যাত্রায় মালয়েশিয়া, সৌদি আরবের মতো দেশগুলো প্রযুক্তি আর দক্ষতা উন্নয়নে অংশীদার হতে আগ্রহী। কিন্তু তারা তখনই সত্যিকারের এগিয়ে আসবে, যখন আমরা নিজেরাই দেখাতে পারব, আমরা প্রস্তুত, আমরা সক্ষম, আমরা আগ্রহী। সেমিকন্ডাক্টর খাতটা শুধু একটা ইন্ডাস্ট্রি নয়। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটা প্রশ্ন। আমরা কি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করব, নাকি নিজেরাই প্রযুক্তি তৈরি করব?

মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান : সেমিকন্ডাক্টর বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়